প্রধান সূচি

করোনাভাইরাস প্রতিরোধে প্রয়োজন সতর্কতা : কেবল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, বন্ধ হোক কোচিং বাণিজ্যও

করোনাভাইরাস নিয়ে গোটা বিশ্ব আতঙ্কিত। আমাদের পাশর্^বর্তী দেশ ভারতেও ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এ পর্যন্ত ভারতে আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১১৪। ইতোমধ্যে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয়েছে ২ জনের। দেশটির বিভিন্ন রাজ্যে বন্ধ করা হয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সিনেমা হল, শপিং মল। মুম্বাইয়ে জারি করা হয়েছে ১৪৪ ধারা। দু’শোর বেশি লোকের যে কোনো ধরণের জমায়েত নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এই মর্মে সমন জারি করেছে দিল্লি সরকার। এ ভাইরাস প্রতিরোধ ভারত সরকার সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে। বৈশি^ক পরিস্থিতি দিন দিন অবনতির দিক যাচ্ছে। এখন পর্যন্ত করোনাভাইরাসে মারা গেছে ৬ হাজার ৭০৫ জন। আক্রান্ত হয়েছে ১৫৯ টি দেশের ১ লাখ ৭৪ হাজর ৬১৫ জন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রধান টেড্রোস আধানোম বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে এটা হয়তো কেবল শুরু হতে পারে। আরো কঠিন সময় সামনে অপেক্ষা করছে। তাই সতর্ক থাকার নির্দেশ দিয়েছেন সংস্থাটির প্রধান।
চীনের হুবেই প্রদেশের রাজধানী উহান শহরের একটি বন্যপ্রাণীর বাজার থেকে ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে ছড়িয়ে পড়ে করোনাভাইরাস। এর পর পরই বিশ্বজুড়ে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থা। ক্রমবর্ধমান এই পরিস্থিতি সামাল দিতে সংস্থাটি বিশে^র সকল দেশকে করোনাভাইরাস প্রতিরোধে তৈরি থাকার আহ্বান জানান। আক্রান্তদের দ্রুত শনাক্তকরণ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য ল্যাবরেটরির ব্যবস্থা করতেও বলা হয়। বিভিন্ন সরঞ্জাম প্রস্তুত রাখার বিষয়েও জনস্বাস্থ্যের প্রয়োজনে জোর তাগিদ দেয়া হয়। যাতে স্বল্প সময়ের মধ্যে এ সরঞ্জামগুলো কাজে লাগানো যায়।
বিশ্ব জুড়েই ত্রাস সৃষ্টিকারী করোনা গ্রুপের একটি ভাইরাস হলো কোভিড-১৯। এই ভাইরাস কী এবং কীভাবে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে এ বিষয়ে ন্যাশভিল-এর ভ্যান্ডারবিল্ট বিশ্ববিদ্যালয় মেডিক্যাল সেন্টারের সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ উইলিয়াম শ্যাফনার বলেন, রোগাক্রান্ত মানুষের হাঁচি-কাশির ড্রপলেট বায়ুতে ঘুরে বেড়ায়। রোগীর কাছাকাছি থাকা সুস্থ মানুষের নাক, মুখ ও চোখের মাধ্যমে তার শরীরে প্রবেশ করে এই ড্রপলেট। শরীরে এসেই ভাইরাসের অণুগুলো দ্রুত নাসাপথের পিছন দিকে বা গলার ভিতরের দিকে মিউকাস মেমব্রেনের ভিতরে গিয়ে সেখানকার কোষে হানা দেয়। সেই কোষই তখন হয়ে যায় গ্রাহক বা রিসেপ্টর কোষ।
করোনাভাইরাসের দেহতল থেকে উঠে আসা বা স্পাইকের আকারে অবস্থান করা প্রোটিনকণাগুলো কোষের আস্তরণকে আঁকড়ে ধরে ভাইরাসের জিনগত উপাদানকে সুস্থ মানুষটির দেহকোষে প্রবেশ করতে সাহায্য করে। ভাইরাসের এই জিনগত উপাদানগুলো কোষের বিপাক ক্ষমতার উপর একপ্রকার দখল নিয়ে কোষকে নির্দেশ দেয় ‘ভুলভাল’ কাজ করার জন্য। কোষকে নিয়ন্ত্রণ করেই সে তাকে দিয়ে সেই ভাইরাসের বৃদ্ধি ও বেড়ে ওঠায় সাহায্য করতে কোষকে বাধ্য করে। এই ভাইরাস যখন ফুসফুসে এসে পৌঁছয়, তখন ফুসফুসের মিউকাস মেমব্রেনে প্রদাহ তৈরি হয়।
কোষ যখন বাধ্য হয়ে ভাইরাসের বৃদ্ধি ও ফুলেফেঁপে ওঠার কাজে মন দেয়, তখন বেড়ে যাওয়া ভাইরাস অণুগুলো ফেটে গিয়ে গ্রাহক কোষের চারপাশে থাকা অন্যান্য কোষগুলোকেও আক্রমণ করে। এরই উপসর্গ হিসেবে গলাব্যথা ও শুকনো কাশি শুরু হয়। এর পর দ্রুত এই ভাইরাস ব্রঙ্কিওল টিউবে ছড়িয়ে পড়ে। যখন বাড়তে বাড়তে সেই ভাইরাস ফুসফুসে এসে পৌঁছয়, তখন ফুসফুসের মিউকাস মেমব্রেনে প্রদাহ তৈরি হয়। এটি অ্যালভিওলাই ও ফুসফুসের থলিগুলোর ক্ষতি করে। ফলে এদের পক্ষে সারা শরীরে অক্সিজেন সরবরাহ করা ও কার্বন ডাই অক্সাইড অপসারণ করার কাজটাও খুব কঠিন হয়ে পড়ে।
দেখা যায়, এই ভাইরাসের প্রকোপে কেউ কেউ খুবই অসুস্থ বোধ করেন আবার কারো কারো ক্ষেত্রে অতটা প্রভাব বিস্তার করতে পারে না। এর কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোনো ব্যক্তির প্রতিরোধ ক্ষমতা কতটা শক্তিশালী বা দুর্বল, তার উপর নির্ভর করে এই অসুখ কার শরীরে কতটা প্রভাব বিস্তার করতে পারবে। বয়স্ক ব্যক্তি বা ডায়াবেটিস, নিউমোনিয়া, উচ্চ রক্তচাপ ও অন্য কোনো দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতার সমস্যায় ভুগলে রোগের লক্ষণ গুরুতর ভাবে প্রকাশ পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক সুমিত সেনগুপ্তের মতে, এই ভাইরাস শরীরে ঢোকার পর প্রায় এক সপ্তাহ ধরে স্থিতিশীল থাকতে পারে। অর্থাৎ, শরীরে প্রবেশ করার পর এক সপ্তাহ ঘাপটি মেরে সুপ্ত অবস্থায় থাকতে পারে। তার পর হঠাৎ জ্বর-সর্দি-কাশি বা নিউমোনিয়ার লক্ষণ প্রকাশ পেতে শুরু করে। সুস্থ হয়ে ওঠার কিছু দিন পরে ফের এই লক্ষণ দেখা দিতে পারে। কাজেই সুস্থ হয়ে উঠলেই ভয় নেই এমনটি ধরা নেয়া ঠিক নয়। জ্বর-সর্দি-কাশির সঙ্গে ট্র্যাকিয়া ও শ্বাসনালীতে সংক্রমণের জন্য শ্বাসকষ্টও শুরু হয়। পেটের অসুখও দেখা দিতে পারে, যদি এই ভাইরাস গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইনাল সিস্টেমকেও আক্রমণ করে বসে।
এই ভাইরাসকে থেকে বাঁচতে বারবার সাবান বা ৬০ শতাংশ অ্যালকোহল রয়েছে এমন স্যানিটাইজার দিয়ে হাত ধোয়াও খুব জরুরি। শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে স্বাস্থ্যকর খাওয়াদাওয়া অব্যাহত রাখা এবং ধূমপান ও মদ্যপান বন্ধ করে শরীরে অন্য অসুখের হানা আটকানোটাও জরুরি। শরীর যত রোগমুক্ত থাকবে, ততই রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়বে।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলছেন, করোনাভাইরাসকে কাবু করার তেমন কোনও প্রতিষেধক বা ওষুধ নেই বলেই এই ভাইরাসের হানা ঠেকাতে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার উপর অনেরকটা ভরসা করতে হচ্ছে তাঁদের।
পুষ্টিবিদ সুমেধা সিংহের মতে, ‘শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার অনেকটাই আসে দৈনন্দিন খাবারের হাত ধরে। কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন, ফ্যাট সবরকম খাবারই রাখতে হবে খাদ্য তালিকায়। দুগ্ধজাত ও দানা জাতীয় সব্জির মধ্যে অ্যান্টিইনফ্লামেটরি উপাদান বেশি থাকে বলে তাও শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়।’
অতিরিক্ত চিনি বা নুন মেশানো খাবার পরিহার করতে হবে। বাদ দিতে হবে প্যাকেটজাত ও প্রক্রিয়াজাত খাবার। জাঙ্ক ফুড ও তেলে ভাজা খাবারও ছেড়ে দিতে হবে। খেতে হবে দেশি ঘি ও মধু। যদি এগুলো খাঁটি হয় তাহলে রোগ প্রতিরোধে খুব সাহায্য করবে। জোর দিতে হবে প্রাণীজ ও উদ্ভিজ্জ প্রোটিন জাতীয় খাবারে। ডাল, দানাশস্য জাতীয় খাবার, রাজমা যেমন উপকার করবে, তেমনই খাদ্য তালিকায় রাখতে হবে সিদ্ধ মাংস, মাছ ও ডিম। হাফ বয়েল ডিম বা পোচ নয়, বরং সম্পূর্ণ করা ডিম বা অমলেট খেতে হবে। নুন ছাড়া বাদাম, আমন্ড ও কল বেরনো ছোলা রাখতে হবে বিকেলের টিফিনে। সজনে ডাঁটা ও সজনে ফুল এই আবহাওয়ায় ভাইরাস ঠেকাতে সক্ষম। তাই চেষ্টা করুন প্রতি দিন এদের খাবার মেন্যু হিসেবে রাখতে। টক দই, সবুজ শাকসব্জি ও ফলে প্রচুর অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট থাকে, তাই পর্যাপ্ত পরিমাণে খেতে হবে এগুলো। ভাত খাওয়ার অভ্যাস না থাকলে পথ্য হিসেবেই যোগ করতে পারেন লাল বাদামী বা কালো চাল। এই ধরনের চালে অ্যান্টিঅক্সিড্যান্টের পরিমাণ বেশি থাকে। শরীরের প্রয়োজন বুঝে প্রতি দিন পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি পান করুন।
করোনাভাইরাসের সতর্কতার অংশ হিসেবে ৩১ মার্চ পর্যন্ত বাংলাদেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করা হয়েছে। ছুটি থাকাকালীন এই সময়ে শিক্ষার্থীরা যেন বাড়িতে থাকেন সেটি নিশ্চিত করতে অভিভাবক ও সংশ্লিষ্ট সবাইকে অনুরোধ জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি। সব কোচিং সেন্টারগুলো বন্ধ রাখার ঘোষণা দেন শিক্ষামন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকা মানে এই নয় যে, তারা সর্বত্র ঘুরে বেড়াবে কোচিং-এ যাবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করা হয়েছে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে যেন করোনাভাইরাসের সংক্রমণ না হয়। এটাকে হালাকাভাবে নেয়ার সুযোগ নেই। অভিভাবকসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে সেটা নিশ্চিত করতে হবে।’
শিক্ষামন্ত্রী বারবার জোর দিয়েছেন করোনাভাইরাসের সংক্রমণ এড়াতেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করা হয়েছে। তাই কোনো শিক্ষক বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যদি অতিরিক্ত ক্লাসের নামে বা অন্য কোনো উপায়ে ক্রান্তিকালীন এই সময়ে শিক্ষার্থীদের নিয়ে প্রাইভেট বাণিজ্য অব্যাহত রাখেন তা অবশ্যই আইনের চরম লঙ্ঘন। এবং নাগরিকদের বিপদের দিকে ঠেলে দেওয়া। এমতাবস্থায় এ জাতীয় কোনো অপরাধ করলে তারা যেন কোনোভাবেই আইনের হাত থেকে বেরিয়ে যেতে না-পারে। এ বিষয়টি মনিটরিং এর আওতায় না-থাকলে এভাবেও ছড়িয়ে পড়তে পারে করোনা। সেইসাথে বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠান, ট্রেনিং সেন্টার সহ জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে লোক জমায়েতের বিভিন্ন মাধ্যমগুলোর ব্যাপারেও ভাবতে হবে সরকারকে। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে করোনাভাইরাস আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০। আমরা যে বিপদের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি না, তা কিন্তু নয়। ঘনবসতিপূর্ণ ও অসচেতন মানসিকতার একটি দেশে বিষয়টি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। আশা করি সরকারের সর্বোচ্চ সতর্কতা এটিকে কোনোভাবেই মহামারিতে রূপ নিতে দেবে না। (ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত)
লেখক : সাহিত্যিক ও গবেষক

Please follow and like us:





উত্তর দিন

Wordpress Social Share Plugin powered by Ultimatelysocial