স্বরূপকাঠীর নতুন অহংকার ‘কাগজী লেবু’
‘লেমু চাষে বেশী লাভ হয়, ফলনও ভাল হয়। কিন্ত মোড়া আন্দাজে চাষ করি। কোন শিক্ষা বা বুদ্ধি পাইনা, কৃষি অফিসের কেউ খোঁজও লয়না’। কথাগুলো আক্ষেপ করে বলেছেন লেবু চাষী মাখম মন্ডল। পেয়ারা, সবজি আর আমড়ার জন্য প্রসিদ্ধ পিরোজপুরের স্বরূপকাঠী (নেছারাবাদ) উপজেলায় কাগজী লেবুর বানিজ্যিক চাষ শুরু হয়েছে। যদিও আরও ৫-৬ বছর আগে এ লেবু চাষের শুরু। তবে গত ২-৩ বছর ধরে চাষীরা বাগান থেকে লেবু তোলা শুরু করেছেন।
সরেজমিনে স্বরূপকাঠীর আটঘর-কুড়িয়ানা ও জলাবাড়ী ইউনিয়নের ১৪ গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে সবুজ বাগানগুলোর গাছে গাছে লেবুর সরেস চাহনি। ফল ও সবজি সমৃদ্ধ স্বরূপকাঠীতে ঔষধি ও জনপ্রিয় কাগজী লেবুর সমাহার যেন এ উপজেলার নতুন অহংকার।
স্বরূপকাঠী উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা চপল কৃঞ্চ নাথ জানান, উপজেলার প্রায় শতাধিক হেক্টর জমিতে কাগজী লেবুর দুই শতাধিক বাগান রয়েছে। এসব বাগানের অধিকাংশই আটঘর-কুড়িয়ানা ও জলাবাড়ি ইউনিয়নে। তিনি জানান, লেবুর বৈজ্ঞানিক নাম LEMON/LIME EV CITRUS-LIMAN। প্রচুর পরিমানে ‘ভিটামিন সি’ সমৃদ্ধ কাগজী লেবুর ঔষধি গুনও অনেক। প্রতি হেক্টরে ফলন হয় ৩ থেকে ৪ মেট্রিক টন। বাউ জাতের নতুন কাগজী লেবু উদ্ভাবতি হলেও দক্ষিণাঞ্চলে এখনও সাধারণ জাতের কাগজী লেবুর চাষ হচ্ছে। পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মায়নুল হাসান জানিয়েছেন, দক্ষিণাঞ্চলের আবহাওয়া কাগজী লেবু চাষের জন্য অত্যন্ত অনুকূল। এ লেবু স্বাস্থের জন্য খুবই উপকারী। ফলন হয় সারাবছর। তিনি বেশী ফলনের জন্য চারার পরিবর্তে কলমের বাগান করতে কৃষকদের পরমর্শ দিয়েছেন।
আটঘর-কুড়িয়ানা ইউনিয়নের কটুরাকাঠী গ্রামের লেবু চাষী মাখম মন্ডল জানান, ২০১১-১২ সালে তিনি এক বিঘা জমিতে লেবুর বাগান করেন। ৩/৪ বছর পরই গাছে ফলন ধরতে শুরু করে। দুই বছর ধরে তিনি লেবু বিক্রি করছেন। আগে ওই জমিতে তিনি সবজি চাষ করতেন। একবিঘা জমিতে সবজি চাষ করে বছরে খরচ বাদে আয় করতেন ৩০-৩৫ হাজার টাকা। কিন্ত লেবু চাষ করে পাচ্ছেন বছরে ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকা। 
আটঘর-কুড়িয়ানা এবং জলাবাড়ি ইউনিয়নের ১৪ গ্রামের লেবু চাষীরা জানান, সারাবছরই লেবুর ফলন হয়। তার মধ্যে ৪/৫ মাস প্রচুর লেবু ফলে। তবে জৈষ্ঠ্য থেকে শ্রাবন মাস পর্যন্ত লেবুর ভরা মৌসুম।
আদমকাঠী গ্রামের চাষী স্বপন কুমার হালদার জানান, বাগান থেকে চাষীরা লেবু নিয়ে যান, জিন্তাকাঠী, আটঘর ও আদমকাঠীর মোকামে। সেখানে বড় পাইকাররা এসে লেবু কিনে দেশের বিভিন্ন স্থানে চালান করেন। বড় লেবু প্রতিপন (৮০টি) ১৫০-১৬০ টাকায় এবং ছোট লেবু ৮০-১১০ টাকায় বিক্রি করেন। কুড়িয়ানার পেয়ারা চাষী সমিতির সাবেক সভাপতি জহর মন্ডল জানান, পেয়ারা চাষে এখন লাভ কমে গেছে। তাই স্বরূপকাঠীর চাষীরা লেবু ও আমড়া চাষের দিকে ঝুকেছেন।
চাষীরা জানান, সবজি, পেয়ারা ও আমড়ার পর স্বরূপকাঠীতে এখন কৃষকরা লেবু চাষের দিকে ঝুকলেও চাষী এবং পাইকারদের সংকটের শেষ নেই। লেবু চাষের জন্য চাষীদের কোন রকম প্রশিক্ষন দেয়া হয়না। রাজাপুর গ্রামের লেবুচাষী অমল হালদার জানান, স্থানীয় কৃষি বিভাগ লেবু চাষে তাদের কোন ধরনের প্রশিক্ষন অথবা পরমর্শ দেয়না। চাষীদের নিজেদের বুঝ ব্যবস্থায় নিজেরাই বাগান করছেন। লেবু চাষ স্বরূপকাঠী এলাকায় নতুন হওয়ায় এর রোগবালাই সম্পর্কে চাষীরা তেমন জানেন না। এছাড়া লেবু চাষের জন্য সম্প্রতি এক বছর মেয়াদী ব্যাংক ঋন দেওয়া শুরু হলেও বিনামূল্যে সার ও বালাইনাশক দেওয়া হয়না। ফলে চাষীরা নিজস্ব ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে লেবু চাষ করেন।
চাষী এবং পাইকারদের যোগাযোগ সংকটও প্রকট। যোগাযোগ সংকটের কারনে চাষীরা লেবুর ন্যায্যমুল্য পাচ্ছেন না। হাজার হাজার পন লেবু নিয়ে চাষীদের যেতে হয় আটঘর ও জিন্তাকাঠি মোকামে। সেখান থেকে পাইকাররা ট্রাকে লেবু নিয়ে যান ঢাকা, ফরিদপুর, মাগুরা, কুষ্টিয়াসহ দেশের বিভিন্ন জেলায়। চাষীরা জানান সরসরি বাগান থেকে পাইকাররা লেবু পরিবহন করতে না পারায় তাদের পরিবহন ব্যয় বেড়ে যায়। এজন্য প্রতি পন লেবুতে তারা ৩০ থেকে ৫০ টাকা কম পান। এছাড়া বাগান থেকে ট্রলারে করে আটঘর ও জিন্তাকাঠি মোকামে নিতে আলাদা শ্রমিক মজুরী দিতে হয়। এভাবে বারে বারে মজুরী দিতে গিয়ে কৃষক ও পাইকারদের লাভের অংশ কমতে থাকে। এছাড়া বরিশাল-নবগ্রাম-স্বরূপকাঠী সড়কের বরিশাল অংশ এবং স্বরূপকাঠী-ঝালকাঠী সড়ক ভাঙ্গা হওয়ায় এ পথে লেবু পরিবহন করতে কৃষকদের বাড়তি ভাড়া গুনতে হয়।
চাষীদের প্রশিক্ষণ না পাওয়ার অভিযোগ প্রসঙ্গে উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা চপল কৃঞ্চ নাথ বলেন, লেবু চাষীদের সরকারি প্রশিক্ষণ দেয়ার কোন কার্যক্রম নেই। তবে লেবু জাতীয় ফসলের ‘সম্প্রসারন, ব্যবস্থাপনা ও উৎপাদন বৃদ্ধি প্রকল্প’ নামে একটি নতুন প্রকল্প হাতে নিয়েছে কৃষি সম্প্রসারন অধিদপ্তর। এজন্য স্থানীয় কৃষি বিভাগ থেকে মাঠ পর্যায়ে সার্ভে শুরু হয়েছে। এ প্রকল্পের আওতায় উপজেলা কৃষি বিভাগ লেবুর ৩০টি নতুন প্রদর্শনী প্লট ও ২৫টি পুরানো বাগানের পরিচর্যা করবে। যার তালিকা করা হচ্ছে।
