ফণী’র আঘাতে পিরোজপুরসহ সারাদেশে নিহত ১৭
ভারত মহাসাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড় ‘ফণী’ ভারতের ওড়িশায় আঘাত হানার পর তান্ডব চালিয়ে শনিবার সকালে ঝড়টি বাংলাদেশে আঘাত হেনেছে। ‘ফণী’র প্রভাবে শুক্রবার দিনে ও রাতে দেশের বিভিন্ন জায়গায় বৃষ্টি, দমকা হাওয়া ও বজ্রপাত হয়েছে। গত দুই দিনে ফণি’র প্রভাবে ঝড়ো হাওয়ায় ও পানিতে ডুবে অন্তত ১৭ জন নিহত হয়েছেন।
পিরোজপুরের কাউখালী উপজেলায় পানিতে ডুবে মোরসালিন খান (৪) নামের এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। মোরসালিন উপজেলার সয়না রঘুনাথপুর ইউনিয়নের বেতকা গ্রামের নুরুজ্জামান খানের ছেলে। ফণি’র প্রভাবে জোয়ারের পানি বৃদ্ধি ও বৃষ্টির পানিতে ভরে যাওয়া বাড়ির পাশের ডোবায় পড়ে গিয়ে তার মৃত্য হয়।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, শনিবার দুপুরে সবার অজান্তে মোরসালিন বাড়ি থেকে বের হয়ে ডোবায় অসাবধানতাবশত পড়ে যায়। পরে তাকে ডোবা থেকে উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
কাউখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. ছিদ্দিকুর রহমান বলেন, হাসপাতালে আনার আগেই শিশুটি মারা গেছে।
ভোলা সদরে শনিবার সকালে দক্ষিণ দিঘলদী ইউনিয়নে ঘর ভেঙ্গে চাপা পড়ে রানী বেগম (৪৫) নামে এক নারীর মৃত্যু হয়েছে। ভোলা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. কামাল হোসেন এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। নিহত রানী বেগম ওই এলাকার সামসুল হকের স্ত্রী। এছাড়া শনিবার সকালে লালমোহনের কচুয়াখালী চর থেকে নিকটবর্তী আশ্রয় কেন্দ্রে যাওয়ার পথে একটি ট্রলার ডুবে গেছে। এতে চার থেকে পাঁচজন আহত হয়েছেন।
কচুয়াখালীর চর থেকে জেলে নাছির উদ্দিন জানান, শনিবার সকালে আশ্রয় কেন্দ্রে যাওয়ার পথে মাইনুদ্দিনে ট্রলারটি ডুবে যায়। এতে ৪-৫ জন আহত হন।
ঘূর্ণিঝড় ‘ফণী’র আঘাতে লক্ষ্মীপুরের রামগতি উপজেলার চর আলগী গ্রামে আনোয়ারা বেগম (৭০) নামে এক বৃদ্ধা নিহত হয়েছেন। শনিবার সকালে ঝড়ে নিজ ঘরের কাঠ গায়ের ওপর পড়লে তিনি মারা যান। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রফিকুল হক বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার চরকাঁকড়া ইউনিয়নে আম কুড়াতে গিয়ে ঝুমুর (১২) নামে ষষ্ঠ শ্রেণির এক শিশু মারা গেছে। শনিবার সকাল ৯টায় এ ঘটনা ঘটে। ঝুমুর ওই এলাকার আবদুল হামিদের মেয়ে। জেলা প্রশাসক তন্ময় দাস বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
এছাড়া জেলার সুবর্ণচর উপজেলার চরওয়াপদা ইউনিয়নের চর আমিনুল হক গ্রামে ঘরের মধ্যে চাপা পড়ে এক শিশু নিহত হয়েছে। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন ৩০ জন। শুক্রবার রাতে এ ঘটনা ঘটে। নিহত ইসমাইল (২) একই ইউনিয়নের চর আমিনুল হক গ্রামের আবদুর রহমানের ছেলে।
সুবর্ণচর উপজেলার কন্ট্রোলরুমে দায়িত্ব পালনরত উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা ইকবাল হাসান জানান, চরওয়াপদা ইউনিয়নের চর আমিনুল হক গ্রামে ঘরের মধ্যে চাপা পড়ে একজন নিহত ও চরওয়াপদা এবং চরজব্বর ইউনিয়নে ৩০ জন আহত হন। আহতদের সুবর্ণচর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
বাগেরহাটের রণজিৎপুরে দমকা হাওয়ায় গাছের ডাল ভেঙ্গে পড়ে এক গৃহবধূ মারা গেছেন। তার নাম শাহারুন বেগন (৫০)। শুক্রবার দুপুরে বাড়িতে ধানের কাজ করার সময় এ ঘটনা ঘটে।
নিহতের আত্মীয় যুবলীগ নেতা শেখ আলফাজ জানান, দুপুরে শাহারুন বেগম ঘরের সামনে বসে ধানের কাজ করছিলেন। তখন তার মাথার ওপর চম্বল গাছের মোটা ডাল ভেঙ্গে পড়লে তিনি গুরুতর আহত হন। তাকে উদ্ধার করে খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে তিনি মারা যান।
কিশোরগঞ্জের মিঠামইন, ইটনা ও পাকুন্দিয়ায় বজ্রপাতে শিশুসহ ৬ জন মারা গেছেন। শুক্রবার দুপুর ১২টা থেকে সাড়ে ১২টার দিকে ভারী বৃষ্টিপাত ও ঝড়ো হাওয়ার সাথে বজ্রপাত হয়। এতে ওই ৬ জন মারা যান।
মিঠামইনে ঝড়-বৃষ্টির সময় বাড়ির সামনের হাওর থেকে গরু আনতে গিয়ে বজ্রাপাতে সুমন মিয়া নামে সাত বছরের শিশু নিহত হয়। এ সময় গরুটি মারা যায়। উপজেলার বৈরাটি ইউনিয়নের বিরামচর গ্রামের সামনের হাওরে বোরো ধান কাটতে গিয়ে বজ্রপাতে মারা যান মো. মহিউদ্দিন (২২)। ইটনায় ধান কাটার কাজ শেষে বাড়ি ফেরার পথে বজ্রপাতে রুবেল দাস (২৬) নামে এক যুবক মারা যান।
স্থানীয়রা জানান, ধান কেটে বাড়ি ফিরছিলেন রুবেল। পথিমধ্যে বজ্রপাতে তিনি গুরুতর আহত হন। আশঙ্কাজনক অবস্থায় উদ্ধার করে ইটনা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
জেলার পাকুন্দিয়া উপজেলায় গরুর ঘাস কাটতে গিয়ে আসাদ মিয়া (৪৫) নামে এক কৃষক নিহত হয়েছেন। শুক্রবার দুপুরে উপজেলার সুখিয়া ইউনিয়নের কোষাকান্দা গ্রামে বজ্রপাতে এই প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। চর ফরহাদি ইউনিয়নের চর আলগীর মৃত হালিম উদ্দিনের মেয়ে নূরুন নাহার ও ইন্নস আলীর ছেলে মজিবুর রহমান (১৭) মারা যান। তারা পথচারী ছিলেন। গাছের নিচে আশ্রয় নিয়েছিলেন তারা।
স্থানীয়রা জানিয়েছে, দুপুরে বাড়ির সামনের জমিতে ঘাস কাটছিলেন আসাদ মিয়া। তখন ঝড়বৃষ্টি শুরু হয়। বেলা সাড়ে ১২টার দিকে বজ্রপাত হয়। পাকুন্দিয়া থানার ওসি মোহাম্মদ ইলিয়াস এ তথ্য জানিয়েছেন।
নেত্রকোনার মদন উপজেলার হাওরে ধান কাটতে গিয়ে বজ্রপাতে আবদুল বারেক (৩৫) নামে এক কৃষক মারা গেছেন। শুক্রবার দুপুরে এ ঘটনা ঘটে। মদন থানার ওসি মো. রমিজুল হক বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরে বজ্রপাতে আপেল মিয়া (২০) নামে এক কৃষক নিহত হন। শুক্রবার সন্ধ্যা ৭টার দিকে উপজেলার বগডহর গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। আপেল মিয়া বগডহর গ্রামের উরমুজ আলী মিয়ার ছেলে।
পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, ঘূর্ণিঝড় ফণীর প্রভাবে সকাল থেকে এখানে থেমে থেমে মৃদু হাওয়াসহ বৃষ্টি হচ্ছিল। এরই মধ্যে সন্ধ্যা ৭টার দিকে বগডহর গ্রামের জমি থেকে ধান কেটে ফেরার সময় আকস্মিক বজ্রপাতের ঘটনা ঘটে। এতে ঘটনাস্থলেই আপেল মিয়া প্রাণ হারান। নবীনগর থানার ওসি রণজিত রায় ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেন।
পটুয়াখালীর কুয়াকাটায় তীব্র বাতাসে গাছের ডাল ভেঙ্গে শুক্রবার আহত মোটরসাইকেল চালক হাবিবুর রহমান (২৫) শুক্রবার রাতে বরিশাল সেবাচিম হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। শুক্রবার সন্ধ্যায় পৌর শহরের মনসাতলী এলাকায় গাছের ডাল ভেঙ্গে পড়লে তিনি আহত হন। তিনি পৌরসভার ১নং ওয়ার্ডের ওরকা পল্লি এলাকার বাসিন্দা। এ ঘটনায় আরও দুজন আহত হন। তারা প্রাথমিক চিকিৎসা নেন। কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. তানভীর রহমান বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
বরগুনার পাথরঘাটার উপকূলীয় এলাকায় শুক্রবার রাতে ঝড়ে গাছচাপা পড়ে দুজন নিহত হয়েছেন। নিহতের প্রত্যেকের পরিবারকে তাৎক্ষণিকভাবে ২০ হাজার টাকা করে অর্থ সহায়তা দেওয়া হয়েছে। বরিশালের বিভাগীয় কমিশনার রামচন্দ্র দাস বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
