প্রধান সূচি

পিরোজপুরে ডায়রিয়ার প্রকোপ ॥ একমাসে তিন সহস্রাধিক আক্রান্ত

পিরোজপুরের ডায়রিয়ার ব্যাপক প্রকোপ দেখা দিয়েছে। গত ২৪ ঘন্টায় জেলা সদর হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেগুলোতে ১০৮ জন ডায়রিয়ায় আক্রান্তরা ভর্তি হয়েছে। এদের মধ্যে শিশু ও নারীর সংখ্যা বেশি। এছাড়া প্রত্যন্ত গ্রামের বাড়িতে পল্লী চিকিৎসকদের অধীনে অনেক রোগীর চিকিৎসা চলছে। বিশেষতঃ নাজিরপুরে আইভি স্যালাইনের ব্যাপক সংকটের কারণে পল্লী চিকিৎসকরা রোগীদের চিকিৎসা সেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছেন বলে জানা গেছে। নাজিরপুর সরকারি হাসপাতালে মাত্র ৩০০ ব্যাগ আইভি স্যালাইনের মজুত রয়েছে। গত পাঁচ দিনে হাসপাতালেই ৫০০ ব্যাগ আইভি স্যালাইন ব্যবহৃত হয়েছে বলে স্টোরকিপার মিহির হালদার জানান।

নাজিরপুর উপজেলায় ডায়রিয়ায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। সোমবার দুপুরে অঞ্জলী মিস্ত্রী (৬৫) নামে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত এক রোগীর মৃত্যু হয়েছে। অঞ্জলী মিস্ত্রী উপজেলা দক্ষিণ পাকুরিয়া গ্রামের মহানন্দ মিস্ত্রীর স্ত্রী। গতকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত ৭ দিনে শিশুসহ ১০৩ জন রোগী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি হয়েছে। এ অবস্থায় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আইভি স্যালাইন সংকট দেখা দিয়েছে। এমনকি উপজেলা সদরের ওষুধের দোকান গুলোতেও স্যালাইন না পাওয়ায় রোগী নিয়ে বিপাকে পড়তে হচ্ছে তাদের আত্মীয় সজনদের। কেউ কেউ জেলা সদর বা পাশর্^বর্তী বাগেরহাটের চিতলমারী ও গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া থেকে স্যালাইন সংগ্রহ করছেন।

ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালের বারান্ধার মেঝেতে চিকিৎসাধীন হেনোয়ারা বেগম (৬০) জানান, মঙ্গলবার সকালে তিনি ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে এসেছেন, বেড না থাকায় তাকে মেঝেতে রাখা হয়েছে। একই দিন সকালে ভর্তি হওয়া রোগী আরিফা (২৪) জানান, তিনিও হাসপাতালে বেড না পেয়ে মেঝেতে রয়েছেন।

উপজেলা সদরের ওষুধ ব্যবসায়ী মোস্তাফিজুর রহমান লাভলু জানান, ডায়রিয়া একটি মৌসুমগত রোগ। বছরের বারো মাস এক রোগের ব্যপকতা থাকে না। প্রতি বছরই নিদিষ্ট একটা সময় ডায়রিয়ায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। সেটা মাথায় রেখে প্রস্তুতি নিয়ে রাখলে স্যালাইন সংকট হওয়ার কথা নয়। ওষুধ কোম্পানী ও সংশ্লিষ্টদের গাফিলতির কারণেই প্রতি বছর স্যালাইন সংকট দেখা দেয়। আমরা এখন কোম্পানীতে অর্ডার দিলে সাপ্লাই নেই বলে আমাদের ফিরিয়ে দেয়া হয়।

নাজিরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সহকারী সার্জন ডা. তানভীর হাসান বলেন, তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ার পর প্রতিদিন গড়ে ১৫ থেকে ২০ জন রোগী ভর্তি হচ্ছে। মঙ্গলবার দুপুর পর্যন্ত গত ৭ দিনে ভর্তি হয়েছে ১০৩ জন। গরম যত বৃদ্ধি পায়, খাদ্যে বিষক্রিয়া তত বাড়ে, যা খেয়ে মানুষ ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছে। হাসপাতালে খাবার স্যালাইন পর্যাপ্ত থাকলেও আইভি স্যালাইনের সংকট রয়েছে।

শিশুদের ডায়রিয়া থেকে বাঁচার পরামর্শ দিয়ে তানভীর হাসান সমকালকে আরও বলেন, এ রোগ থেকে রক্ষা পেতে সতর্ক থাকতে হবে। মাটিতে ছেড়ে দেয়া যাবে না। গরম কাপড় পরাতে হবে। ডায়রিয়ার লক্ষণ দেখা দিলে সাথে সাথে হাসপাতালে নিয়ে আসতে হবে।

মঙ্গলবার পিরোজপুর সিভিল সার্জনের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, গত ২৪ ঘন্টায় পিরোজপুর সদর হাসপাতালে ২৪ জন ডায়রিয়ায় আক্রান্ত রোগী ভর্তি হয়েছেন। এছাড়া নাজিরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ২০ জন, নেছারাবাদ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ২৫ জন, ভান্ডারিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ২১ জন, মঠবাড়িয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১৭ জন ও কাউখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১ জন ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছে। গত এক সপ্তাহে ৭৭৩ জন ও এক মাসে ৩ হাজার ১৮৫ জন ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। জেলায় প্রতিদিন গড়ে ১০০ জন ডায়রিয়ায় আক্রান্ত রোগী হাসপাতালগুলোতে ভর্তি হয়।

চিকিৎসকেরা জানান, প্রচন্ড গরম ও বিশুদ্ধ পানির অভাবে এ সময়ে ডায়রিয়ার প্রকোপ বেড়ে যায়। ডায়রিয়ায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় হাসপাতালগুলোর ডায়রিয়ার ওয়ার্ডে স্থানসংকুলান না হওয়ায় রোগীদের সাধারণ রোগীদের ওয়ার্ডে ও মেঝেতে রেখে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। এ ব্যাপারে পিরোজপুর জেলার সিভিল সার্জন ডা. ফারুক আলম জানান, কয়েক দিনে ডায়রিয়ার প্রাদুর্ভাব এ জেলায় বৃদ্ধি পেয়ে গ্রামাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ছে।

পিরোজপুরের বিশিষ্ট ওষুধ ব্যবসায়ী হারুন অর রশীদ জানান, নাজিরপুর উপজেলার শ্রীরামকাঠি, গাওখালী, বৈঠাকাটা, চাঁদকাঠি, মাটিভাঙ্গা, সাচিয়া, বাবুরহাট প্রভৃতি বাজারে ওষুধের দোকান ও পল্লী চিকিৎসকদের কাছে আইভি স্যালাইনের জন্য রোগীদের স্বজনরা ধর্না দিয়েও স্যালাইন পাচ্ছেন না। কলেরা স্যালাইন নামে বেসরকারিভাবে কোন আইভি স্যালাইনের উৎপাদন না থাকায় এই মারাত্মক সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে।

Please follow and like us:





উত্তর দিন

Wordpress Social Share Plugin powered by Ultimatelysocial