প্রধান সূচি

চন্ডিপুরে নিষ্ঠুর গণহত্যা দিবস পালিত

৬ মে চন্ডিপুর গণহত্যা দিবস। ১৯৭১ সালের এই দিনে ইন্দুরকানীর পাশর্^বর্তী মোড়েলগঞ্জ উপজেলার হিন্দু অধ্যুষিত চন্ডিপুর এলাকায় পাক হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসররা নির্মম ও নিষ্ঠুর গণহত্যা চালায়। এতে ঘটনাস্থলেই প্রকৌশলী, শিল্পী, শিক্ষক, ডাক্তার, স্থানীয় গন্যমান্য ব্যক্তি, নারী ও শিশুসহ অন্তত ১৪৭ জন নিহত হয়। পরে আহত অবস্থায় মারা যায় আরো অনেকে। ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী এবং আহত অবস্থায় বেঁচে থাকা কয়েক জনের সাথে কথা বলে জানা যায়, ১৯৭১ সালে ৬ মে সকালে সাধক বিপিন চাঁদ ঠাকুরের তিরোধান দিবস পালনে তার ভক্তবৃন্দ স্থানীয় দেবেন চাঁদ ঠাকুরের বাড়িতে সমবেত হন। ঐ দিন সকাল ৮ টার সময় পাক হানাদাররা স্থানীয় পিচ কমিটির সহায়তায় পিরোজপুর ক্যাম্প থেকে কয়েকটি স্পীড বোর্ড যোগে চন্ডিপুরের গাম্বীরা খালের ভেতর দিয়ে আশ্রমে প্রবেশ করে ধর্মীয় অনুষ্ঠানে আগতদের উপর অতর্কিত মর্টার, মেশিনগান দিয়ে হামলা চালায়। ঘটনাস্থলেই দেবেন্দ্রনাথ হালদার, ইঞ্জিনিয়ার বিমল হালদার, উপেনন্দ্রনাথ হালদার, মনোজ হালদার, অনিল হালদার, ধীরেন্দ্রনাথ মজুমদার, আমজেদ খানসহ অন্তত ১৪৭ জন নিহত হয়। মিলিটারীরা খুঁজে খুঁজে লোকজনকে হত্যা করে। যাকে সামনে পায় তাকেই গুলি করে। গ্রামের এক দিকে নদী অন্য দিকে বিশাল ফাঁকা মাঠ থাকায় লোকজন পালিয়ে যেতে পারেনি। হানাদার ও তাদের দোসর বাহিনী দীর্ঘ ৮ ঘন্টা ধরে অসংখ্য ঘর বাড়িতে লুটপাট, অগ্নিসংযোগসহ ব্যপক হত্যাকান্ড চালায়। ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ইন্দুরকানী উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার বেলায়েত হোসেন হাওলাদার জানান, ঘটনার দিন যখন পাকহানাররা চন্ডিপুরের হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকদের ৩৫৯ টি ঘরে অগ্নিসংযোগ করে এবং নির্বিচারে হত্যা শুরু করে তখন লোকজন এ দিক সে দিক ছোটাছুটি করতে থাকে। ওই সময় আমি এবং এম  এ মান্নান হাওলাদার সহ তাদেরকে ইন্দুরকানীতে আসতে সহায়তা করি। ওই দিনই আমারা লোকদের উদ্ধার শেষে চন্ডিপুরে গিয়ে দেখি চারিদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে লাশ আর লাশ। এসময় একটি ঘর লুট হতে দেখি। সেখানে আমারা লুটেরাদের প্রতিহত করি। পরে ক্ষতিগ্রস্থদের মাঝে বেশ কয়েক দিন রুটিসহ বিভিন্ন শুকনা খাবার বিতরণ করেছি। সে দিনের সেই দুঃসহ স্মৃতি আজও আপ্লুত করে তোলে।

মিন্টু রানী হালদার বলেন, আমি তখন ৯ম শ্রেণীর ছাত্রী। ওই দিন আমার চোখের সামনেই পাক হানাদাররা আমার বাবা দেবেন্দ্রনাথ হালদার, ভাই বিমল হালদারকে নির্মম ভাবে গুলি করে হত্যা করে। আমার কাকা উপেন্দ্রনাথ হালদার এবং আমি একটি বাগানে লুকিয়ে ছিলাম। হানাদাররা সেখান থেকে কাকাকে ধরে নিয়ে আমার সামনেই গুলি করে। ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী সুনীল কৃষ্ণ মজুমদার জানান, পাকিস্তানী সেনাবাহিনী আমার চোখের সামনেই বড় ভাই ধীরেন্দ্রনাথ মজুমদার ও দীনেশ চন্দ্র মজুমদারকেসহ অনেককেই নিষ্ঠুর নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করে। আমি বড় একটি গাছের আড়ালে লুকিয়ে থাকলে ভাগ্যক্রমে বেঁচে যাই। একই গ্রামের বাসিন্দা ইন্দুরকানী ডিগ্রী কলেজের প্রভাষক পরিমল চন্দ্র মন্ডল জানান, আমার বাবা সতিষ চন্দ্র মন্ডল ও সেজ ভাই নির্মল চন্দ্র মন্ডল ঘাতকের বুলেটের আঘাতে মৃত্যু বরন করেন। চন্ডিপুর গ্রামবাসী নিহতদের স্মরনে সম্মিলিতভাবে খুবই সল্প পরিসরে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মান করেছে। তবে আরো এখানে সরকারী ভাবে নির্মিত হয়নি কোন স্মৃতি সৌধ। প্রতি বছরই নিহতদের স্মরনে শ্রী শ্রী হরিগুরু বিপিন চাঁদ দেবেন চাঁদ মন্দির চত্ত্বরে দিনব্যাপী অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। এ বিষয়ে অনুষ্ঠান উদযাপন কমিটির  সভাপতি সুনীল কৃষ্ণ মজুমদার জানান, এ বছরও শ্রীমৎ আচার্য বিপিন চাঁদ ঠাকুরের মহাপ্রয়ান দিবস ও শহীদ স্মরণ দিবস উদযাপনের জন্য ব্যপক কর্মসূচী গ্রহণ করা হয়েছে।

Please follow and like us:





উত্তর দিন

Wordpress Social Share Plugin powered by Ultimatelysocial