নাজিরপুরে ইউপি চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে মাতৃত্ব ভাতার তালিকাভূক্তিতে ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ
ফিরোজ মাহমুদ, নাজিরপুর প্রতিনিধি :
জেলার নাজিরপুরে এক ইউপি চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে অতিদরিদ্র গর্ভবতী নারীদের মাতৃত্বকালীন ভাতার জন্য নাম তালিকাভূক্ত করতে ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এমনকি ভাতাপ্রাপ্তদের কাছ থেকে মোট টাকার অর্ধেক টাকা কেটে রাখাসহ ভূয়া নাম দিয়ে এবং তালিকাভূক্ত হওয়ার পরেও নানা অজুহাতে তাদের বাদ দিয়ে উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তার কার্যালয়ের কিছু অসাধু কর্মচারীর সহায়তায় লাখ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ ওঠেছে ওই চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে। নাম তালিকাভূক্তির জন্য প্রতিজনের কাছ থেকে এক থেকে দুই হাজার টাকা পর্যন্ত ঘুষ আদায় করা হয়েছে বলে ভূক্তভোগীদের অভিযোগ।
উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, সরকার দরিদ্র গর্ভবতী নারীদের নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিত করার লক্ষ্যে জনপ্রতি মাসে ৫শ’ টাকা হারে ২ বছরে ১২ হাজার টাকা ভাতা দেয়ার কর্মসূচী চালু করেছে। ওই কর্মসূচীর আওতায় প্রতি ছয় মাস পর একজন নারী তিন হাজার টাকা পান। সুবিধাভোগীদের জন্য দুই বছর পর্যন্ত এই অর্থ সহায়তা পাওয়ার বিধান রয়েছে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে উপজেলার ৯নং কলারদোয়ানিয়া ইউনিয়নের ৯টি ওয়ার্ডে ৭৯ জন দরিদ্র গর্ভবতী নারী ও শিশুর মা এ সুবিধা পাবেন। অনুসন্ধানে জানা যায়, ওই ৭৯ জন দরিদ্র নারী তাদের নাম তালিকাভুক্তির জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত সংরক্ষিত ওয়ার্ডের নারী সদস্যদের মাধ্যমে চেয়ারম্যান সাইদুল ইসলাম বাহাদুর ঝান্টু এক থেকে দুই হাজার টাকা করে আদায় করেছেন। নাম তালিকাভুক্ত হওয়ার পরেও তাদের নামে ইস্যুকৃত কার্ড সরবরাহ না করে তাদের কাছে আরও টাকা দাবী করে আসছেন। অনেকে প্রথমকিস্তির ৩ হাজার টাকা তুলে দাবী অনুযায়ি অর্ধেক টাকা দিতে বাধ্য হয়েছেন। অনেকে তাদের কার্ড না পেয়ে দিনের পর দিন তাদের শিশু সন্তান নিয়ে ২০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তার কার্যালয়ে ঘুরছেন।
গত সোমবার বেলা ১১টায় উপজেলা চত্ত্বরে এমন কয়েকজন নারীর সাথে কথা হলে তারা জানান, তাদের নাম তালিকাভুক্ত হলেও অফিস থেকে তাদের কার্ড সরবরাহ করা হচ্ছেনা। অফিস থেকে চেয়ারম্যানসহ আসতে বলা হচ্ছে।
কলারদোয়ানিয়া ইউনিয়নের ৮নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা সেলিমের স্ত্রী নাজমা বেগম বলেন, তালিকার ৬৩৬নং সিরিয়ালে আমার নাম। তালিকাভুক্ত হওয়ার জন্য আমি দাবী অনুযায়ী চেয়ারম্যানকে এক হাজার টাকা দিয়েছি। এখনও আমার কার্ড দেয়া হয়নি। চেয়ারম্যানকে জানালে তিনি মহিলা মেম্বারের কথা অনুযায়ী কাজ করতে বলছে। মহিলা মেম্বর সুলতানা আমার কাছে আরও দুই হাজার টাকা দাবী করছে। একই অভিযোগ করেন তালিকার ৬৪৯নং সিরিয়ালের তানিয়া বেগম ও ৬৬০নং সিরিয়ালের নাসরিন বেগম। ওই ইউনিয়নের ২০১৫-১৬ অর্থবছরের ২৬৭নং কার্ডধারী নিলুফা জানান, এক হাজার টাকা দিয়ে তিনি তালিকাভুক্ত হয়ে প্রথম কিস্তির ৩ হাজার টাকা উত্তোলন করেছেন কিন্তু তাকে আর কোন টাকা দেয়া হচ্ছে না। একই অভিযোগ ২৬৮নং কার্ডধারী প্রতিভা ঘরামীর। তিনি দুই কিস্তির টাকা পেলেও আর কোন টাকা পাচ্ছেন না। তারা ৭/৮ দিন উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তার কার্যালয়ে এসেও কোন সুফল পাননি। অফিস থেকে চেয়ারম্যানের সাথে যোগাযোগ করতে বলা হচ্ছে। চেয়ারম্যান বলছে মহিলা মেম্বারের সাথে দেখা করতে।
স্থানীয় যুবলীগ নেতা কবির হোসেন বাহাদুর বলেন, চেয়ারম্যান ঝান্টু’র বিরুদ্ধে অনেক দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। এলজিএসপি, কর্মসৃজন, টিআর, ভিজিডিসহ বিভিন্ন ভূয়া প্রকল্প দিয়ে তিনি লাখ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেছেন। আমরা তার বিরুদ্ধে দুদকে লিখিত অভিযোগ করবো।
সংরক্ষিত ওয়ার্ডের মহিলা সদস্য সুলতানা বেগম বলেন, আমাদের কথায় কেহ কি টাকা দেয়। চেয়ারম্যান পরিষদে মিটিং করে যে নির্দেশনা দিয়েছে সে অনুযায়ী আমরা ৫শ’ থেকে এক হাজার টাকা করে তুলে চেয়ারম্যানকে দিয়েছি। তার নির্দেশে ভিজিডি কার্ডের তালিকার করার জন্যও টাকা নেয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সাইদুল ইসলাম বাহাদুর ঝান্টু ঘুষ গ্রহণের কথা অস্বীকার করে সমকালকে বলেন, ‘এ ব্যাপারে আমি কিছুই জানিনা। ওটা মহিলা মেম্বারদের দায়িত্ব। সুলতানা মেম্বার বিভিন্ন নারীদের ভূয়া নাম দিয়ে টাকা তুলছে। তার বিরুদ্ধে অনেকে আমার কাছে অভিযোগ করেছে।’
নাজিরপুর উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তার দায়িত্বে থাকা নেছারাবাদ উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা নুসরাত জাহান মোবাইল ফোনে বলেন, ‘ভূক্তভোগী নারীদের উপজেলা নির্বাহী অফিসার বরাবরে লিখিত অভিযোগ দিতে বলেন। আমরা তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিবো।’
