পরিবার পরিকল্পনা : নারীর যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য অধিকার
আগামী ৮ই মাচ, বিশ্ব নারী দিবস। “সবাই সমান ”এই প্রতিপাদ্য নিয়ে সারা বিশ্বে পালিত হচ্ছে হচ্ছে আন্তজাতিক নারী দিবস। একটি সমতার পৃথিবীর অথই হল একটি সক্ষমতার পৃথিবী। সবসময়ই ব্যক্তিগতভাবে আমরা সকলেই আমাদের চিন্তা ও কাজের জন্য দায়বদ্ধ থাকি। আর আমরাই প্রত্যক্ষভাবে নারীর ক্ষমতায়ন ও অধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সকল ধরণের বাঁধা, পক্ষপাতিতা এবং প্রচলিত সামাজিক কুসংস্কারগুলো ভেঙ্গে দিতে পারি। সমাজের প্রচলিত জেন্ডার ধারণায় ভাবা হয় নারীর কাজ কেবল সন্তান জন্মদান করা বা লালন পালন করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। কিন্তু পুরুষের মত নারীরও রয়েছে কাজ করার অধিকার, আথিকভাবে স্বচ্ছল হওয়ার অধিকার। নারীর অন্যান্য অধিকারের মধ্যে অন্যতম প্রধান অধিকার হল যৌন ও প্রজনণ স্বাস্থ্যের অধিকার। সকল মানুষেরই যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য পাওয়ার সমান সুযোগ লাভের অধিকার রয়েছে।
বাংলাদেশের অনেক মানুষেরই যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য অধিকার বিষয়ে পযাপ্ত জানাশোনা নেই। এর অন্যতম প্রধান কারণ হল সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কুসংস্কার যা তাদের মধ্যে ব্যপকভাবে নীরবতা তৈরি করছে। আবার বাল্য বিয়ের হারও এখনও প্রকট আকারে রয়েছে। গ্রামীন পযায়ে এখনও শতকরা ৫৩ ভাগ বাল্য বিয়ে হচ্ছে। উন্নয়নশীল দেশের মধ্যে বাল্যবিয়ের এই হার সবোচ্চ। মেয়েদের বিয়ের গড় বয়স ১৫.৫ বছর। ৪৭ শতাংশ মেয়ওে ১৮ বছরের আগেই বিয়ে হয়। ১০.৭ শতাংশ মেয়ের ১৫ বছরের আগেই বিয়ে হয়ে যাচ্ছে। এই বিপুল সংখ্যক কিশোরী উপযুক্ত যৌন ও প্রজনন শিক্ষা না নিয়েই বৈবাহিক জীবন শুরু করছে। উন্নয়নশীল দেশের মধ্যে কিশোরী প্রজনণের হার সবোচ্চ। ১৫ বছরের কম বয়সী কিশোরীদের প্রতি ১০ জনে ১ জন, ১৯ বছরের কম বয়সী প্রতি ৩ জনে ১ জন সন্তান জন্ম দিচ্ছে। এতে করে মা ও শিশুর উভয়েরই স্বাস্থ্য রয়েছে ঝুঁকির মধ্যে।
বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ২ লাখ ৭০ হাজার নারী অনাকাক্সিক্ষত গর্ভধারণ করে এবং ১ লাখ ১৯ হাজার ৪০০ গর্ভপাত হয়। আবার অনাকাক্সিক্ষত গর্ভধারণের কারনে হয় অনিরাপদ এমআর। এতে মাতৃস্বাস্থ্য থাকে মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে। অনাকাক্সিক্ষত গর্ভপাতের কারণে মাতৃমৃত্যুর হার প্রায় ৭ শতাংশ। এছাড়াও কিশোরী বয়সে গর্ভধারণের ফলে কম ওজনের শিশু জন্ম দেওয়া, রক্তস্বল্পতা, গর্ভকালীন জটিলতাসহ বিভিন্ন সমস্যা দেখা দেয়। কিশোরী মায়েদের থাকে সাভিক্যাল ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি। আরও একটি বড় ঝুঁকি থাকে মানসিক অসুস্থতার যার ফলে পারিবারিক জীবন হয়ে ওঠে দুবিসহ।
প্রজনন স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা সম্পকে প্রয়োজনীয় তথ্যের অভাবে বাল্য বিয়ে, অল্প বয়সে গভধারণ, গভপাতসহ বিভিন্ন প্রকার ঘটনা ঘটছে। এতে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে নারীর প্রজনন স্বাস্থ্য। পরিবার পরিকল্পনা সম্পকে যথেষ্ট তথ্য জানার অভাবে মা ঘন ঘন সন্তান জন্ম দিচ্ছে। মা ও শিশু উভয়েই থাকছে মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে। ফলে ভবিষ্যতে আমরা তৈরি করছি একটি দুবল জাতি যা আমাদের অথনীতিকে করছে ঝুঁকিপূণ। এছাড়াও সামাজিকভাবে নারী পুরুষের প্রকট বৈষম্য থাকার কারণেও নারীরা তাদের অধিকারগুলো থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
পরিবার পরিকল্পনা হলো আমাদের জীবনের কল্যাণকর দিক, এটি নারীর সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমত। একজন নারী কতজন সন্তান নেবে, কত সময় পর সন্তান নেবে এই বিষয়ে তার সিদ্ধান্ত নেওয়ার সম্পূণ অধিকার রয়েছে। এতে করে সে তার অথনৈতিক ও সামাজিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে পারে। নারীর অথনৈতিক ক্ষমতায়ন তার সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতার বৃদ্ধি ঘটায় যার ফলে সে পারিবারিক ও সামাজিক বিভিন্ন ক্ষেত্রে তার অধিকারটুকু নিশ্চিত করতে পারে। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার তৃতীয় লক্ষ্যমাত্রা হল সকল বয়সের মানুষের জন্য সুস্থজীবন ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা। অপরদেিক এর পঞ্চম লক্ষ্যমাত্রা হল জেন্ডার সমতা এবং সকল নারী ও মেয়দের ক্ষমতায়ন করা। সকল ক্ষেত্রে নারীর সম অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে প্রয়োজন সমন্বিত যৌন ও প্রজনণ স্বাস্থ্য শিক্ষা ও সকলের জন্য মানসম্মত যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য সেবার ব্যবস্থ্যা ও সেবা পাওয়ার সুযোগ যা সরকারকে এফপি ২০২০ কমিটমেন্ট ও টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অজনে সহায়তা করবে।
লেখক: প্রোগ্রাম কো-আডিনেটর, এএফপি মিডিয়া অ্যাডভোকেসি।
