এসএসসিতে প্রিয়া রানী পালের সাফল্য ॥ উচ্চ শিক্ষা নিয়ে শঙ্কা
প্রিয়া রানী পাল, অন্যের ঘেরের ভেড়ি থেকে তুলে আনা সবজী বিক্রির টাকায় যাদের সংসার চলে। যার জন্মের এক বছর পর থেকে বাবা প্রদীপ কুমার পাল নিরুদ্দেশ, মা অঞ্জনা রানী পালের সাথে স্থানীয় সার্ব্বজনিন শীতলা মন্দিরের জমিতে এক কোনে ঝুপড়ি ঘরে যার বেড়ে ওঠা। ছোট বেলা থেকেই পড়াশুনা প্রতি প্রিয়া রানীর আদম্য ইচ্ছা। পিতৃহারা মেয়ের ইচ্ছা পূরণে মা অন্যের বাড়িতে কাজ করে এবং পাড়া প্রতিবেশীদের বাগান ও মৎস্য ঘেরের ভেড়ি থেকে বিভিন্ন প্রকার সবজী তুলে স্থানীয় বাজারে সবজি বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ চলে মা ও মেয়ের।
এর মধ্যে মেয়ে প্রিয়া রানী পিএসসিতে ভালো ফলাফল অর্জন করে। মাধ্যমিকে পড়াতে মা অঞ্জনার আশায় বুক বাঁধে। নিজের কথা চিন্তা না করে মেয়ের লেখাপড়ার জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ শিকার করেন মা। মায়ের স্বপ্ন পূরণে মেয়েও চরম দারিদ্রকে মোকাবেলা করে সকল বাঁধা বিপত্তিকে পেছনে ফেলে স্কুলের প্রধান শিক্ষকের সহযোগিকায় লেখাপড়া চালিয়ে যায়। ২০২০ সালে মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) পরীক্ষায় প্রিয়া রানী পাল বাগেরহাট সদর উপজেলার শরৎচন্দ্র মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে জিপিএ-৫ অর্জন করে। ভাল ফলাফল করেও হাসি নেই প্রিয়া রানী পালের মুখে। উচ্চ শিক্ষা নিয়ে শঙ্কায় জনম দুঃখী মা অঞ্জনা রানী ও মেধাবি প্রিয়া রানী পালের। কারণ চিন্তা এখন উচ্চ মাধ্যমিকে ভর্তির টাকা কোথায় পাবেন।
এলাকার অন্য অভিভাবকরা তাদের সন্তানের সাফল্যে যখন মিষ্টি বিতরণে ব্যস্ত। তখন মেয়ের উচ্চ মাধ্যমিকে ভর্তির টাকার চিন্তায় মা অঞ্জনা রানীর চোখ অশ্রুশিক্ত। হতাশাগ্রস্থ দু’চোখে শুধু বিত্তবান পাড়া পতিবেশীদের মুখপানে চায়। কে সহযোগিতা করবে, কার কাছে চাইবে, যদি কেউ কিছু বলে সে কারণে মুখ ফুটে কিছু বলে না কাউকে।
অঞ্জনা রানী পাল বলেন, পারিবারিকভাবে বাগেরহাট সদর উপেজেলার গোমতী গ্রামের প্রদীপ কুমার পালের সাথে আমার বিয়ে হয়। বিয়ের এক বছর পরই আমার কোল জুড়ে আসে প্রথম সন্তান প্রিয়া। কিন্তু সন্তান আসার পর থেকেই স্বামী আমার অচেনা হয়ে যায়। কিছুদিন পরে আমাকে ও মেয়েকে ফেলে রেখে ইন্ডিয়া চলে যায়। আর ফেরেনি। শুনেছি সেখানে নাকি একটা বিয়ে করেছে। স্বামী চলে যাওয়ার পরে স্বামীর ঘর থেকেও নামিয়ে দেয় তার বাড়ির লোকজন। পরে গোমতি সার্বজনিন বাসন্তি মন্দিরের বারান্দায় থাকতাম। পরে স্থানীয়দের সহযোগিতায় ওই মন্দিরের জায়গায় ঝুপড়ি ঘর করে থাকি। মানুষের বাড়িতে কাজ করি। আর ফাঁকে ফাঁকে স্থানীয় বাগান ও ঘেরের পাড় থেকে সবজি তুলে বিক্রি করে মা-মেয়ে কোন মতে বেঁচে আছি।
অঞ্জনা আরও বলেন, বেশিরভাগ দিন আমরা তিন বেলা খেতে পারিনা। এক বেলা খাবার জুটলে অন্য বেলারটা নিয়ে চিন্তায় থাকি। অনেকে বলেছে তোর ঘর নেই, জমি নেই মানুষের বাড়ি কাজ করিস। মেয়েকে পড়িয়ে কি করবি। এর মধ্যেও মেয়ে আমার পড়াশুনা করেছে। মেয়েকে কোন প্রাইভেট দিতে পারিনি। তারপরও মেয়ে আমার এ প্লাস পেয়েছে। কিন্তু আইয়ে ভর্তির টাকা কোথায় পাব আমি! সেই চিন্তায় আর খুশি হতে পারিনা। মেয়ের পড়াশুনা চালিয়ে যাওয়ার জন্য বিত্তবানদের সহযোগিতা কামনা করেছেন মা অঞ্জনা।
মেধাবী প্রিয়া রানী পাল বলেন, বাবাকে কবে দেখেছি তা মনে নেই। বাবার কথা জানতে চাইলে মা বলতেন লেখাপড়া করে মানুষ হও, বেঁচে থাকলে বাবা একদিন খোঁজ নিবে। না খেয়ে থেকেছি। কিন্তু কখনও স্কুলে যাওয়া বন্ধ দেইনি। স্কুলের স্যাররাও আমাকে সহযোগিতা করেছেন। মায়ের প্রেরণায় সব সময় লেখা পড়া করেছি। আমি উচ্চ শিক্ষা গ্রহন করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হতে চাই। এ জন্য সকলের সহযোগিতা চাই।
শরৎচন্দ্র মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আছাদুল কবির বলেন, প্রিয়াদের থাকার ঘরও নেই বলা যায়। মানুষের বাড়িতে কাজ করে মেয়েকে স্কুলে পড়িয়েছে তার মা। এসব কারণে প্রিয়ার কাছ থেকে কখনও স্কুলের বেতন ও পরীক্ষার ফি নেইনি। স্কুল কর্তৃপক্ষ ও আমরা শিক্ষকরা সব সময় প্রিয়াকে সহযোগিতা করতাম। ভবিষ্যতেও প্রিয়া যাতে উচ্চ শিক্ষা গ্রহন করে মায়ের দুঃখ ঘোচাতে পারে সে জন্য পাশে থাকার আশা ব্যক্ত করেন এই শিক্ষক।
প্রিয়াকে সহযোগিতা করার জন্য যোগাযোগ করুন ০১৯২২-৩২৮৯০১ এই নাম্বারে।
