প্রধান সূচি

ঋনের বোঝায় জর্জরিত ব্যবসায়ীরা

ক্রেতা শূন্যতায় স্বরূপকাঠীর চাঁই শিল্পে ধস

খালে বিলে আসছে ভরা জোয়ারের নতুন পানি। কোথাও মিলছেনা চিংড়ি-বাইলা-বাইনসহ দেশীয় মাছ। তাইতো এবার পিরোজপুরের স্বরূপকাঠীর ঐতিহ্যবাহী বিখ্যাত চাঁইয়ের হাটে ক্রেতা শূণ্য। “হাটে আসছে চাঁই কারীগর, ভরে উঠছে চাঁই। এমনি সময় এখন ক্রেতা কোথায় পাই।” হ্যাঁ এমনিভাবে ছড়ার সুরে কথাগুলো বলছিলেন উপজেলার আটঘর কুড়িয়ানা ইউনিয়নের মানপাশা বাজারের খালে জলে জমে ওঠা দক্ষিণবঙ্গের ঐতিহ্যবাহী চাঁই হাটের চাঁই কারিগর করিম বেপারী (৪৫)।

স্বরূপকাঠী প¦ার্শবর্তী উপজেলা নাজিরপুর থেকে হাটে চাঁই নিয়ে আসা ব্যবসায়ী মো. করিম বেপারী বলেন, এক সময় তিনি এখানে সপ্তাহে শুক্র ও সোম বার দু‘হাটে ৭০০-৮০০ চাঁই নিয়ে আসতেন। চাঁই বিক্রি করে সাথে থাকা সহকর্মীর মজুরি মিটিয়ে মনের আনন্দে বাড়ী ফিরতেন। একটি চাঁই বুননসহ যাবতীয় মজুরী খরচ মিলিয়ে ৭০ থেকে ৮০ টাকা দাম পড়ে। আর সে চাঁইটি বাজারে খুচরা মূল্য ১০০ থেকে ১২০ টাকা। প্রায় দ্বিগুন লাভজনক হওয়ায় তাদের গ্রামের অনেক অস্বচ্ছল পরিবার এ পেশায় ঝুঁকে পড়েছিল। হাটে এখন ক্রেতা শূন্যে চাঁই বেঁচা-বিক্রি বন্ধ হওয়ার উপক্রম। গ্রামের বিভিন্ন সমিতি ও এনজিও এর কাছ থেকে টাকা তুলে যশোর থেকে বাঁশ কিনে এনে হাজার তিনেক চাঁই বুনছেন। বেঁচা বিক্রির এই অবস্থায় ঋনের বোঝায় তার চোখে এখন কেবল হতাশার ছাপ। তিনি আরো, বলেন কি করব? বাপ দাদার পেশা। বংশ পরম্পরায় বছরে ৬ মাস এ কাজ করে জীবিকা সংগ্রহ করে আসছি।

সরেজমিনে স্বরূপকাঠী উপজেলার আটঘর কুড়িয়ানার ডাঙ্গায় জলে এই চাঁই সা¤্রাজ্যকে ঘিরে অত্র উপজেলাসহ প¦ার্শবর্তী নাজিরপুর উপজেলার ১২/১৩টি গ্রামে জুটে থাকে মৌসুম ভিত্তিক কর্মসংস্থান। প্রতি বছর উপজেলার এ দৃষ্টি নন্দিত চাঁই হাট দেখে যে কারো মন কাড়ত। এবছর গত সোম ও শুক্রবার ক্রেতা শূণ্য চাঁই হাট ঘুরে দেখা গেল মলিন মুখে ক্রেতা পানে ব্যবসায়ীদের অবাক চাহনি। চাঁই হাটের বেঁচা বিক্রির করুন দশা জানতে চাইলে, চাঁই কারিগর কবির, বিনয় মজুমদার, আন্দারকুল গ্রামের রঞ্জন বলেন, একসময় এখানে প্রতি হাটে ২ লক্ষাধিক টাকার চাঁই বিক্রি হত। বর্তমানে এলাকার খাল, বিল ডোবা নালা ভরে অবাধে জমির শ্রেনী পরিবর্তন করে বসতি গড়ে তোলা হচ্ছে। তাই জোয়ারের পানি সব জায়গায় প্রবেশ করতে না পারায় একমাত্র চাষি মাছ ছাড়া দেশীয় মাছের এখন বড়ই আকাল। তারা আরো বলেন, এছাড়াও এখনো জমিতে মাত্রারিক্ত কিটনাশক প্রয়োগ, নদীতে অবাধে বাধা জাল দিয়ে মাছ নিধনের ফলে ক্রমেই মাছ শূন্য হয়ে পড়ছে। তাই চাঁইতে মাছ ধরা পড়ে না। এজন্য বেঁচাকেনার এ অবস্থা।

চাঁই কারিগররা বলেন, একসময় চাঁই বুনন কাজে নিয়োজিত থেকে চাঁই বিক্রিতে দ্বিগুন লাভবান হওয়া যেত। তাই নাজিরপুরের কলারদোয়ানিয়া গ্রামের পুরো এলাকাসহ  স্বরূপকাঠী উপজেলার আটঘর, ধলুহার, আন্দারকুল গ্রামের গৃহস্তি পরিবারের অধিকাংশ লোক চাই বুনন পেশায় ঝুঁকে পড়েছে। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে বেঁচা বিক্রির মন্দা দশায় এখন অনেক মানুষ পেশা ছেড়ে ঢাকায় গিয়ে বিভিন্ন কাজবাজ করছে।

হাটে কলারদোয়ানিয়া থেকে চাঁই নিয়ে আসা ইদ্রিস (৪২), মিজান (৫০) বলেন, একটি তিন শত টাকার বাঁশে ১৫-থেকে ১৬টি চাঁই হয়ে থাকে। ১০টি চাঁই তৈরীতে ৩ জনের সময় লাগে ১ দিন। গড় চাঁই মজুরীসহ বর্তমানে পন্যমূল্যের উর্ধ্বগতিতে সব মিলিয়ে খরচ পড়ে ৭০ থেকে ৮০ টাকা। তাতে এক কুড়ি চাঁইয়ের মূল্য দাড়ায় পনের শত টাকা। হাটে চাঁই প্রতি ৪ টাকা খাজনা, যাবতীয় খরচ মিলিয়ে এককুড়ি চাঁই বিক্রি করতে খরচ মূল্যে ১৬০০ টাকায় বিক্রি করতেও কষ্টকর হয়ে দাড়াচ্ছে। গাওখালি থেকে আসা চাঁই বিক্রেতা কলেজ ছাত্র রিপন জানান, সে পিতার সাথে প্রতি বছর হাটে ৭০০-৮০০ চাঁই নিয়ে আসত। আর এসব চাঁই পিরোজপুর, ঝালকাঠি, ভোলা জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে লোক আসতো চাঁই কিনতে। তারা এসে একসাথে শত শত চাঁই কিনত। ক্রয়কৃত চাঁই তারা বড় বড় নৌকা, ট্রলার কেউবা অটো গাড়ী করে নিয়ে যেত ওইসব দূর-দূরান্তে। এ হাটে দেড়শ চাঁই নিয়ে এসেছেন এখন তাও বিক্রি করতে পারছেনা না। এ বছর ক্রেতা শূন্যতায় বেঁচা-বিক্রি মন্দায় বিক্রেতারাও কম আসছে। তারা আরো বলেন এ বছর সব জায়গাতেই একই অবস্থা।

Please follow and like us:





উত্তর দিন

Wordpress Social Share Plugin powered by Ultimatelysocial