গরীবের ডাক্তার নির্মল চন্দ্র মিস্ত্রি
“ফার্মেসী ব্যবসা এমন একটি পেশা যেটা কেবল ব্যবসা প্রতিষ্ঠান মনে করলে চলবেনা। এটা একটি সেবামুলক প্রতিষ্ঠানও। রোগ-শোক মানুষকে আগাম জানান দিয়ে আসে না। তদ্রুপ প্রয়োজন ব্যাপারটাও এমন একটি বিষয় দরকারের সময় যা না পেলে তা পরে আর কোন কাজেই আসেনা। তখন সে যদি বড় কোন ধনাঢ্যবান ব্যক্তিও হয় তারপরও সে হয়ে পড়ে অসহায়। তাই মানুষের প্রয়োজনে দীর্ঘ ৬০ বছর ধরে ঔষধের দোকান খুলে সেবা দিয়ে যাচ্ছি।” কথাগুলো বলছিলেন, পিরোজপুরে নেছারাবাদ (স্বরূপকাঠী) উপজেলার স্বরূপকাঠি বাজারের সুপারিপট্টি সংলগ্ন অবস্থিত আমিনা ফার্মেসীর মালিক নির্মল চন্দ্র মিস্ত্রী (৮২)।
স্থানীয় সাধারণ মানুষদের মধ্যে তাকে আবার অনেকেই সম্বোধন করে গরিবের ডাক্তার বলে। এ গরীবের ডাক্তারের বাড়ী উপজেলার সমেদকাঠি ইউনিয়নের লক্ষনকাঠি গ্রামে। নির্মল মিস্ত্রি জীবনের ৬০টি বছর ধরে এ পেশায় জড়িত। ঝড়-বৃষ্টি-বাদলসহ প্রাকৃতিক বৈরী আবহাওয়া যতই থাকুক তার ঔষধের দোকান থাকে ২৪ ঘন্টা খোলা। তার বাড়ী, জমি-জিরাত থাকলেও রাতে তিনি বাড়ীতে থাকেন না। কেননা যদি কারো রাত-বিরাতে ঔষধের প্রয়োজন হয়, তখন ওই ব্যক্তি যাবেন কোথায় ? আর এটা ভেবেই তিনি রাতেও থাকে ফার্মেসীতে। যদিও আইন অনুযায়ী ডাক্তারের প্রেসক্রিপসন ছাড়া কোন ঔষধ বিক্রি আইনত দন্ডনীয়। তবে স্থানীয় শিক্ষিত সচেতন লোকজনের ভাষায় তাকে কোন এমবিবিএস ডাক্তার বলে সম্বোধন না করা গেলেও আজকাল গ্রামে যেসব বানিজ্যিক আরএমপি চিকিৎসক আছেন, তাদের সবার উপরে গরীবের ডাক্তার নির্মল চন্দ্র মিস্ত্রিকে স্থান দিতেই হয়। কারণ তার কাছে যে সব খেটে খাওয়া মানুষেরা জ¦র, সর্দি, মাথা ব্যাথা, ডাইরিয়াসহ ছোটখাট রোগ নিয়ে আসেন তাদের রোগের কথা শুনে ওই ডাক্তার বাবু সামর্থ্যর মধ্যে প্রয়োজনীয় ঔষধ দিয়ে চিকিৎসার কোন ফি রাখেন না। আর চব্বিশ ঘন্টাই থাকেন দোকানে। কার কখন ঔষধের প্রয়োজন হয়ে পড়ে। এজন্য রাতেও তিনি ঘুমান ওই ফার্মেসীতে।
স্থানীয় সাংবাদিক মাসুদুল আলম অপু বলেন, আজও ভুলতে পারিনা সেই ভয়াবহ রাতের কথা। ‘আমার বাবা মুমুর্ষ অবস্থায় বিছানায় শায়িত ছিলেন। আনুমানিক রাত দুইটার সময় ডাক্তার বললেন- এখনি আপনার বাবাকে স্যালাইন পুশ করতে হবে। তখন দু:চিন্তায় পড়ে গেলাম। এই রাতে কোথায় স্যালাইন পাওয়া যাবে। তখন পাশে থাকা কয়েকজন মুরব্বিরা বললেন, এই রাতে কোন ফার্মেসী খোলা না থাকলেও নির্মল বাবুর দোকানে গেলেই ঔষধ পাওয়া যাবে। কারণ, মানুষের প্রয়োজনেই সে ঘর ছেড়ে ওই ফার্মেসীতেই ঘুমায় আর ওখানেই থাকে। ফার্মেসী যে একটি কেবল ব্যবসা নয় সেবাও তা তিনি সবাইকে দেখিয়ে দিচ্ছেন।’
স্বরূপকাঠি পৌরসভার একাধিকবার নির্বাচিত ৭নং ওয়ার্ডের বর্তমান কাউন্সিলন মো. নুরুল ইসলাম বলেন, আমার কাছে নির্মল বাবু একজন অত্যন্ত ভাল মনের মানুষ। কেননা গ্রামের কোন মানুষের যদি গভীর রাতে একটা পাঁচ টাকা দামের ট্যাবলেটেরও প্রয়োজন পড়ে তার কাছে গেলে সে ঘুম থেকে উঠে ট্যাবলেটটা দিবেন। এজন্য তিনি ঔষধের বেশি দামও রাখেন না।
এভাবে তিনি এলাকার সর্বসাধারণের কাছে গরীবের ডাক্তার হিসেবে নির্মল বাব্ ুএকটি আস্থার জায়গা তৈরী করেছেন বলে অধিকাংশ লোকই মত প্রকাশ করেন।
এ ব্যপারে ফার্মেসী ব্যবসায়ী নির্মল চন্দ্র মিস্ত্রি বলেন, জানিনা কতদূর মানুষের উপকার করতে পেরেছি। তবে এলাকার এমনকি স্বরূপকাঠি অধিকাংশ মানুষের ভালবাসা আমাকে এ কাজে উৎসাহ যুগিয়েছে। যতদিন বেঁচে থাকবো যেন মানুষের উপকার করে যেতে পারি।
