তুমি মহারাজ, সাধু হলে আজ …
॥ মিজানুর রহমান মিলটন ॥
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিখ্যাত ‘দুই বিঘা জমি’ কবিতার কথা অনেকেরই মনে আছে। মনে আছে, মিথ্যা দেনার দায়ে জমিদার ডিক্রি করে উপেনের দুই বিঘা জমি হাতিয়ে নেন। সেই জমির কথা ভুলতে না পেরে ১৫ থেকে ১৬ বছর পরে উপেন ফিরে আসেন তাঁর হারানো বাড়িতে। প্রাচীর সংলগ্ন পুরোনো আমগাছটির নিচে কুড়িয়ে পান দুটি পাকা আম। এ কারণে জমিদার তাঁকে আম চুরির অভিযোগে অভিযুক্ত করেন। এমনই প্রেক্ষাপটে উপেন আফসোসের সুরে বলেন,
‘তুমি মহারাজ সাধু হলে আজ,
আমি আজ চোর বটে।’
আমাদের সমাজে ‘ভিকটিমকে’ দোষ দেওয়ার মতো ঘটনা প্রতিনিয়তই ঘটছে, বিশেষ করে ক্ষমতাধরেরা তা সচরাচরই করে আসছেন। গত সোমবার এমন একটি দুঃখজনক ঘটনার শিকার হয়েছেন আড়ংঘাটা থানার কাপালিপাড়ার নিবাসী ইজিবাইক চালক শিবদাস বিশ্বাস। ষাটোর্দ্ধ ইজিবাইক চালক প্রতিদিনের ন্যায় সারাদিন মাঠেঘাটে কাজ করে সন্ধ্যায় ইজিবাইক চালাতে বের হন। ইচ্ছে ছিলো শিবদাসের যা রোজগার হবে তা দিয়ে পরিবার পরিজন নিয়ে ভালোভাবে বেঁচে থাকার। কিন্তু ভালোভাবে বাঁচার জন্য ইজিবাইক চালাতে গিয়ে জেলের ঘানী টানতে হবে জানলে হয়তো ইজিবাইক চালাতে যেতো না শিবদাস। পুলিশের খাচায় গিয়ে বারবার বড় সাহেব (ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা)কে বোঝানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে শিবদাস ভগবানের কাছে বিচার দিয়েছেন।
দৈনিক খুলনাঞ্চল পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদে আরো জানা যায়, খুলনা মেট্রোপলিটন এলাকায় মাদক নির্মূলে পুলিশের বিশেষ অভিযান চলছে। আর অভিযানে নিজেদের অবস্থান মজবুত করতে এস আই হেলাল উদ্দিন সোর্স এনামুল শেখকে যাত্রী সাজিয়ে ওই বাইকে কৌশলে গাজা রেখে বেচারা ইজিবাইক চালক শিবদাস বিশ্বাসকে গ্রেফতার করেন।
নিয়ন্ত্রণহীন মাদক বাণিজ্য এবং ক্রমবর্ধমান মাদকাসক্তি ভয়াবহ সামাজিক বিশৃঙ্খলা ও অস্থিরতার জন্ম দিয়েছে। মাদকাসক্তি ও মাদক বাণিজ্যের কুফল প্রত্যক্ষ করে দেশের সর্বত্র মাদকের বিরুদ্ধে গণসচেতনতা এবং গণপ্রতিরোধের সামাজিক আন্দোলনও শুরু হয়েছে। অন্যদিকে সরকার এবং আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীসমূহের তরফ থেকেও মাদকের বিরুদ্ধে সচেতনতা বৃদ্ধিসহ নানা ধরনের কার্যক্রম চলছে। এমনকি দেশের সর্বত্র স্থানীয়ভাবে গড়ে ওঠা মাদক বিরোধী সামাজিক আন্দোলনের সাথেও স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের সহযোগিতা ও একাত্মতা প্রকাশের সু-সংবাদও সংবাদপত্র ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশিত হচ্ছে। এতকিছুর পরও মাদকের রমরমা বাণিজ্যে কোন ঘাটতি দেখা যাচ্ছেনা কেন? এমন প্রশ্ন যখন ঘুরেফিরে মাথায় আসে তখন প্রশ্নের জবাব কিছুটাও হলে পাওয়া গেছে আড়ংঘাটা থানা পুলিশের কর্মকান্ডে। গেল ২০ ফেব্রুয়ারি ও গতকালের দুটি সংবাদ আমার এ প্রশ্নের অনেকটা জবাব দিয়েছে। আমি মনে করি সম্মানিত পাঠকরাও আমার সাথে একমত হবেন।
সোমবারে এ ধরনের আরো একটি ঘটেছিলো নগরীর যশোর-খুলনা রোডস্থ মুজগুন্নী উত্তর পাড়া আরাফাত মসজিদের বিপরীত পাশে জামান ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কসপে। ইয়াবা ঢুকিয়ে দিয়ে ডিবি পুলিশ দ্বারা গ্রেফতার করিয়ে শত্রুতার চেষ্টা করে প্রতিপক্ষরা। ঘটনাটি এডিসি ডিবি এ এম কামরুল ইসলাম পুলিশ কমিশনারকে জানালে তিনি প্রকৃত দোষী ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে নির্দেশ দেন। নির্দেশ মোতাবেক পুলিশ পরিদর্শক সুবীর দত্ত ও এসআই মো. তহিদুল ইসলাম অভিযান পরিচালনা করে এসময় উক্ত ঘটনার নায়ক খালিশপুরের মৃত নুরুন্নবীর ছেলে মো. দেলোয়ার হোসেনকে গ্রেফতার করেন। জিজ্ঞাসাবাদে দেলোয়ার বিষয়টি স্বীকার করেন এবং পূর্ব শত্রুতার জের ধরে জমিজমা সংক্রান্তে বিরোধের কারণে জামান ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কসপের মালিককে তিনি ডিবি পুলিশকে ব্যবহার করে শত্রুতা উদ্ধারের চেষ্টা করেন বলে পুলিশের কাছে স্বীকার করেন। এখানে বলা যায় পুলিশ প্রশাসনের সদিচ্ছায় বেচারা জামান ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কসপের মালিকের শেষ রক্ষা হয়।
খুলনার মাদক কেনাবেচার স্পট এবং মাদক পাচারের রুটসহ কোথায় কারা কারা জড়িত তার বিবরণ স্থানীয় কয়েকটি পত্রিকায় একাধিকবার প্রকাশিত হলেও বছরের পর বছর ধরে অব্যাহতভাবে এবং ক্রমবর্ধমান হারে মাদকের কারবার চলে কিভাবে? এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ও সার্বজনীন প্রশ্ন। এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করা এবং মাদকের নেটওয়ার্ক নির্মূল করা দেশের গোয়েন্দা সংস্থা এবং আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য অসম্ভব কিছু নয়। কিন্তু সর্ষের ভেতর ভূত থাকলে ওঝার পক্ষে ভূত তাড়ানো কঠিন। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একশ্রেণীর সদস্য এবং স্থানীয় পর্যায়ের ব্যক্তিবর্গকে নিয়ে গড়ে উঠেছে মাদকের শক্তিশালী নেটওয়ার্ক ও সিন্ডিকেট। মাদক বাণিজ্যের কোটি কোটি টাকা প্রতিদিন ভাগ-বাটোয়ারা হয়ে এই সিন্ডিকেটকে আরো শক্তিশালী ও দুর্ভেদ্য করে তুলছে।
দেশে এখন কোন রাজনৈতিক আন্দোলন সংঘাত-সহিংসতা না থাকলেও পারিবারিক-সামাজিক অপরাধ ও সহিংসতার শিকার হচ্ছে অসংখ্য মানুষ। চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহারও অতীতের যে কোন সময়ের চেয়ে ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করেছে। এ ধরনের সামাজিক পরিস্থিতির পেছনে মাদক বাণিজ্য, মাদক সন্ত্রাসী সিন্ডিকেটের সম্পৃক্ততা সুস্পষ্ট।
মাদক সন্ত্রাসীরা বছরের পর বছর ধরে বাধাহীনভাবে তাদের নেটওয়ার্ক বিস্তৃত করতে করতে এখন অপ্রতিরোধ্য হয়ে খোদ অস্ত্রধারী আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের উপর আক্রমণ করতেও শুরু করেছে। ফেনী সীমান্তে মাদক ব্যবসায়ীদের হামলার শিকার হয়ে এক আনসার সদস্য নিহত এবং ম্যাজিস্ট্রেট গুরুতর আহত হওয়ার খবর সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে।
সীমান্তপথে বছরে কোটি কোটি ইয়াবা ট্যাবলেট দেশে প্রবেশ করছে। সেই সাথে দেশের বিভিন্ন স্থানে ইয়াবা তৈরীর কারখানা গড়ে উঠছে। লাখ লাখ তরুণ-তরুণী ইয়াবা, হেরোইন, সিসা, ফেন্সিডিলসহ বিভিন্ন ধরনের মাদকে আসক্ত হয়ে পরিবার ও সমাজকে বিশৃঙ্খল করে দিচ্ছে।
মাদকের সামাজিক-অর্থনৈতিক প্রভাব বিবেচনায় সারাবিশ্বেই মাদক চোরাচালানের মত অপরাধ সর্বোচ্চ শাস্তির আওতাভুক্ত। পত্র-পত্রিকায় মাদকের নেটওয়ার্ক ও সিন্ডিকেট সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট তথ্যাবলী প্রকাশিত হচ্ছে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কাছেও তাদের তথ্য রয়েছে। কিন্তু দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়ায় তা’ কমছে না। আড়ংঘাটা থানার এসআই হেলালদের আর চোরাচালান ও সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতির বাস্তবায়ন না করলে মাদকের ভয়াবহ ছোবল থেকে সমাজ ও জাতিকে রক্ষা করা সম্ভব হবে না বলে আমি মনে করছি।
লেখক : সম্পাদক ও প্রকাশক দৈনিক খুলনাঞ্চল।
