প্রধান সূচি

এইচএসসি পরীক্ষায় পিরোজপুরে দুটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কেউ পাশ করেনি

উচ্চ মাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) পরীক্ষার ফলাফলে পিরোজপুরের দুটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ২৪ শিক্ষকের বিপরীতে ৭জন পরিক্ষার্থীর মধ্যে কেউ পাশ করতে পারেনি।
পিরোজপুর সদর উপজেলার কদমতলা জর্জ হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এ বছর ২ জন শিক্ষার্থী এ বছর এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয়। অন্যদিকে জেলার নাজিরপুর উপজেলার দীঘিরজান মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও কলেজ থেকে ৫জন পরীক্ষা দেয়। তবে এ দুটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ৭ জন পরীক্ষার্থীর কেউই পাশ করেনি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নাজিরপুর দীঘিরজান মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও কলেজ এর কলেজ শাখায় পাঠদানে অনুমতি পায় ২০১৪ সালে। এর মধ্যে গত ৪ বছরের এইসএসসির ফলাফলে দেখা যায় উত্তীর্ণর সংখ্যা থেকে অনুত্তীর্ণর সংখ্যাই বেশি রয়েছে। কলেজটিতে ২০২৩ সালে ৩৯জন পরিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিয়ে পাশ করেছিল ১৮জন, ২৪ সালে ২৭ জন পরিক্ষায় অংশ নিয়ে পাশ করে ১৩জন, গত বছর ২০২৫ সালে ১৫জন শিক্ষার্থী পরিক্ষা দিলেও পাশ করে মাত্র ৫ জন এবং এ বছর ২০২৬ সালে পরিক্ষায় ৫জন শিক্ষার্থী অংশ নেন। তবে একজনও পাশ করতে পারেনি। এই ৫জন শিক্ষার্থী ছিল মানবিক বিভাগের। প্রতিষ্ঠানটিতে শিক্ষক রয়েছে ৮ জন এবং কর্মচারী রয়েছে ২জন। পিরোজপুর সদর উপজেলার কদমতলা জর্জ হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজ এর কলেজ শাখায় ২০২৩ সালে পাঠ দানের অনুমতি পাওয়ার পর থেকে এখানেও পাশের হার কম ছিল। কলেজটিতে ২০২৩ সালে এইসএসসি পরিক্ষায় ১২ পরীক্ষার্থী অংশ নিয়ে ৬ জন পাশ করেছিল, ২০২৪ সালে ৭ জন পরিক্ষায় অংশ নিয়ে ৩জন পাশ করেছিল, গত বছর ২০২৫ সালে ৭জন অংশ নিয়ে ৪ জন পাশ করেছিল, এ বছর ২০২৬ সালে ৩জন পরিক্ষার ফর্ম ফিলআপ করলেও ২জন অংশ নিয়ে দুজনেই ফেল করেছে।
তবে কদমতলা কলেজটির স্কুল শাখায় ভিন্ন চিত্র দেখা যায়। গত ৪ বছরে পাশের হার অনেক বেশি। স্কুলটি থেকে ২০২৩ সালে এসএসসি পরিক্ষায় অংশ নেয় ৮৪ জন শিক্ষার্থী এর মধ্যে থেকে পাশ করে ৭৫ জন, এরপর ২০২৪ সালে ৭৫ জন পরিক্ষায় অংশ নিয়ে পাশ করে ৬৯ জন, গত বছর ২০২৫ সালে পরিক্ষায় অংশ নেয় ৭০জন এর মধ্যে থেকে পাশ করে ৪৮ জন এবং এবছর ২০২৬ সালে ৫০ জনে পাশ করে ৪৫ জন। অর্থাৎ এবছর এসএসসিতে পাশের হার ৮৬ শতাংশ। এ প্রতিষ্ঠানটিতে ১৬জন শিক্ষক ও ২জন কর্মচারী রয়েছে।
চলতি পিরোজপুর জেলায় এইচএসসি পরীক্ষায় মোট পরীক্ষার্থী ছিল ৭ হাজার ৯৮ জন। এর মধ্যে পরীক্ষায় অংশ নেয় ৬ হাজার ৭৮২ জন। উত্তীর্ণ হয়েছে ৩ হাজার ৪৯৬ জন। জেলায় পাসের হার ৫১ দশমিক ৫৫ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছে ৬৬ জন শিক্ষার্থী।
জেলার গত কয়েক বছরের এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলে দেখা যায়, ২০২৪ সালে জেলায় পাসের হার ছিল ৮৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ। ২০২৫ সালে তা কমে দাঁড়ায় ৬৪ দশমিক ০৭ শতাংশে। সর্বশেষ ২০২৬ সালে পাসের হার আরও কমে হয়েছে ৫১ দশমিক ৫৫ শতাংশ।
কদমতলা এলাকার এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক মো. সাইদুল ইসলাম বলেন, এই কলেজটিতে গত বছর কেউ ভর্তি হয়নি নতুন করে। গত বছরে যারা দুজন ছিল তারাই পরিক্ষা দিয়েছিল। তারা গত বছরেও ফেল করেছে এবছরও ফেল করেছে। তাই কলেজ শাখার এবছর রেজাল্ট খারাপ। কলেজটি যদি এমপিওভুক্ত হয় এবং সরকারি সকল সুবিধা পায় তাহলে স্থানীয় শিক্ষার্থীরা এখানেই ভর্তি হবে, রেজাল্টও ভালো হবে আসা করি।
স্থানীয় সুমি আক্তার নামে আরেক অভিভাবক বলেন, এখানে স্কুল শাখার পাশাপাশি কলেজ শাখায়ও রেজাল্ট ভালো হয়। তবে আমরা জানতে পেরেছি গত বছরে যারা এইসএসসি পরিক্ষা দিয়েছিল তারাই এবছর পরিক্ষা দিয়ে আবারও ফেল করেছে।
কদমতলা এলাকার দুই বাসিন্দা মো: মাসুম বিল্লাহ ও সুলতানা জেসমিন মাহিনুর বলেন, আমরাও এখানে লেখাপড়া করেছি। এখানে এসএসসির রেজাল্ট খুব ভালো হয়। ২০২৩ সালে এখানে কলেজ হয়েছে। কলেজটি এমপিওভুক্ত না হওয়ায় এখন থেকে যারা পাশ এসএসসি পাশ করে তারা অন্য কলেজে ভর্তি হয়। এই কলেজটি এমপিওভুক্ত হলে এখানের স্কুলের ছাত্ররা এখানেই ভর্তি হতে পারবে। তাহলে আমাদের বাচ্চাদের দূরে কোনো প্রতিষ্ঠানে যাওয়া লাগবে না। আমরা জোর অনুরোধ জানাই, আমাদের এই কলেজটি যেন এমপিও ভুক্ত হয়।
নাজিরপুর দিঘিরজান সেকেন্ডারি স্কুল অ্যান্ড কলেজ এর ব্যবসায়ী বিভাগের শিক্ষক সুমন বিশ্বাস বলেন, ২০১৪ সালে কলেজটি পাঠদানের অনুমতি পাওয়ার পর থেকে প্রতিবছরই পাবলিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করছে। বিগত বছরগুলোতে পরীক্ষার ফলাফল মোটামুটি সন্তোষজনক ছিল। তবে প্রতিষ্ঠানটি নন-এমপিওভুক্ত হওয়ায় শিক্ষকরা সরকারিভাবে কোনো বেতন-ভাতা পান না। ফলে শিক্ষকরা আর্থিক অসচ্ছলতার মধ্যে জীবনযাপন করছেন।
তিনি আরও বলেন, নন-এমপিওভুক্ত হওয়ায় এ প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী ভর্তি হতে চায় না। তারপরও কলেজটি টিকিয়ে রাখতে প্রতিবছর শিক্ষার্থীদের উদ্বুদ্ধ করে কিছু শিক্ষার্থী ভর্তি করানো হয়। শিক্ষার্থীদের নিয়মিত ক্লাসমুখী করতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হলেও বাস্তবে উপস্থিতি নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। শিক্ষার্থীরা ক্লাস করার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হলেও কলেজে আসে না। এর ফলে পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে এবং পরীক্ষার ফলাফলেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। আজ ছয়জন শিক্ষক উপস্থিত থাকলেও একজন শিক্ষার্থীও কলেজে আসেনি। শিক্ষার্থীরা নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিত না হলে ভালো ফলাফল করা সম্ভব নয়। শিক্ষার্থীদের অনুপস্থিতিই ফলাফল বিপর্যয়ের অন্যতম প্রধান কারণ।
পিরোজপুর সদরের কদমতলা জর্জ হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. হাফিজুর রহমান বলেন, আমাদের বিদ্যালয় শাখার ফলাফল ভালো। কলেজ শাখার পাঠদানের অনুমতি পাওয়ার পর থেকে ফলাফলও সন্তোষজনক ছিল। তবে এ বছর নতুন কোনো শিক্ষার্থী ভর্তি না হওয়ায় ফলাফলে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। এ অবস্থার উন্নতি করতে হলে কলেজ শাখাটিকে এমপিওভুক্ত করা জরুরি।
তিনি আরও বলেন, এটি গ্রাম পর্যায়ের একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এখানে কলেজ শাখায় পাঠদানের জন্য প্রয়োজনীয় বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক নেই। ফলে বিদ্যালয় শাখার শিক্ষকদের দিয়েই কলেজের কার্যক্রম পরিচালনা করতে হচ্ছে। কলেজটি এমপিওভুক্ত হলে প্রয়োজনীয় বিষয়ে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া সম্ভব হবে। এতে বিদ্যালয় শাখার শিক্ষার্থীদের উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে পড়াশোনার জন্য শহরমুখী হতে হবে না। তারা নিজ প্রতিষ্ঠানেই পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারবে। পাশাপাশি শিক্ষার মান উন্নয়নের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের ধারাবাহিক ভালো ফলাফলও ধরে রাখা সম্ভব হবে।
বরিশাল অঞ্চলের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা পরিচালক প্রফেসর মো. জাকির হোসেন বলেন, যেসব প্রতিষ্ঠান পাস করেনি সেসব প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষকদের নিয়ে জেলা ভিত্তিক একটা মিটিং করা হবে। যেসব প্রতিষ্ঠান জিরো পাস, ওইসব প্রতিষ্ঠান বেশিরভাগই নন এমপিও। আমরা এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানে ব্যবস্থা নিতে পারি, নন এমপিওরা তো চেষ্টা করে যাচ্ছে। এছাড়া প্রতিষ্ঠানগুলোর বিগত দিনের কার্যক্রম পর্যালোচনা করে একটা পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

Please follow and like us:





উত্তর দিন

Wordpress Social Share Plugin powered by Ultimatelysocial