প্রতিবাদ করলেই দেয়া হয় মামলা
বাগেরহাটের এক মহিলা ইউপি সদস্যের দাপট: আতংকে এলাকাবাসি
বাগেরহাটের কচুয়া উপজেলার গোপালপুর ইউনিয়নের ৪, ৫, ও ৬নং ওয়ার্ডের সংরক্ষিত মহিলা আসনের ইউপি সদস্য নাজমা শিকদার ওরফে সেতারা বেগমের ক্ষমতার দাপটে আতংকে ভুগছে গোপালপুর ইউনিয়নের বক্তারকাঠি গ্রাম ও আশপাশের ইউনিয়নের সাধারন লোকজন। ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে নির্বাচনের সময় প্রতিদন্ধী প্রার্থীকে ঘর থেকে বের হতে না দেয়া এ জনপ্রতিনিধি এখন এলাকাবাসির কাছে মূর্তিয়মান আতংক। গ্রামের বিভিন্ন ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে বাকিতে মালপত্র ক্রয়, জমি-জমা নিয়ে স্থানীয় একাধিক ব্যাক্তিদের নামে মামলা ও তার হুমকী-ধামকী,ভয়-ভীতিতে গ্রামের সাধারন মানুষ আজ পালিয়ে বেড়াচ্ছে। আর কেউ যদি তার এ অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে মুখ খোলো তার নামেই সে মামলা করে। মামলাবাজ এ ইউপি সদস্য যে দল যখন ক্ষমতায় থাকে সেই দলের নেত্রী বনে যান।
বৃহস্পতিবার সরেজমিনে কচুয়া উপজেলার বক্তারকাঠি গ্রামে গেলে নাজমার দ্বারা বিভিন্ন সময় ক্ষতিগ্রস্ত ও হয়রানীর শিকার ওই গ্রামের ইলিয়াস শেখ, ইদুল মোল্লা, ইলিয়াস বাঙ্গাল, বক্কার শিকদার, তায়েব আলী, রেহেনা বেগমসহ প্রায় অর্ধশতাধিক নারী-পুরুষ নাজমার বিরুদ্ধে বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত, মামলার নথিপত্র ও মৌখিক ভাবে বিভিন্ন অভিযোগ করেন। এসময় তারা ইউপি সদস্য নাজমার শাস্তির দাবী জানান।
বক্তারকাঠী গ্রামের আয়ুব আলী শেখের ছেলে ইলিয়াস শেখ বলেন, আমি কবলাকৃত সম্পত্তিতে ১২ বছর ধরে পরিবারসহ বসবাস করে আসছি। নাজমা শিকদার এক ভুয়া দলিল তৈরী করে আমার কাছে জমি দাবি করছে। অন্যথায় জমির মুল্যে টাকা দাবি করে। আমি টাকা দিতে অস্বীকার করায় আদালতে আমার বিরুদ্ধে ৭ ধারা মামলা করে আমাকে হয়রানি করে। পরবর্তিতে আদালতে আমার বিরুদ্ধে করা ঐ মামলা মিথ্যা বলে প্রমানিত হয়। এরপর থেকে আমার বিরুদ্ধে একের পর এক হয়রানি মূলক মিথ্যা মামলা ও নানা ধরনের হুমকি-ধামকি অব্যাহত রেখেছে সে। এই নাজমা বেগম এলাকায় মুক্তিযোদ্ধার কন্যা ও আওয়ামী পরিবার বলে প্রচার- প্রচারনা চালায় আর সেই বলেই এলাকায় সাধারন নিরহ মানুষ জনের উপর তার জুলুম অত্যাচার অব্যাহত রয়েছে। গ্রামের মানুষ ভয়ে তার বিরুদ্ধে টু-শব্দটি করতে সাহস পায় না।
প্রায় একই অভিযোগ গোপালপুর ইউনিয়নের বক্তারকাঠি গ্রামের ইলিয়াস বাঙ্গাল, ইদুল মোল্লা, ইদ্রিস আলী, বক্কার শিকদার, গোপালপুরের তায়েব আলীসহ ঐ এলাকার একাধিক নারী-পুরুষের। তারা বলেন, সেতারা বেগম ওরফে নাজমা শিকদার বিএনপি জামায়াত জোটের সময়ে বিএনপির সক্রিয় কর্মী হিসেবে কচুয়া উপজেলায় ব্যাপক পরিচিতি ছিল। বর্তমান সরকারের সময় নাজমার পিতা ফজলু শিকদার এর নামে মুক্তিযোদ্ধা সনদ যোগাড় করে নিজেকে মুক্তিযোদ্ধার কন্যা বলে আওয়ামী লীগে নাম লেখিয়ে অন্যায় অত্যাচার করছে। এই নাজমার বাবা এক জন চিহ্নিত রাজাকার এবং কচুয়া থানা রাজাকারের তালিকায় ৯৪নং এ ওই ফজলু শিকদারের নাম আছে। এ বিষয়ে কচুয়া মুক্তিযোদ্ধা সংসদে এলাকার অনেক মুক্তিযোদ্ধারা গত ৬/১/২০১৭ তারিখে গন স্বাক্ষরিত একটি অভিযোগপত্র দাখিল করেছে।
ইউপি সদস্য নাজমার বিরুদ্ধে জানতে চাইলে গোপালপুর ইউপি চেয়ারম্যান শিকদার আবু বক্কর সিদ্দিক বলেন, নাজমার বিরুদ্ধে গ্রামবাসির করা অভিযোগ সব গুলোই সত্যি। তার বাবা ছিলেন চিহ্নিত রাজাকার। কিন্তু নাজমার ক্ষমতা বলে তিনি মুক্তিযোদ্ধা বনে গেছেন। এলাকার সাধারন মানুষের নামে মামলা দিয়ে হয়রানী করা তার পেশা হয়ে দাড়িয়েছে। বর্তমানে সে আওয়ামী লীগ করলেও আগে সে বিএনপির রাজনীতির সাথে জড়িত ছিল।
গোপালপুর ইউনিয়ন মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার খোন্দকার সামচুল হক বলেন, নাজমার বাবা ফজলু শিকদার স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় একজন লুটকারী হিসাবে এলাকায় চিহ্নিত রাজাকার ছিলো, পরে নাজমা তার বাবাকে মুক্তিযোদ্ধা বানাতে একটি সনদপত্র নেয়ার জন্য বহুবার আমার কাছে এসেছিলো আমি দেইনি। একজন লুটকারী,রাজাকারকে তো মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি দেয়া যাবেনা।
এ বিষয়ে কচুয়া উপজেলা মহিলা আওয়ামীলীগের সভানেত্রী ও কচুয়া উপজেলা পরিষদের মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান নাজমা সরোয়ার বলেন, সেতারা ওরফে নাজমার বিরুদ্ধে এলাকাবাসির করা অভিযোগ সব গুলোই সত্যি। তার কর্মকান্ডের কারনে ইতি মধ্যেই তিনি এলাকায় বাজে মহিলার খেতাব অর্জন করেছেন। বর্তমানে সে গোপালপুর ইউনিয়ন মহিলা আওয়ামী লীগের সভাপতি পদে আছেন। সম্প্রতি একটি চেক জালিয়াতির মামলায় তার সাজা হয়। আমরা তার সাংগঠনিক ভাবে ব্যবস্থা গ্রহনের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। দ্রুতই তাকে দল থেকে বহিস্কার করা হবে।
ইউপি সদস্য নাজমা শিকদার ওরফে সেতারা বেগম বলেন, আমার বিরুদ্ধে করা অভিযোগ গুলো সম্পূর্ণ মিথ্যা বানোয়াট ও ভিত্তিহিন। আমার পিতা মুক্তিযোদ্ধা ফজলু শিকদারকে হত্যা করার পর যারা আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ দিয়েছে তারাই আমার পিতার জায়গা-জমি দখল করে নেয়। মূলত এ জায়গা-জমি নিয়েই তাদের সাথে আমার বিরোধ চলে আসছে। আর আমি ১৩ বছর বয়েস থেকে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে জড়িত, আমি কখনই বিএনপিরর রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলাম না।
