বৈরী আবহাওয়ায় সুন্দরবনে আহরিত মাছ পঁচে যাচ্ছে
রোদের অভাবে শুটকি প্রক্রিয়াকরণ বন্ধ হয়ে গেছে
বঙ্গোপসাগর পাড়ের সুন্দরবনের দুবলার চরে মৎস্য আহরণ ও শুটকি প্রক্রিয়াকরণ মৌসুমের শুরুতেই জেলে ও মৎস্যজীবীরা হোঁচট খেতে শুরু করেছেন। নভেম্বর মাসে ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের তান্ডবের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই চলতি ডিসেম্বর মাসে দেখা দিয়েছে বৃষ্টি, কুয়াশা আর মেঘ। এ অবস্থায় রোদের অভাবে সাগর থেকে আহরিত বিপুল পরিমান সামুদ্রিক মাছ শুকাতে না পারায় তা পঁচে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে প্রচন্ড ঠান্ডা, কুয়াশা আর বৈরী আবহাওয়ায় বিপুল সংখ্যক জেলে গভীর সাগর থেকে ট্রলার নিয়ে সুন্দরবন উপকূলে ফিরে এসেছে। অমাবশ্যার ভরা গোনে এসব জেলেরা এখন দুবলার চর ও সুন্দরবনের আশপাশ এলাকায় অলস সময় অতিবাহিত করছে। এতে করে সুন্দরবন উপকূলের জেলে ও মৎস্যজীবিরা মোটা অংকের টাকার আর্থিক ক্ষতির সষ্মূখীন হচ্ছেন।
জানা গেছে, বহু বছর ধরে অক্টোবর মাস থেকে বঙ্গোপসাগর সংলগ্ন সুন্দরবনের দুবলার চরে সামুদ্রিক মৎস্য আহরণ ও শুটকি প্রক্রিয়াকরণের মৌসুম শুরু হয়ে আসলেও ৭ অক্টোবর থেকে ৩০ অক্টোবর পর্যন্ত ইলিশসহ সব ধরনের মৎস্য আহরণ নিষিদ্ধ থাকায় এবার ৩০ অক্টোবর রাত ও ৩১ অক্টোবর ভোর ভোর থেকেই শুরু হয় সামুদ্রিক মৎস্য আহরণ ও শুঁটকি প্রক্রিয়াকরণের মৌসুম। মৌসুমের শুরুতেই ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের তান্ডবে দুবলার জেলে ও মৎস্যজীবিরা প্রথম দফায় ব্যাপক হোচট খায়। এ সময় তারা বিপুল অংকের টাকার লোকসানে পড়ে। এরপর পুনরায় ঘুঁরে দাঁড়ানোর চেষ্টার মধ্যে সাম্প্রতিক সময়ে দ্বিতীয় দফায় হোচট খেতে শুরু করেছে। গত দু’দিন ধরে সুন্দরবন উপকূলে থেমে থেমে হালকা থেকে মাঝারী ধরনের বৃষ্টিপাত হচ্ছে। সে সাথে নদী ও সাগরে পড়ছে কুয়াশা। আকাশ রয়েছে মেঘাচ্ছন্ন। রোদের কোথাও দেখা নেই। এ অবস্থায় সাগর থেকে আহরিত সামুদ্রিক মাছ শুটকি প্রক্রিয়া করণের জন্য রোদের অভাবে শুকানো যাচ্ছে না। অধিকাংশ মাছ পঁচে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। অবশ্য সামান্য কিছু মাছ বরফ দিয়ে লোকালয়ের বাজারে সরবরাহ করা হচ্ছে।
সাগরগামী মৎস্যজীবীদের বৃহৎ সংগঠন ‘দুবলা ফিশারম্যান গ্রুপ’র সভাপতি কামাল উদ্দিন আহমেদ জানান, সাম্প্রতিককালে বৃষ্টি, মেঘাচ্ছন্ন আকাশ আর বৈরী আবহাওয়ার কারণে অধিকাংশ জেলে গভীর সমুদ্র থেকে মাছ না ধরে দুবলার চর এলাকায় চলে এসেছে। এ ছাড়া রোদের অভাবে মাছ শুকানো না যাওয়ায় তা পঁচে যাচ্ছে। এতে একদিকে সাগরে মাছ আহরণ বন্ধ রয়েছে অন্যদিকে শুঁটকি প্রক্রিয়াকরণও করা যাচ্ছে না। প্রচন্ড ঠান্ডায় জেলে ও মৎস্যজীবিদের অনেকেই অসুস্থ্য হয়ে পড়ছেন। কাটাচ্ছেন মানবেতর জীবন যাপন। তিনি বলেন, এখানকার গত কয়েক দিনের বৈরী আবহাওয়ার কবলে পড়ে জেলে, মৎস্যজীবিসহ এ খাতে অন্তত কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।
দুবলার চর এলাকার মোংলার মৎস্যজীবি জালাল উদ্দিন আহম্মেদ বুলবুল জানান, জেলে ও মৎস্যজীবিরা ধার দেনা আর ঋণ করে সাগরে মাছ আহরণ ও শুটকি প্রক্রিয়ায় এসেছে। সমুদ্রে মৎস্য আহরণ ও শুটকি মৌসুমকে ঘিরে এ বছরও সুন্দরবনের দুবলার চর, মেহেরআলীর চর, আলোরকোল, অফিসকিল্লা, মাঝেরকিল¬া, শেলার চর ও নারকেলবাড়িয়ার চরে সমবেত হবেন হাজার হাজার জেলে-মহাজন। এভাবে দুর্যোগ অব্যাহত থাকলে কি করে তাদের কর্জ ও দেনা শোধ করবেন না নিয়ে হা হুতাশ আর হতাশায় ভুগছেন।
সুন্দরবনের দুবলার চর জেলে পল্লীর ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা অসিত কুমার রায় বলেন, আগামী মার্চ মাস পর্যন্ত মোংলা, রামপাল, খুলনা, সাতক্ষীরা, পিরোজপুর, বরগুনা, পটুয়াখালী ও বরিশালসহ সুন্দরবন উপকূলের কয়েক হাজার জেলে মাছ আহরণ ও শুটকি তৈরির জন্য সাগর পাড়ে অস্থায়ী বসতি গড়ে তুলেছে। এছাড়া বৃহত্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলের জেলে ও মৎস্যজীবীরাও এসেছে এ চরে। ইতোমধ্যে উপকূলের হাজার হাজার জেলে ও মৎস্যজীবীরা দুবলার চর এলাকায় মাছ আহরণ ও শুটকি তৈরির কাজে যোগ দিয়ে দু’দফায় বিপর্যয়ের মধ্যে পড়ে মোটা অংকের টাকার ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন।
পূর্ব সুন্দরবনের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) বেলায়েত হোসেন বলেন, শেষ মৌসুম পর্যন্ত আর যদি দুর্যোগ না ঘটে তাহলে আশা করা যায় এবার জেলেরা পর্যাপ্ত মাছ আহরণ ও শুটকি প্রক্রিয়া করে লাভবান হবেন। এতে করে বন বিভাগের টার্গেট করা রাজস্ব আয়ও পুরোপুরি আদায় সম্ভব হবে।
