প্রধান সূচি

করোনা পরিস্থিতি ও পরিবার পরিকল্পনায় করণীয়

“পরিবার পরিকল্পনা হচ্ছে একটি সমন্বিত জরুরী সেবা যার সাথে জড়িয়ে আছে আমাদের স্বাস্থ্য, উন্নয়ন এবং কল্যাণ। এটি কোন বিচ্ছিন্ন সেবা নয়। অন্যদিকে, পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচীকে কেবলমাত্র গুটিকয়েক পদ্ধতি দিয়ে মাপলে চলবে না। এই কর্মসূচী অন্যান্য উন্নয়ন কর্মসূচীর সাথে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। তাই, বিশেষ করে এই বিশ্ব মহামারীর সময়ে এর প্রতি আলোকপাত করে কাজ করার কোন বিকল্প নেই।” করোনা ভাইরাসের সাথে বৈশ্বিক ও দেশীয় বর্তমান পরিস্থিতিতে মাতৃস্বাস্থ্য এবং কিশোরী স্বাস্থ্য বিশেষ করে গর্ভকালীন, প্রসবকালীন ও প্রসবোত্তর সময়ের বিভিন্ন ঝুঁকি, প্রয়োজনীয় পদক্ষেপসহ প্রাসঙ্গিক এবং সময়োপযোগী বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলেছেন পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কাজী আ. খ. ম. মহিউল ইসলাম।
বিশ্ব সাস্থ্য সংস্থা সারা বিশ্বব্যাপি কোভিট-১৯ মহামারী ঘোষণা করেছে। বাংলাদেশ তার বাইরে নয় এবং গত ২৬ মার্চ ২০২০ থেকে ১৪ এপ্রিল ২০২০ পর্যন্ত বাংলাদেশ সরকার সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছে এবং সারা দেশের মানুষকে নিজ নিজ বাড়িতে থাকার জন্য অনুরোধ করা হয়েছে। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি সকল সরকারী এবং অধিকাংশ বেসরকারী প্রতিষ্ঠানসমূহ এই ভয়াবহ পরিস্থিতি সামলানোর জন্য আপ্রাণ কাজ করে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, এই অবস্থার মধ্যে কিছু গুরুত্বপূর্ন বিষয় আছে যা আমাদের জীবনের সাথে ওতপ্রোতোভাবে জড়িত এবং যেদিকে নজর না দিলে বিপদ আরো বাড়বে বলেই আশংকা করা হচ্ছে। তার মধ্যে মাতৃস্বাস্থ্য অন্যতম, যেমন-গর্ভকালীন, প্রসবকালীন এবং প্রসবোত্তর সময়কে অতীব গুরুত্বের সাথে দেখা এবং সেই অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা। এই সকল বিষয়ের সাথে আর একটি বিষয় জড়িয়ে আছে তা হলো নিরাপদ শারীরিক সম্পর্ক। প্রথমত: আমরা আশা করবো, সামাজিক দূরত্বের পাশাপাশি সকলেই শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখার চেষ্টা করবেন। তারপরও ইতিহাস বলে যে, এই ধরনের অবস্থার পরপরই গর্ভধারণকারী এবং বাচ্চা প্রসবের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে বৃদ্ধি পায়। এটি একটি সাধারণ প্রবণতা।
তিনি আরো বলেন, এইক্ষেত্রে, আমরা অবশ্যই পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি ব্যবহারের উপর গুরুত্ব আরোপ করি এবং মনে করি এটাও একটা প্রয়োজনীয় সেবা। এই গুরুত্বকে বিবেচনায় রেখে আমরা আমাদের সেবা কেন্দ্রসমূহ খোলা রেখেছি এবং বিভিন্ন মিডিয়ার সাহায্যে সচেতনতা তৈরীর কাজ করছি। পাশাপাশি আমি মনে করি, বেসরকারী সংস্থাসমূহ যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি ও নিরাপত্তা মেনে এই সেবা কার্যক্রম অব্যাহত রাখার জন্য উদ্যোগ নিতে পারেন এবং হটলাইন ও তথ্যসেন্টার সম্পর্কে প্রচারণা বৃদ্ধির জন্যেও পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারেন। কেননা, এই সময়ে গর্ভধারনও ঝুঁকি। কারণ চাইলেও প্রয়োজনীয় সেবার জন্য বাড়ি থেকে বের হওয়া, স্বাস্থ্য কেন্দ্রে যাওয়া কিংবা সেবা প্রদানকারীকে সময়মতো পাওয়া একটু কঠিন হবে। তাই সুস্থ জীবনের জন্য পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি গ্রহণ ও নিরাপদ শারীরিক সম্পর্কে সচেতন হওয়া একান্ত আবশ্যক।
কিশোর-কিশোরীদের এই সময় করনীয় বিষয়ে তিনি বলেন, এখানে একটি নির্দিষ্ট বয়সের জনগোষ্ঠীর কথা না বললেই নয়। তারা হলেন আমাদের দেশের সকল কিশোর-কিশোরীবৃন্দ। কারণ এই বয়সে তাদের পৃথক পৃথক শারীরিক ও মানসিক চাহিদা থাকে। উপর্যুপরি আমাদের দেশে বাল্যবিবাহের কারনে যাদের পরিণত বয়সের আগে বিয়ে হয়ে গেছে তারা সঙ্গত কারনেই বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। এই বিপদকালীণ সময়ে তাদেরকে আলাদাভাবে তথ্য এবং সেবা প্রদানের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের কথা আমরা গুরুত্বের সাথে বিবেচনায় এনে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছি। যেমন- বাংলাদেশ টেলিভিশনের মাধ্যমে আমরা যথাযথ তথ্য পৌঁছে দিচ্ছি। প্রসবকালীণ এবং পরিবার পরিকল্পনা সেবা প্রদানের জন্য আমাদের সেবা কেন্দ্রসমূহ খোলা আছে। তবে সামাজিক দূরত্বের কথা বিবেচনায় রেখে আমরা তাদেরকে সচেতন করে যাচ্ছি এবং জরুরী সেবা প্রদান করছি।
যেকোন কর্মসূচী পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের সময়, অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে আমাদের মাথায় রাখা দরকার যে, পরিবার পরিকল্পনা হচ্ছে একটি জরুরি সেবা যার সাথে জড়িয়ে আছে আমাদের স্বাস্থ্য, উন্নয়ন এবং কল্যাণ। এটি কোন বিচ্ছিন্ন সেবা নয় এবং এই কর্মসূচী অন্যান্য উন্নয়ন কর্মকান্ডের সাথে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। তাই, বিশেষ করে এই বিশ্ব মহামারীর সময়ে এর প্রতি আলোকপাত করে কাজ করা প্রয়োজন।
এখানে উল্লেখ্য যে, করোনা পরবর্তীকালে একটা খাদ্য সংকট দেখা দিতে পারে বলে অনেকেই আশংকা প্রকাশ করেছেন। ইতিমধ্যে, আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী খাদ্য নিরাপত্তার কথা ভেবে প্রতিটি খালি জায়গায় শাক্-সবজির চাষসহ অন্যান্য ফসল ফলানোর জন্য সকলকে আহ্বান জানিয়েছেন। এ আহ্বানের মর্ম আমাদের অবশ্যই অনুধাবন করে কাজ করতে হবে। মনে রাখতে হবে যে ‘ সময়ের এক ফোঁড় , অসময়ের দশ ফোঁড়।’
পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচীকে আরও গ্রহণযোগ্য ও জনবান্ধব করতে সেবা গ্রহণকারীদের জীবন দক্ষতা এবং আয় বৃদ্ধিমূলক বিষয়ে প্রশিক্ষণ রাখা দরকার। আর একটি বিষয় যা সরাসরি আমাদের কর্মসূচীর আওতায় পরেনা কিন্তু তার প্রভাব স্বাস্থ্য, উন্নয়ন, সর্বোপরি মানুষের অধিকারকে বঞ্চিত করে তা হলো নারীর প্রতি সহিংসতা এবং এটি প্রতিরোধের জন্য প্রয়োজন সমন্বিত কর্মসূচী। যা নারীদেরকে তাদের পরিবারে সিদ্ধান্ত গ্রহন, অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে অংশগ্রহণ, নিজের বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণে সক্ষম করতে সাহায্য করবে।
তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে বিভিন্ন প্রচার মাধ্যমের সাহায্যে পারিবারিক ও মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা বাড়াতে হবে, বিলম্বিত গর্ভধারণ এবং জীবনের সাথে জড়িত অন্যান্য বিষয়ে কাজ করে যেতে হবে। এ সেবাগুলোকে ‘একান্ত প্রয়োজনীয় সেবা’ হিসেবে গণ্য করে আন্তরিকতার সাথে অবিচলভাবে এগিয়ে যেতে হবে।

Please follow and like us:





উত্তর দিন

Wordpress Social Share Plugin powered by Ultimatelysocial