প্রধান সূচি

সরকারী সম্পত্তিতে স্কুল ঘর ॥ মাধ্যমিক স্কুলের শিক্ষার্থী দিয়ে পিএসসি পরীক্ষা

দুর্নীতি, অনিয়ম আর বেহাল দশার এক করুণ চিত্র ফুটে উঠেছে পিরোজপুর জেলার নাজিরপুর উপজেলার ১৮২নং দক্ষিণ দীর্র্ঘা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। স্কুল সৃষ্টির জন্মলগ্ন থেকেই বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটি গঠন, শিক্ষক নিয়োগ, শিক্ষার্থীদের ভর্তি, শিক্ষাদান, হাজিরাসহ নানা বিষয় দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ তো আছেই। এখন তা আরও ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। অনুপস্থিত শিক্ষার পরিবেশ থাকা এ বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের দুর্নীতি অনিয়ম নিয়ে দীর্ঘদিনের দলাদলির ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট বিভাগসহ নানা দপ্তরে একাধিক অভিযোগ করা হলেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি এখানে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নাজিরপুর উপজেলার দক্ষিন দীর্ঘায় স্থানীয় প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের শিক্ষাদানের উদ্দেশ্যে দক্ষিণ দীর্ঘা প্রাথমিক বিদ্যালয় সরকারি সম্পত্তির উপর স্থাপন করা হয়। ওই সময় কাগজপত্রে বিদ্যালয়ের নামীয় সম্পত্তি রেজিষ্ট্রেশন করা হয় মাঠের মধ্য থেকে। আর জমিদাতা হিসেবে জমি দান করেন স্থানীয় মৃত উপেন্দ্রনাথ মন্ডলের ছেলে নিহার রঞ্জন মন্ডল। জমিদাতা হিসেবে তিনি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাতা কমিটির সভাপতিও ছিলেন। কিন্তু এরপর দিনে দিনে তথাকথিত বিদ্যালয় পরিচালনার নামে একচ্ছত্র কতৃত্ব চলে যায় বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক টুটু রানী হালদার ও তার স্বামী বাবুল বড়ালের কাছে। কেননা সহকারি শিক্ষক হিসেবে কর্মরত থাকা এই টুটু রানী হালদারের সাথে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মাধুরী মন্ডল, সহকারি শিক্ষক বনানী হালদার, অনিমা বিশ্বাস এরা সবাই নিজেদের মধ্যে গভীর সখ্যতা গড়ে তোলার সুযোগ পান বলে অভিযোগ রয়েছে।

সূত্র মতে, ২০০৫ সালে যাত্রা শুরু হয় বিদ্যায়টির, নিবন্ধিত হয় ২০১০ সালে আর শিক্ষার্থী থাকুক বা না থাকুক অজ্ঞাত কারণে জাতীয়করণ হয় ২০১২ সালে। সরকারি-বেসরকারি কর্তাব্যক্তিরা বিদ্যালয় পরিদর্শনে আসলে পার্শ্ববর্তী একটি পাঠশালা এমনকি এর বাইরে থেকেও শিক্ষার্থী এনে কয়েক ঘন্টার জন্য একটি পড়াশোনার চিত্র প্রদর্শিত হয়েছে বিদ্যালয়টিতে। চলতি বছরের সদ্যসমাপ্ত প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষায় বড় ধরণের ঘটনা ঘটানো হয়েছে এ বিদ্যালয়টির কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে। মূলত: বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণীর ছাত্রী মাত্র একজন। প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষায় নিপা মন্ডল এর বিপরীতে কাগজে-কলমে পরীক্ষার্থী দেখানো হয়েছে ৪ জন অর্থাৎ অংশগ্রহণকারী পরীক্ষার্থীদের মধ্যে তিনজনই পার্শ্ববর্তী একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সাথে যোগসাজশে নাম পরিবর্তন করে ভাড়া করা হয়েছিল। এ ভাড়াটে পরীক্ষার্থীদের মধ্যে ২ জন ষষ্ঠ শ্রেণি এবং একজন অষ্টম শ্রেণীর শিক্ষার্থী ছিল। যদিও পিএসসির সব বিষয়ের পরীক্ষাগুলোতে ৪জনের ২জন অংশগ্রহণ করেনি। ১৮২নং দক্ষিণ দীর্ঘা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়টিতে প্রকৃতপক্ষে সর্বমোট ১৪/১৫ জনের বেশি শিক্ষার্থী নেই। অনুসন্ধান করলে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসবে বলে ওই এলাকার কয়েকজন দায়িত্বশীল ব্যক্তি এ প্রতিবেদককে জানিয়েছেন। এছাড়া ইতিমধ্যে বিভিন্ন তহবিল থেকে আসা লক্ষাধিক টাকা কোন হিসেব পাওয়া যাচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে।

জানতে চাইলে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার জেসের আলী বিশ^াস বলেন, আমি পত্রিকায় বিভিন্ন সময় সংবাদ এর মাধ্যমে এ তথ্য পেয়েছি। এসব অভিযোগের বিষয়ে আমি নাজিরপুরের উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসারকে তদন্তের দায়িত্ব দিয়েছি। তিনি যে তদন্ত রিপোর্ট দিবেন সেটি পেলে আমি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠাব।

নাজিরপুর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার শিকদার আতিকুর রহমান জুয়েল বলেন, ভাড়া করা শিক্ষার্থী দিয়ে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষায় অংশগ্রহণ ও সরকারি সম্পত্তিতে স্কুল প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে আমি অবগত নই, তবে বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী কম আছে সে বিষয়ে আমি তদন্তের নির্দেশ দিয়েছি। অন্য সব বিষয়ে তদন্ত করে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

এ ব্যাপারে নাজিরপুর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা শিক্ষক সমিতির সভাপতি মো. কামরুল ইসলাম বলেন, প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই বিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত শিক্ষক ও শিক্ষার্থী ছিল। বর্তমানে ম্যানেজিং কমিটির কোন্দলের কারণে শিক্ষার্থী কম। ক্যাচমেন্ট সমস্যা থাকার কারণে অভিভাবকরা তাদের শিশুদের বিদ্যালয় থেকে সরিয়ে নিচ্ছেন। তবে বিদ্যালয় সরকারি হয়েছে এবং উপবৃত্তি যদি চালু হয় তবে আগামীতে শিক্ষার্থী আসবে। সরকারিকরণের সময় ৫ জনের মধ্যে ৪ জন শিক্ষকের বেতন ভাতা চালু হয়েছে।

এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা মাধুরী রাণী বলেন, আমরা তো বিদ্যালয়ের কার্যক্রম ঠিকঠাকমতো চালিয়ে যাচ্ছি। সহকারী শিক্ষক শিক্ষিকা অনিমা বিশ্বাস এর সাথে কথা বলে জানতে চাইলে তিনি নীরবতা পালন করে প্রকারান্তে সব প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে যান।

বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির বর্তমান সভাপতি দীর্ঘা এমএল মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও ভোকেশনাল স্কুলের কর্মচারী হিসেবে কর্মরত মিল্টন রায়ের বক্তব্য জানতে মুঠেফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তার ব্যবহৃত নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়।

এ ব্যাপারে দীর্ঘা এমএল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক (যিনি পিইসি পরীক্ষার কেন্দ্র সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন) অশোক কুমার সমাদ্দার বলেন, অভিযোগ সত্য হলে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।

Please follow and like us:





উত্তর দিন

Wordpress Social Share Plugin powered by Ultimatelysocial