প্রধান সূচি

১০ই এপ্রিল এবং ঐতিহাসিক মুজিবনগর সরকার

১৯৬৬ সালের ৫ই ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পশ্চিম পাকিস্তানী সাংবাদিকদের কাছে তার ঐতিহাসিক ৬ দফা পেশ করেন। তখনই মূলত পাকিস্তানের উভয় অংশের ভাগ্য নির্ধারিত হয়ে যায়। তারপর সেই জ্বালিয়ে দেওয়া আগুনকে নেভাতে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলাও তেমন কোন ফল দেয়নি। সেই আগুনে পুরোপুরি ঘি ঢেলে দেয় ১৯৭০ এর সাধারণ নির্বাচন। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সবাই আশাবাদী ছিল হয়তো নিয়মতান্ত্রিকভাবেই ক্ষমতার হস্তান্তর হবে। কিন্তু আদতে তা হয়নি। ২৫শে মার্চ যেদিন গণপরিষদের অধিবেশন বসার তারিখ ইয়াহিয়া ঢাকা থেকে পালিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানে চলে যান। ২৫শে মার্চ গভীর রাতে বাঙালির উপর নেমে আসে ইতিহাসের অন্যতম গণহত্যার নারকীয় তান্ডব। পুরো পরিস্থিতি এমন ভাবে এগিয়ে ছিল যে শেখ মুজিব সেই সময়টুকু কিংবা সুযোগটুকুও করে উঠতে পারেননি যে যদি তাকে উঠিয়ে নিয়ে কারাবন্দী করে রাখা হয় আর বাঙালির উপর নেমে আসে তান্ডব তাহলে সেই পরিস্থিতিতে কে বা কারা কিভাবে আন্দোলন পরিচালনা করবেন।
আসলে একটা নির্বাচিত সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর এর পরিবর্তে উল্টো তাদের উপর এরকম নারকীয় হত্যাকান্ড শুরু হবে তা ইতিহাসে বিরল। এরকম একটা পরিস্থিতিতে যখন শেখ মুজিবকে উঠিয়ে অজ্ঞাত জায়গায় নিয়ে যাওয়া হল আর পুরো দেশে নেমে এলো হত্যা আর ধ্বংসের অন্ধকার তখন ভারতে পালিয়ে যাওয়া বঙ্গবন্ধুর সহযোগী তাজউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে সম্ভব হল ১০ই এপ্রিলের অস্থায়ী সরকার গঠন। বঙ্গবন্ধুকে সরকার প্রধান করে সৈয়দ নজরুল ইসলামকে করলেন অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি আর তাজউদ্দিন আহমদ দায়িত্ব নিলেন প্রধানমন্ত্রীর। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে যেহেতু পূর্ব থেকেই গঠন করা কোন কমিটি বা কর্তৃপক্ষ ছিল না তাই এই অস্থায়ী সরকার গঠন করা ছাড়া কোনো বিকল্প ছিল না।
এই অস্থায়ী সরকার পরবর্তীতে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পেছনে ব্যাপক এবং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। ভারত সরকারের সরাসরি সহায়তার পাশাপাশি তারা সক্ষম হয়েছিল বিশ্ববাসীর সমর্থন আদায়ে। তারা একটি স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র রচনা করেছিল এবং ১২টি মন্ত্রণালয় (প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, অর্থ, শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, মন্ত্রিপরিষদ সচিবালয়, সাধারণ প্রশাসন বিভাগ, স্বাস্থ্য ও কল্যাণ মন্ত্রণালয়, তথ্য ও বেতার মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রণালয়, সংসদ বিষয়ক বিভাগ, কৃষি বিভাগ, প্রকৌশল বিভাগ) তৈরি করে তা ৪ জন মন্ত্রী যেমন তাজউদ্দীন আহমদ, খন্দকার মোশতাক আহমেদ, এম মনসুর আলী এবং এ এইচ এম কামারুজ্জামান এর মধ্যে ভাগ করে দিয়েছিলেন। এছাড়াও মন্ত্রণালয়ের বাইরে আরো কয়েকটি সংস্থা ছিল যারা মূলত সরাসরি মন্ত্রী পরিষদের অধীনে কাজ করতো। এগুলো হলো পরিকল্পনা কমিশন, শিল্প ও বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ, যুব ও অভ্যর্থনা, ত্রাণ ও পুনর্বাসন কমিটি, শরণার্থী কল্যাণ বোর্ড।
উপ-রাষ্ট্রপতির দপ্তর: উপদেষ্টাবৃন্দ – মোহাম্মদ উল্লাহ (এমএনএ), সৈয়দ আবদুস সুলতান (এমএনএ), কোরবান আলি (এমএনএ); একান্ত সচিব – কাজী লুৎফুল হক; সহকারী সচিব – আজিজুর রহমান; প্রধান নিরাপত্তা অফিসার – সৈয়দ এম করিম।
প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরঃ এডিসি – মেজর নূরুল ইসলাম; একান্ত সচিব – ডাঃ ফারুক আজিজ; তথ্য অফিসার – আলী তারেক।
স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রটি (মুজিব নগর, বাংলাদেশ, ১০ই এপ্রিল, ১৯৭১) ছিলো নিম্নরূপ :
যেহেতু ১৯৭০ সনের ৭ই ডিসেম্বর থেকে ১৯৭১ সনের ১৭ই জানুয়ারি পর্যন্ত একটি শাসনতন্ত্র রচনার অভিপ্রায়ে প্রতিনিধি নির্বাচনের জন্য বাংলাদেশে অবাধ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
এবং
যেহেতু এই নির্বাচনে বাংলাদেশের জনগণ তাদের ১৬৯ জন প্রতিনিধির মধ্যে ১৬৭ জনই আওয়ামী লীগ থেকে নির্বাচিত হয়েছিল।
এবং
যেহেতু জেনারেল ইয়াহিয়া খান একটি শাসনতন্ত্র রচনার জন্য ১৯৭১ সনের ৩রা মার্চ জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের অধিবেশন আহবান করেন।
এবং
যেহেতু আহূত এ পরিষদ স্বেচ্ছাচার ও বেআইনিভাবে অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করা হয়।
এবং
যেহেতু পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী তাদের প্রতিশ্রুতি পালনের পরিবর্তে বাংলাদেশের গণপ্রতিনিধিদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা চলাকালে একটি অন্যায় ও বিশ্বাসঘাতকতা মুলক যুদ্ধ ঘোষণা করে।
এবং
যেহেতু উলে¬খিত বিশ্বাসঘাতকতামূলক কাজের জন্যে উদ্ভূত পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষের অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার অর্জনের আইনানুগ অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য ১৯৭১ সনের ২৬শে মার্চ ঢাকায় যথাযথভাবে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন এবং বাংলাদেশের অখন্ডতা ও মর্যাদা রক্ষার জন্যে বাংলাদেশের জনগণের প্রতি উদাত্ত আহবান জনান।
এবং
যেহেতু পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী একটি বর্বর ও নৃশংস যুদ্ধ পরিচালনাকালে বাংলাদেশের অসামরিক ও নিরস্ত্র জনসাধারণের বিরুদ্ধে অগুণিত গণহত্যা ও নজিরবিহীন নির্যাতন চালিয়েছে এবং এখনো চালাচ্ছে।
এবং
যেহেতু পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী অন্যায় যুদ্ধ, গণহত্যা ও নানাবিধ নৃশংস অত্যাচার চালিয়ে বাংলাদেশের জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের একত্র হয়ে একটি শাসনতন্ত্র প্রণয়ন করতে ও নিজেদের সরকার গঠন করতে সুযোগ করে দিয়েছেন।
এবং
যেহেতু বাংলাদেশের জনগণ তাদের বীরত্ব, সাহসীকতা ও বিপ¬বী কার্যক্রমের দ্বারা বাংলাদেশের ভূ-খন্ডের উপর তাদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছেন।
সেহেতু সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী বাংলাদেশের জনগণ নির্বাচিত প্রতিনিধিদের পক্ষে যে রায় দিয়েছেন সে মোতাবেক আমরা নির্বাচিত প্রতিনিধিরা আমাদের সমবায়ে গণ-পরিষদ গঠন করে পারস্পরিক আলাপ আলোচনার মাধ্যমে বাংলাদেশের জনগণের জন্যে সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা করা আমাদের পবিত্র কর্তব্য বিবেচনা করে আমরা বাংলাদেশকে সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রিক রাষ্ট্রে রূপান্তরিত করা সিদ্ধান্ত ঘোষণা করছি এবং এতদ্বারা পূর্বাহ্নে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের স্বাধীনতা ঘোষণা অনুমোদন করছি। এবং এতদ্বারা আমরা আরও সিদ্ধান্ত ঘোষণা করছি যে, শাসনতন্ত্র প্রণীত না হওয়া পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রপ্রধান ও সৈয়দ নজরুল ইসলাম উপ-রাষ্ট্রপ্রধান পদে অধিষ্ঠিত থাকবেন।
এবং
রাষ্ট্রপ্রধান প্রজাতন্ত্রের সশস্ত্র বাহিনীসমুহের সর্বাধিনায়ক হবেন, রাষ্ট্রপ্রধানই ক্ষমা প্রদর্শনসহ সর্বপ্রকার প্রশাসনিক ও আইন প্রণয়নের ক্ষমতার অধিকারী হবেন, তিনি একজন প্রধানমন্ত্রী ও প্রয়োজনবোধে মন্ত্রীসভার অন্যান্য সদস্য নিয়োগ করতে পারবেন, রাষ্ট্রপ্রধানের কর ধার্য ও অর্থব্যয়ের এবং গণপরিষদের অধিবেশন আহবান ও মুলতবির ক্ষমতা থাকবে এবং বাংলাদেশের জনগণের জন্যে আইনানুগ ও নিয়মতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠার জন্যে অন্যান্য সকল ক্ষমতারও তিনি অধিকারী হবেন।
বাংলাদেশের জনগণের দ্বারা নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে আমরা আরও সিদ্ধান্ত ঘোষণা করছি যে, যে কোন কারণে যদি রাষ্ট্রপ্রধান না থাকেন অথবা কাজে যোগদান করতে না পারেন অথবা তার দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনে যদি অক্ষম হন, তবে রাষ্ট্রপ্রধানকে প্রদত্ত সকল ক্ষমতা ও দ্বায়িত্ব উপ-রাষ্ট্রপ্রধান পালন করবেন।
আমরা আরও সিদ্ধান্ত ঘোষণা করছি যে, বিশ্বের একটি জাতি হিসেবে এবং জাতিসংঘের সনদ মোতাবেক আমাদের উপর যে দায়িত্ব ও কর্তব্য আরোপিত হয়েছে তা আমরা যথাযথভাবে পালন করব।
আমরা আরও সিদ্ধান্ত ঘোষণা করছি যে, আমাদের স্বাধীনতার এ ঘোষণা ১৯৭১ সনের ২৬শে মার্চ থেকে কার্যকরী বলে গণ্য হবে।
আমরা আরও সিদ্ধান্ত ঘোষণা করছি যে, আমাদের এই সিদ্ধান্ত কার্যকরী করার জন্যে আমরা অধ্যাপক ইউসুফ আলীকে ক্ষমতা দিলাম। এবং রাষ্ট্রপ্রধান ও উপ-রাষ্ট্রপ্রধানের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান পরিচালনার দায়িত্ব অর্পণ করলাম।

 লেখক : ব্যাংকার ও উপন্যাসিক।

Please follow and like us:





উত্তর দিন

Wordpress Social Share Plugin powered by Ultimatelysocial