প্রধান সূচি

বাগেরহাট বিআরটিএ’র মটরযান পরিদর্শকের বিরুদ্ধে সাড়ে ৩ কোটি টাকা ঘুষ গ্রহনের অভিযোগ

বাগেরহাট বিআরটিএ কার্যালয়ের মটরযান পরিদর্শকের বিরুদ্ধে গত দুই বছরে সাড়ে ৩ কোটি টাকা ঘুষ গ্রহনসহ নানাবিধ অভিযোগ পাওয়া গেছে। এমন কি প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকার ঝঊওচ প্রকল্পের প্রশিক্ষনার্থী ড্রাইভাররাও এই ঘুষের আওতা থেকে বাদ পড়েননি। তাদের কাছেও জনপ্রতি ৩ হাজার করে টাকা দাবী করা হয়েছে। টাকা দিতে অস্বীকারকারী ড্রাইভারদের পরীক্ষায় ফেল করানো হচ্ছে। ফলে বাধ্য হয়েই ড্রাইভিং লাইসেন্সপ্রাপ্তরা দালালের মাধ্যমে টাকা দিয়ে মটরযান পরিদর্শকের নেক নজর লাভ করছেন। এদিকে বৃহষ্পতিবার সকালে বাগেরহাট আইন শৃংঙ্খলা কমিটির সভায় বিআরটিএ’র পরিদর্শকের ঘুষ গ্রহনের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।
বাগেরহাট টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজের অধ্যক্ষ প্রকৌশলী সেখ মনিরুজ্জামান ও শিক্ষার্থীরা বিআরটিএ’র চেয়ারম্যান বরাবর অভিযোগ করেছেন। লিখিত ওই অভিযোগে জানা গেছে, বাগেরহাট টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকার ঝঊওচ প্রকল্পের অধীনে ৪ মাস ধরে প্রায় অর্ধশত বেকার যুবক ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ গ্রহন করেছে। তারা প্রশিক্ষন গ্রহনকালে উল্টো আরও টাকা পেয়েছে। সেই প্রশিক্ষনার্থীরা ড্রাইভিং লাইসেন্স চেয়ে আবেদন কারার পর পরীক্ষার্থীদের ঢালাওভাবে অকৃতকার্য করা হয়। পরে দ্বিতীয় দফায় জনপ্রতি ৩ হাজার টাকা দাবী করা হয়। আর সেই টাকার প্রদানের জন্য পরিদর্শকের মিঠু নামের এক আত্মীয়ের সাথে যোগাযোগ করতে বলা হয়।
এছাড়া গত ২১ অক্টোবর পরীক্ষার দিন ধার্য থাকলেও গতকাল ৯ অক্টোবর সেইসব প্রার্থীদের বহিরাগত দালাল মারফত মোবাইলে ফোন দিয়ে ডেকে এনে পরীক্ষা নেওয়া হয়। এরমধ্যে ফকিরহাটের আট্টাকী গ্রামের শেখ ইশারাত আলীর ছেলে শেখ ইবাদত আলী ১১৪ নম্বর রোলধারী এক প্রার্থী অনলাইনে আবেদন করায় তাকে পরীক্ষা কেন্দ্র থেকে বের করে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। তার পরীক্ষার তারিখ ছিল ২১ অক্টোবর। তাকে ৮ অক্টোবর সন্ধ্যায় মোবাইলে বিআরটিএ অফিসের কর্মচারী পরিচয় দিয়ে এক দালাল ফোন দিয়ে বলেন ৯ অক্টোবর পরীক্ষায় আসতে। এদিন পরীক্ষা কেন্দ্র থেকে তাকে বের করে দেওয়া হয়। পরে সাংবাদিক ও ট্রাফিক পুলিশের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সহায়তায় তিনি পরীক্ষা দিতে পারেন।
বাগেরহাট বিআরটিএ’র সহকারী পরিচালক প্রকৌশলী তানভীর আহম্মেদ জানান, ড্রাইভিংয়ের শিক্ষানবীশ (লারনার) বাবদ সরকারী ফি ৩৪৫ টাকা থেকে ৫১৮ টাকা। আর ড্রাইভিং লাইসেন্স (ডিএল) বাবদ সরকারী ফি ২৫৪২ থেকে ১৬৮৯ টাকা। এই টাকা সরকারী রাজস্ব হিসেবে জমা হয়। তবে তিনি মটরযান পরিদর্শকের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ এসেছে বলে উল্লেখ করে বলেন, উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাথে আলাপ করে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে। তিনি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর আহবানে সাড়া দিয়ে বাগেরহাট বিআরটিএ কার্যালয় শতভাগ দুর্নীতিমুক্ত করতে প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখবেন বলে উল্লেখ করেন।
এদিকে, বাগেরহাট বিআরটিএ কার্যালয়ে ড্রাইভিং লাইসেন্সের জন্য আসা একাধিক ব্যক্তি অভিযোগ করেছেন লারনার ও ড্রাইভিং লাইসেন্সের জন্য বাগেরহাট বিআরটিএ’র সাথে যুক্ত একাধিক দালাল কাজ করছে। তাদের মাধ্যমে সাড়ে ৭ হাজার থেকে ৮ হাজার টাকা প্রদান করলে ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়া যায়। তবে শর্ত থাকে পরীক্ষার দিন পরীক্ষায় অংশ নিতে হবে। প্রতি পরীক্ষায় প্রায় ১৫০ জন অংশ নেয়। এর ভিতর থেকে চুক্তি অনুযায়ী যারা এগিয়ে থাকবে তাদের কৃতকার্য করা হয়। আর যারা চুক্তিতে আসতে অপারগতা দেখায় তাদের অকৃতকার্য করা হয়। আর দালালদের মাধ্যমে প্রদত্ত অতিরিক্ত টাকা নেওয়া হয় ৪৯৪০ টাকা। এই টাকার মধ্যে দালাল ও অফিসের কর্মচারীরা পেয়ে থাকেন এক হাজার থেকে ১৯শত টাকা। আর বাকী ৩ হাজার টাকা দিতে হয় মটরযান পরিদর্শককে। এছাড়া যানবাহনের রেজিষ্ট্রেশন বাবদ গাড়ী প্রতি ১১শত থেকে ১ হাজার টাকা দিতে হয়। তা না দিলে ইন্সপেক্টরের পরিদর্শন হয়ই না। এই নির্ধারিত টাকার কম হলে কাউকে ড্রাইভিং লাইসেন্সের পরীক্ষায় কৃতকার্য করা হয় না। এছাড়া বিআরটিএ অফিসের কর্মচারী নয় এমন একাধিক ব্যক্তিকে টাকা কালেকশনের সুবিধার্থে কম্পিউটারসহ বিভিন্ন স্থানে তিনি বসিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ ও সরেজমিন অফিসে গিয়ে দেখা গেছে গত দুই বছরে ১২ হাজার থেকে ১৫ হাজার ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদান করা হয়েছে। এছাড়া ১ হাজার মটরযানের রেজিষ্ট্রিশন করা হয়েছে। এই সময়ে প্রতিটি ড্রাইভিং লাইসেন্সের বিপরীতে সাড়ে ৭ হাজার থেকে আট হাজার টাকা দালালরা গ্রহন করে। যার একটি বড় অংশ মটরযান পরিদর্শক মো. মেহেদি হাসান পেয়ে থাকে। এই হিসাবে ১২ হাজার ড্রাইভিং লাইসেন্সের বিপরীতে বিভিন্ন কারণে ২ হাজার লোক সরকারী ফি দিয়ে লাইসেন্স গ্রহন করতে সক্ষম হয়। আর বাকী ১০ হাজার লোককে আট হাজার টাকা প্রদান করতে হয়েছে। অনেককে আবার এই অংকের চেয়েও বেশি টাকা দিতে হয়েছে। সেই হিসাবে গত দুই বছরে বাগেরহাট বিআরটিএ’র মটরযান পরিদর্শক তিন থেকে সাড়ে তিন কোটি টাকা ঘুষ পেয়েছেন। আর বাকী টাকা গেছে দালাল ও অফিসের তৃতীয়/চতুর্থ শ্রেনীর কর্মচারীদের পকেটে।
এদিকে, অভিযুক্ত মেহেদি হাসানের সাথে কথা বললে তিনি তার বিরুদ্ধে আনিত সকল অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, এই অফিসে যোগদান করেছেন তিনি ২ বছর প্রায়। এ সময়ে তিনি তেমন কোন অনিয়মের সাথে যুক্ত হননি। তাছাড়া কাজে গতি আনার জন্য কিছু লোককে বসিয়ে অফিসের ফাইল জট কমিয়েছেন বলে উল্লেখ করেন।

Please follow and like us:





উত্তর দিন

Wordpress Social Share Plugin powered by Ultimatelysocial