আগামীকাল মেজর (অব.) জিয়াউদ্দিন আহমেদের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী
আগামীকাল শনিবার প্রখ্যাত মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযুদ্ধে নবম সেক্টরের সুন্দরবন সাব সেক্টর কমান্ডার মেজর (অব.) জিয়াউদ্দিন আহমেদের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী।
গত বছরের ২৮ জুলাই মুক্তিযুদ্ধের কিংবদন্তি সেনা নায়ক মেজর (অব.) জিয়াউদ্দিন আহমেদ সিঙ্গাপুরের জেনারেল হাসপাতালে ৬৮ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন।
মরহুমের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে তাঁর জন্মভূমি পিরোজপুরে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও পারিবারিক উদ্যোগে দুই দিনব্যাপী নানা কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। এসব কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে শনিবার সকালে কোরআয় খানী, সকাল ১০ টায় মরহুমের কবরে শ্রদ্ধা নিবেদন। সকাল ১১ টায় মরহুমের প্রতিষ্ঠিত আফতাব উদ্দিন কলেজ মিলনায়তনে আলোচনা সভা, দোয়া ও মিলাদ মাহফিল।
এছাড়া ঢাকাসহ দক্ষিণাঞ্চলে এ দিবসে বিভিন্ন কর্মসূচি পালিত হবে। গৃহীত কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে রুহের মাগফিরাত কামনা করে কোরআনখানী, পারিবারিক কবরস্থানে ফাতেহা পাঠ, পুস্পার্ঘ অর্পণ, মৌনমিছিল, স্মরণ সভা ইত্যাদি। মরহুমের প্রতিষ্ঠিত আফতাব উদ্দিন কলেজ, নাগরিক কমিটি, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, পিরোজপুর উন্নয়ন সংগ্রাম পরিষদসহ বিভিন্ন সংগঠন এসব কর্মসূচি পালন করবে।
সুন্দরবনের মুকুটহীন স¤্রাট বলা হয় মেজর (অব.) জিয়াউদ্দিনকে। ‘৭১-এর স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় ৯ নম্বর সেক্টরের অধীন সুন্দরবন সাব সেক্টরের কমান্ডার ছিলেন তিনি। এ কারণে সুন্দরবনের নাড়ি-নক্ষত্র সব কিছুই তার জানা। তিনি কর্মজীবনের শুরু থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত দুলবার চর ফিসারমেন গ্রুপের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন। আর সংগত কারণে হাজার হাজার জেলের স্বার্থ রক্ষায় ডাকাতদের প্রতিরোধ করতে হয়েছে। কখনো জেলেদের নিয়ে, কখনো প্রশাসনকে সহায়তা দিয়ে ডাকাতদের নির্মূলের নায়কের ভূমিকা রেখেছেন। আর এ কারণেই অনেক শত্রু তার পিছু নিয়েছে।
ছাত্র জীবনে ছাত্র ইউনিয়নের পিরোজপুর জেলা সভাপতি ছিলেন জিয়াউদ্দিন। ছাত্রাবস্থায় সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। সাহস ও কর্মদক্ষতায় অল্প দিনের মধ্যেই সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন হন। এ অবস্থায় ‘৭১-এর স্বাধীনতাযুদ্ধে অংশগ্রহণ এবং সুন্দরবন সাব সেক্টরের কমান্ডার হিসেবে নয় মাস যুদ্ধ করেন। যুদ্ধ শেষে ব্যারাকে ফিরে যান। পরে মেজর হিসেবে পদমর্যাদা পান। ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর বিদ্রোহ হলে ২১ নভেম্বর জিয়াউদ্দিন বেশ কিছু অনুসারী নিয়ে সুন্দরবনে ঘাঁটি করে মেজর জিয়াউর রহমানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। পরে ‘৭৬-এর জানুয়ারিতে গ্রেফতার হন। দীর্ঘ কারাভোগের পর সাজা মওকুফ হলে ১৯৮০ সালে ছাড়া পেয়ে বিদেশ চলে যান। চার বছর পর ১৯৮৪ সালে দেশে ফিরে সুন্দরবনের দুবলার চর ফিশারমেন গ্রুপের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি প্রথমে জাসদ ও পরে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হয়েছিলেন। কিন্তু পরে রাজনীতিতে নিস্ক্রিয় হয়ে ব্যবসায় মনোনিবেশ করেন।
জিয়াউদ্দিনের ঘনিষ্ঠ একাধিক সূত্রে জানা যায়, ফিশারমেন গ্রুপের চেয়ারম্যান হওয়ার পর থেকে জিয়াউদ্দিন কাঁচা টাকার আধারখ্যাত সুন্দরবনের দুবলার চরে একক আধিপত্য বিস্তার করে আছেন দীর্ঘ আড়াই যুগ ধরে। ফিশারমেন গ্রুপের অধীন ১২-১৩ হাজার জেলের নিরাপত্তায় করণীয় সব কিছুই করতেন তিনি। বিশেষ করে বন ও জল দস্যুদের দমনে তার ভূমিকা প্রশংসিত ছিল। এ কারণে সুন্দরবনের একাধিক ডাকাত গ্রুপ বিভিন্ন সময় ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। এসব ডাকাত গ্রুপ জিয়াউদ্দিনকে মেরে ফেলার চেষ্টাও করে কয়েকবার। তিনি একাধিকবার হামলার শিকারও হয়েছেন। ১৯৮৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে সুন্দরবনের মূর্তিমান আতঙ্ক ডাকাত দল কবিরাজ বাহিনীর সাথে শ্যালারচরে সরাসরি বন্দুকযুদ্ধে জয়ী হন মেজর জিয়া। নিহত হয় কবিরাজ বাহিনীর প্রধান। এরপর দীর্ঘ সময় ধরে দুবলার চরসহ সুন্দরবনের শুঁটকিপল্লি থেকে দূরে থেকেছে বনদস্যু বাহিনীগুলো।
১৯৭০ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট হিসেবে সেনাজীবন শুরু করেন মেজর জিয়া। পিরোজপুর জেলা শহরের তিনবারের নির্বাচিত পৌর চেয়ারম্যান এডভোকেট আফতাব উদ্দীন আহম্মেদের সন্তান মেজর জিয়া ১৯৭১ সালে স্বাধীনতাযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তান থেকে ছুটিতে এসে যোগ দেন মহান মুক্তিযুদ্ধে। দায়িত্ব পান ৯ নম্বর সেক্টরের সুন্দরবন অঞ্চলের সাব সেক্টর কমান্ডার হিসেবে। মুক্তিযুদ্ধে রাখেন বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর আবারও ফিরে যান সেনাবাহিনীতে।
‘৭৫-এর ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু যখন সপরিবারে নিহত হন তখন তিনি ঢাকায় ডিজিএফআইতে কর্মরত ছিলেন। ৭ নভেম্বর কর্নেল তাহেরের নেতৃত্বে সিপাহি-জনতার বিপ্লবে তিনি অংশ নেন। এরপর সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে কর্নেল তাহেরের সৈনিক সংস্থার পক্ষে অবস্থান নিয়ে তার অনুসারীদের নিয়ে সুন্দরবনে আশ্রয় নেন। ১৯৭৬ সালের জানুয়ারিতে সুন্দরবনে সেনা অভিযানে মেজর জিয়া গ্রেফতার হন। সামরিক আদালতে গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে কর্নেল তাহেরকে ফাঁসি ও আ স ম আবদুর রব, মেজর জলিলসহ অন্যদের সাথে মেজর জিয়াকেও যাবজ্জীবন কারাদন্ড দেয়া হয়। এ নিয়ে তখন সারা দেশের মুক্তিযোদ্ধারা আন্দোলন শুরু করলে আ স ম আবদুর রব, মেজর জলিলসহ অন্যদের সাথে মেজর জিয়াও ১৯৮০ সালে রাষ্ট্রপতির সাধারণ ক্ষমায় মুক্তি লাভ করেন।
১৯৮৩ সালে জেনারেল এরশাদের সময় মেজর জিয়াউদ্দিন দেশ ছেড়ে আশ্রয় নেন সিঙ্গাপুরে। এরপর দেশে ফিরে ১৯৮৪ সালের অক্টোবরে ছোট ভাই কামালউদ্দিন আহমেদ, ভাগ্নে শামীমসহ কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধাকে নিয়ে আবারও চলে যান সুন্দরবনের দুবলার চরে। বনদস্যু বাহিনীগুলোর হাতে প্রতিনিয়ত নির্যাতিত সুন্দরবনের জেলেদের সংগঠিত করে শুরু করেন শুঁটকি মাছের ব্যবসা। এরই মাঝে ১৯৮৯ সালে পিরোজপুর পৌরবাসীর দাবির মুখে নির্বাচন করে তিনি পিরোজপুর পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।
মেজর জিয়া পিরোজপুরে শহরের বাইপাস এলাকায় তার পিতার নামে প্রতিষ্ঠা করেন আফতাব উদ্দিন মহাবিদ্যালয়।
গড়ে তুলেন ‘সুন্দরবন বাঁচাও’ কর্মসূচি নামে একটি অরাজনৈতিক সংগঠন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি দুবলা ফিসারমেন গ্রুপের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। কখনও জেলেদের নিয়ে, কখনও প্রশাসনকে সহায়তা দিয়ে ডাকাতদের নির্মূলে নায়কের ভূমিকা রেখেছেন তিনি। এ কারণে সুন্দরবনের একাধিক ডাকাত গ্রুপ বিভিন্ন সময়ে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। এসব ডাকাত গ্রুপ জিয়াউদ্দিনকে মেরে ফেলার চেষ্টা করে এবং একাধিকবার হামলার শিকারও হয়েছেন।
সর্বশেষ মোর্তজা বাহিনীর সদস্যরা পূর্ব সুন্দরবনের হারবাড়ীয়া ও মেহেরালীর চর এলাকার মাঝামাঝি চরপুঁটিয়ায় মেজর জিয়াকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। বন্দুকযুদ্ধে মোর্তজা বাহিনীর চার সদস্য নিহত ও মেজর জিয়া গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হন।
২০১৭ সালের জুন মাসের শেষের দিকে লিভার জনিত রোগে মেজর (অবঃ) জিয়াউদ্দিন আহম্মেদ অসুস্থ হয়ে পড়েন। শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে ঐ বছরের ১ জুলাই তাকে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
পরে শারীরিক অবস্থার কিছুটা উন্নতি হলে তাকে কেবিনে আনা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ষ্টোক করেন তিনি। পরে ১১ জুলাই সিঙ্গাপুরে নেয়া হয় তাকে। চিকিৎসারত অবস্থায় ২০১৭ সালের ২৮ জুলাই সেখানেই তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। দেশবাসী হারায় একজন বীর মুক্তিযোদ্ধাকে আর পিরোজপুরবাসী হারায় একজন সদালাপী অভিভাবক, একজন অকুতোভয় সৈনিককে।
