প্রধান সূচি

করোনাকালীন শিক্ষা ও মানসিক অস্থিরতা

বিশ্ব আজ এমন এক সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে যা মানুষ কখনো কল্পনা করতে পারেনি। লন্ডভন্ড করে দিয়েছে বিশ^ অর্থনীতির চাকাকে। মানুষের জীবনযাত্রায় এর বিরুপ প্রভাব পড়েছে। প্রায় সকল সেক্টরই কোনো-না- কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কঠিন এই বাস্তবতায় ভেঙ্গে পড়া অর্থনীতিকে সচল করতে প্রায় সকল খাতই পুনরায় ঘুড়ে দাঁড়িয়েছে। শিক্ষাখাতই একমাত্র ব্যতিক্রম। যেটিকে আর আগের মতো স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি। এমনকি কবে নাগাদ এটিকে তার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনা যাবে তা-ও জোর দিয়ে কেউ বলতে পারছে না।
যদিও এই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে সরকারের তরফ থেকে নানা পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। যার অনেকটাই সফল হয়েছে। তারপরেও ভার্চুয়াল শিক্ষাব্যবস্থা যে কখনো একচুয়াল শিক্ষাব্যবস্থার সমকক্ষ হতে পারে না, সে বিষয়টি ক্রমশ উপলব্ধি করছের শিক্ষার্থীরা। ফলে তারা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফেরার তাগিদ অনুভব করছে। আর এই অনুভূতিটা আগের চেয়ে এখন আরো অনেক প্রবল। বর্তমান পরিস্থিতিতে এমন কোনো পদক্ষেপ নেয়া কতটা যুক্তিযুক্ত সে বিষয়ে ভাবছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। ভাবছে সরকারের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ। সময়মতো নিশ্চয়ই আমরা একটি সঠিক সিদ্ধান্ত পেয়ে যাব।
সময় যতই যাচ্ছে শিক্ষার্থীদের মাঝে মানসিক চাপ ততই বেড়ে চলেছে। একধরণের বিষণ্নতায় ভুগছে শিক্ষার্থীরা। অভিভাবকদের ভেতরও সেই অস্থিরতা যেন ক্রমশই আরো ঘনীভূত হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপের একটি বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে অভিভাবক। তারাও মনে করছেন শিক্ষাজীবন থেকে তাদের মূল্যবান একটি বছর হারিয়ে গেল। প্রত্যাশিত তেমন কিছুই অর্জন করতে পারল না তারা। বিষয়টি তারা সহজে গ্রহণ করতে পারছেন না। আমি মনে করি, মানসিক এই অবস্থার জায়গাটায় তাদের কিছু পরিবর্তন আনা দরকার। যেহেতু এটি একটি বৈশি^ক মহামারি। সকলেই একই ক্ষতির সম্মুখীন। কেউই শ্রেণিকক্ষে ফিরতে পারেনি। পড়াশোনার ক্ষতি সবারই হয়েছে বা হচ্ছে। হয়তো শহরাঞ্চলের চেয়ে গ্রামাঞ্চলের শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে এই ক্ষতিটা হচ্ছে অনেক ব্যাপক। শহর ও গ্রামাঞ্চলের বৈষম্য সবসময়ই ছিল। হয়তো করোনা সেটিকে আরো একবার স্পষ্ট করে দিল। এমন পরিস্থিতে তাদের যে ধরণের অত্যাধুনিক সুবিধা পাওয়ার কথা সেটি থেকে তারা বঞ্চিত। অনলাইনভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রমের সাথে যুক্ত হতে যে ধরণের ইলেট্রনিকস সামগ্রী তাদের থাকার কথা সেটি তাদের অনেকেরই নেই। নিরবিচ্ছিন্ন ইন্টারনেট কানেকশন, ডিভাইস ও ইলেকটিসিটি সমস্যা তো আছেই।
এমন পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের সুস্থ মানসিক বিকাশের জন্য অভিভাবকদের সাপোর্টটাই একটি মুখ্য বিষয়। অস্থিরতাকে আর না-বাড়িয়ে কীভাবে তাদের স্বাভাবিক রাখা যায় সেদিকটিই গুরুত্বসহকারে ভাবতে হবে। একজন অভিভাবক হিসেবে তাদের সৃজনশীলতা বিকাশে ঘরোয়া বিভিন্ন খেলাধুলা, কালচারাল বিভিন্ন দিক, সৃষ্টিশীল কর্ম দিয়ে তাদের সময়টাকে আনন্দঘন করে তোলা যায়। পর্যাপ্ত সময় দিতে হবে তাদের। এরপরেই তারা বাইরের বেরোনোর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করবে এটাই স্বাভাবিক। তাই স্বাস্থ্য সুরক্ষার কথা বিবেচনায় রেখে সীমিত পরিসরে তাদের নিয়ে আশপাশের কোথাও বেরিয়ে আসা যায়। দীর্ঘদিন ঘরবন্দি থাকায় অনেক শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে কিছু বৈরী আচরণ লক্ষ করা যাচ্ছে। যার সৃষ্টি এই মানসিক অস্থিরতা থেকে। পরিস্থিতি বিবেচনায় অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে বিষয়টি ভাবতে হবে। আর বিচক্ষণতার সাথে পরিস্থিতি থেকে উত্তোরণের পথও বেছে নিতে হবে।
দীর্ঘদিন ধরে এভাবে আর হয়তো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা যাবে না। তাই বলে, একযোগে সব খুলে দেয়াও ঠিক হবে না। ধাপে ধাপে কীভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেয়া যায় সে বিষয়ে এখনই কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। পাশাপাশি এটিও মাথায় রাখতে হবে-এই খুলে দেয়ার প্রেক্ষিতে যদি সংক্রমণের হার বেড়ে যায় তখন আমাদের করণীয় কী হতে পারে। অভিভাবক মহল থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার কথা বলা হলেও পুনরায় যদি সংক্রমণের হার বেড়ে যায় তাহলে এ দায় সরকারের উপর এসেই পড়বে।
তাই সীমিত পরিসরে ধাপে ধাপে খুলে দিতে হবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। কোমলমতি শিক্ষার্থীদের দিয়ে এই ঝুঁকি কখনোই নেয়া যাবে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের বিষয়টি ভাবতে হবে সবার শেষে। যতই এদেরকে স্বাস্থ্যবিধি মানার কথা বলা হোক না কেন বাস্তবে তা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। সুতরাং শিক্ষার্থীর সংখ্যা বিবেচনায় কমের দিক থেকেই উচ্চপর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার কথা চিন্তা করতে হবে। হতে পারে সেটা বুয়েট, মেডিকেল কলেজ, পাবলিক বিশ^বিদ্যায় এভাবে করেই ক্রমান্বয়ে নিচের দিকে আসতে হবে। সাথে সাথে মনিটরিং ব্যবস্থাটি জোরদার রাখতে হবে। সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রশাসনের সহায়তায় বিশেষ কোনো মেডিকেল বোর্ড গঠন করা যেতে পারে। যেটির তদারকি করবে স্বাস্থ্য বিভাগ। যাতে সংক্রমণের সঠিক চিত্রটা উঠে আসে। আর এই রিপোর্ট এর উপর ভিত্তি করেই পরবর্তী ধাপে অগ্রসর হতে হবে।
লেখক : সাহিত্যিক ও গবেষক

Please follow and like us:





উত্তর দিন

Wordpress Social Share Plugin powered by Ultimatelysocial