নাজিরপুরে সাত মাসে একটি স্কুলের ১০ ছাত্রীর বাল্যবিয়ে
এক বছর চার মাস আগের কথা। পিরোজপুর জেলা প্রশাসক আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করলেন, নাজিরপুর উপজেলা পুরোপুরি বাল্যবিয়ে মুক্ত। আর এর মাত্র ৮ মাস পরই এ উপজেলায় ঘটলো বাল্যবিয়ের ঘটনা। তাও আর একজন-দুইজন নয়, ১০ জন ছাত্রীর বাল্যবিয়ের ঘটনা।
লেখাপড়া করে নিজের পায়ে দাঁড়াবার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিল যে মেয়েটি, তাকে জোর করে বিয়ে দিয়ে ঢুকিয়ে দেয়া হলো রান্না ঘর আর সংসার সামলানোর জন্য। এ বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ জুলাই পর্যন্ত জেলার নাজিরপুর উপজেলার মোট ১০ ছাত্রী বাল্যবিয়ের শিকার হয়েছে। এরা সবাই উপজেলার ২নং মালিখালী ইউনিয়নের পেনাখালী গ্রামের আলহাজ্জ তাহের উদ্দীন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের নবম ও দশম শ্রেণির নিয়মিত শিক্ষার্থী ছিল।
২০১৭ সালের ২৬ এপ্রিল তৎকালীন জেলা প্রশাসক খায়রুল আলম সেখ আনুষ্ঠানিকভাবে নাজিরপুর উপজেলাকে বাল্যবিয়ে মুক্ত উপজেলা ঘোষণা করেছিলেন।
সরেজমিন ঘুরে স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা গেছে, উপজেলার মালিখালী ইউনিয়নের পেনাখালী ও মধুখালী গ্রামের হাফিজ শেখের মেয়ে জান্নাতি, শামসু শেখের মেয়ে আমেনা, কাওসার শেখের মেয়ে কাজলী, হেলাল শেখের মেয়ে সুমাইয়া, সাত্তার হাওলাদারের মেয়ে হামিদা, তোফাজ্জল হোসেনের মেয়ে আমেনা, ছত্তার কবিরাজের মেয়ে সুমাইয়া, মান্নানের মেয়ে মিম, রুবানাসহ করিম শেখের মেয়ে মরিয়মের বিয়ে হয়েছে গত সাত মাসে। আর এদের প্রায় সবাইকে পরিবার থেকে এক প্রকার জোর করে বিয়ে দিয়ে দেয়া হয়েছে খানিকটা গোপনীয়তার সাথেই।
আলহাজ্জ তাহের উদ্দীন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সুভাষ মালাকার বলেন, ‘ওই মেয়েদের অভিভাবকরা তাদের গোপনে বিয়ে দিয়েছে। আমরা তাৎক্ষণিকভাবে সংবাদ পেলে প্রশাসনের সহায়তায় বিয়ে বন্ধের ব্যবস্থা করে থাকি। আর যাদের বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর জানতে পারি, সেক্ষেত্রে তাদের স্কুল থেকে বহিস্কারসহ উপবৃত্তির তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া হয়।’
এ ব্যাপারে সংশিষ্ট ইউপি চেয়ারম্যান সুমন মন্ডল মিঠু জানান, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে সরকারীভাবেই নানা পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। তাছাড়া পরিষদ থেকেও আমরা এ ব্যাপারে তৎপর। অবিভাবকরাই যদি বাল্যবিবাহ দেন তাহলে প্রতিরোধ করা অনেকটা কঠিন হয়ে পড়ে।
উপজেলা মহিলা বিয়ষক ও শিশু বিষয়ক কর্মকর্তা মোসা. আনোয়ারা সুবাহান বলেন, স্থানীয় চেয়ারম্যান, মেম্বর ও গ্রাম পুলিশের সদস্যরা এ বিষয়ে যদি আমাদেরকে সময়মত সহায়তা না করেন, আমাদের সংবাদ না দেন, তাহলে আমরা কিভাবে প্রত্যন্ত অঞ্চলের খবর পাব। আমরা যেগুলো জানতে পারি, সেগুলো তাৎক্ষনিক বাল্যবিবাহ বন্ধের ব্যবস্থা করে থাকি। তিনি আরও বলেন, এলাকার কিছু প্রভাবশালী অসাধু লোকজন এ বাল্যবিবাহ দিয়ে ছেলে মেয়েদের জীবন অকালে ধ্বংশ করছে।
উপজেলা চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম খান বলেন, নাজিরপুর উপজেলাকে ২০১৭ সালের ২৬ এপ্রিল তৎকালীন জেলা প্রশাসক মো. খায়রুল আলম সেখ আনুষ্ঠানিকভাবে বাল্যবিবাহ মুক্ত ঘোষণা করেছেন কিন্তু এলাকায় কিছু অসাধু লোক কর্তৃক এ বাল্যবিবাহ হচ্ছে, উপজেলা প্রশাসনে যারা নিয়োজিত আছেন তারা যদি সরকারের আদেশ এড়িয়ে যান তাহলে বাল্যবিাবহ প্রতিরোধ করা যাবেনা। যারা প্রশাসনে নিয়োজিত আছেন তাদেরকে সর্তক থাকতে হবে। তাহলেই বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ করা সম্ভব বলে মনে করি।
২০৪১ সালের মধ্যে দেশ থেকে বাল্যবিয়ে নির্মূলে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ সরকার। এ লক্ষ্যে নতুন আইন প্রণয়নের পাশাপাশি সচেতনতা বাড়াতে নানামুখী প্রচারও চলছে। তার পরও খুব একটা পরিবর্তন নেই দেশের সামগ্রিক বাল্যবিয়ে পরিস্থিতিতে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাব অনুযায়ী, ২০১৪ সালে দেশে বাল্যবিয়ের হার ছিল ৫২.৩ শতাংশ। এদিকে বিআইডিএসের ২০১৭ সালের জরিপ অনুযায়ী, বাল্যবিয়ের হার দাঁড়িয়েছে ৪৭ শতাংশে।
