প্রধান সূচি

স্বরূপকাঠীতে বসেছে নৌকার হাট

মোঃ হাবিবুল্লাহ :

গ্রীষ্মের প্রচন্ড তাপদাহের পর প্রকৃতিতে সগৌরবে এখন চলছে বর্ষাকাল। বর্ষার পানি নদীর দু’কূল ছাপিয়ে ভরে ওঠে খাল-বিল, জমিজমা ও পুকুর। এমনকি বর্ষার পানিতে তলিয়ে যায় রাস্তাঘাট-বাড়িঘরও। তাই এসময়ে পিরোজপুর জেলার বিল ও চরাঞ্চাচলের মানুষের জীবন-জীবিকা ও চলাচলে নৌকা ছাড়া যেন অনেকটাই বেহাল। তাইতো এসব এলাকার মানুষের প্রয়োজনে যুগ যুগ ধরে স্বরূপকাঠী (নেছারাবাদ) উপজেলার আটঘর এলাকায় বসছে নৌকারহাট।

বাংলা জৈষ্ঠ্য মাসের মাজামাঝি থেকে ভাদ্র মাসের শেষ সময় পর্যন্ত সপ্তাহের প্রতি শুক্রবার আটঘর বিদ্যালয় সংলগ্ন এলাকায় জলে ও কূলে বসে এ নয়নাভিরাম নৌকারহাট। রেইনট্রি, মেহগীনি ও কড়াই কাঠের তৈরী হাটে আসা নৌকাগুলো এলাকার প্রায় আধা কিলোমটির জায়গা জুড়ে খালের জলে ও কূলে বিস্তৃতি ঘটে।

সরেজমিনে শুক্রবার নৌকারহাট ঘুরে মনে হল, যেন এক নৌ-সা¤্রাজ্য। যে দিকেই দু’চোখ যায় কেবল নৌকা আর নৌকা। আধুনিক সভ্যতায় যান্ত্রিক নানান ইঞ্জিন চালিত  নৌকা, ট্রলারের রাজত্ব থাকলেও, এখানকার মানুষের কাছে নৌকার কদর শত শত বছর ধরে। গাছ থেকে পেয়ারা সংগ্রহ, কৃষিকাজ পরিচর্যা, গো-খাদ্য সংগ্রহ, ভাসমান সবজির বাজারে বিকিকিনিসহ যাবতীয় কাজে নৌকাই এখানকার মানুষের প্রধান ভরসা। আর তাই প্রয়োজনমত নৌকা সংগ্রহ করতে ক্রেতারা চলে আসছে আটঘরের এ বিখ্যাত নৌকারহাটে। চলতি আষাঢ়ের একধারে খড়া আর অন্যদিকে ঝড়া বর্ষার গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি উপেক্ষা করে  ক্রেতা, বিক্রেতা আর নৌহাট দেখার উৎসুখ মানুষের সমাগমে ভরপুর আটঘর এলাকা। এ যেন নৌকা বিকিকিনির এক মিলনমেলা।

হাটে কথা হয় ইলুহার গ্রামের নৌকা বিক্রেতা মোঃ মনির হোসেনের সাথে। তিনি বলেন, বর্ষাকালে গো-খাদ্য সংগ্রহ, পেয়ারা পারাসহ ভাসমান সবজির বাজারে ব্যবসার কাজে এখানকার মানুষের কাছে নৌকার কদর অনেক। তবে, সাধারনত আটঘর কুড়িয়ানা ও ঝালকাঠি অঞ্চলের মানুষেরা গাছ থেকে পেয়ারা সংগ্রহের কাজেই বেশি নৌকা কিনে থাকেন। বর্ষা মৌসুমে এ উপজেলার আটঘর কুড়িয়ানা ইউনিয়নের প্রতিটি বাড়িসহ জলাবাড়ি, সোহাগদল, বলদিয়া, গুয়ারেখা ও সিমান্তবর্তী ঝালকাঠি জেলার প্রতিহাটে শত শত লোক আসে নৌকা ক্রয়ের জন্য। মনির জানায়, আজকের হাটে সে বিক্রির জন্য ২৭টি নৌকা নিয়ে এসেছে। আকার ও কাঠের প্রকারভেদে একেক নৌকার একেক রকমের দাম রয়েছে। মনির আরো বলে, সে গ্রাম থেকে ঘুরে ঘুরে নৌকা কিনে প্রতি হাটে একসাথে ২০-৩০টি নৌকা নিয়ে আসে। হাটে চাম্বলের নৌকা সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয়। একটি আটহাতি চাম্বল কাঠের তৈরী নৌকা তিনি বিক্রি করেন দু‘হাজার থেকে ২২শ’ টাকায়। এতে তিনি খরচপাতি পুষিয়ে মোটামুটি লাভের মুখ দেখছেন।

হাটে দেখা যায়, বিদ্যালয় সংলগ্ন খালে ও জলে বিক্রেতারা সারি সারি নৌকা সাজিয়ে সমানতালে বিক্রি করে চলছেন। আর বরিশাল বিভাগের বিল ও চরাঞ্চলের বিভিন্ন মানুষেরা হাটে এসে প্রয়োজনুযায়ী একসাথে তিন থেকে চারটি নৌকা কিনে নসিমন ও ট্রলারযোগে নিয়ে যাচ্ছেন নিজ নিজ গন্তব্যে। বিক্রেতারা নৌকার একটু বেশি দাম হাকালেই ক্রেতারা ঘুরে ঘুরে নৌকার সঠিক দামদর যাচাই করে পছন্দের নৌকাটি কিনে নিচ্ছেন।

উপজেলার বলদিয়া ইউনিয়নের নৌকা তৈরীর কারিগর মোঃ আজমল হোসেন (৫০) জানান, পনের বছর ধরে তিনি এ হাটে নৌকা বিক্রি করতে আসেন। আজকের হাটে সে ১৫টি নৌকা নিয়ে এসেছেন। বেঁচাবিক্রি ভাল। তিনি জানান, একটি ১২ হাতি নৌকা তৈরীতে একজনের সময় লাগে ৩/৪দিন। যার মজুরি ও কাঠপাঠ মিলিয়ে খরচ পড়ে ২৫শ’ থেকে ৩ হাজার টাকা। হাটে সেই নৌকাটি বিক্রি হয় ৩ হাজার ৭শ’ থেকে ৪ হাজার টাকায়। হাটে সাধারনত আট হাত ও দশহাতি নৌকার বেশি চাহিদা।

নৌকা ব্যাবসায়ী ও হাটের স্থানীয়রা জানান, প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমের এই নৌকার হাটে পিরোজপুর, বরিশাল ও ঝালকাঠি জেলার বিভিন্ন পেশার লোকেরা আসে। তারা একসাথে কয়েকটি নৌকা কিনে কেউ নৌকার উপর নৌকা, আবার, কেউ কেউ নসিমন ও ট্রলারে ক্রয়কৃত নৌকাগুলো একসাথে সাজিয়ে নিয়ে যান দূর-দূরান্তে।

নৌকা বিক্রির সময় সাথে বেঠা না দেয়ায় নৌকার হাটের সাথেই রাস্তার উপরে বসে বৈঠার দোকান। সেখানে বিক্রেতারা দু‘পাশে দুটি খুটি পুঁতে তার উপর আড়াআড়ি একটি বাঁশ বেধে বাঁশের উপরে সারিবদ্ধভাবে সাজিয়ে রাখেন বৈঠা। বিলাতি গাব, মেহগীনি ও আমইর কাঠ দিয়ে বানানো হয় বৈঠাগুলো। হাটে বিলাতি গাব ও আমইর কাঠের বৈঠার চাহিদা বেশি।

বলদিয়া ইউনিয়নের চামী গ্রামের বৈঠা বিক্রেতা মোঃ মহাসিন (৪৫) জানান, হাটে সে ১০৭টি বৈঠা নিয়ে এসেছেন। বেঁচা-বিক্রি মুটামুটি ভাল। তবে নৌকার মত বেশি বৈঠা বিক্রি হয়না। কারন একটি আমইর কাঠ ও বিলাতি গাবের বৈঠা অনেক বছর সময় দেয়।

হাটের ইজারাদার মোঃ মোস্তফা কামাল বলেন, প্রতিহাটে সহ¯্রাধিক নৌকা ওঠে। হাটে বিভিন্নœ আকারের ৬০০/৭০০ খানা নৌকা বিক্রি হয়। হাটে একশ’ টাকায় দশ টাকা খাজনা নেয়া হয়।

Please follow and like us:





উত্তর দিন

Wordpress Social Share Plugin powered by Ultimatelysocial