প্রধান সূচি

ঐতিহাসিক নরসিংদীর বালাপুর জমিদার বাড়ি

কন্ঠ ডেস্ক :

নরসিংদী জেলা সদর থেকে সোজা দক্ষিণে পাইকার চর ইউনিয়নের মেঘনা নদী সংলগ্ন বালাপুর গ্রাম। সদর উপজেলা থেকে প্রায় ১৭ কি.মি. দক্ষিণে মেঘনা নদীর তীর ঘেঁষে দীর্ঘ প্রায় ৩২০ বিঘা জমির উপর প্রতিষ্ঠিত বালাপুরের জমিদার বাড়িটি নির্মিত। জমিদার কালী মোহন সাহা (কালী বাবু) পিতামহ নবীন চন্দ্র সাহার বাড়ি। নবীন চন্দ্র সাহার ছিল ৩ পুত্র, কালী মোহন সাহা (জমিদার বাবু), আশুতোষ সাহা, মনোরঞ্জন সাহা। এদের মধ্যে জমিদার কালী বাবুই ছিল প্রধান।

বংশধর হিসেবে অনিল চন্দ্র সাহা তার ২ ছেলে, অজিৎ চন্দ্র সাহা ও অশিত চন্দ্র সাহা (কালী বাবুর ভাতিজা) এবং (ভাতিজা) বীরেন চন্দ্র সাহার ছেলে দেবাশীষ চন্দ্র সাহা। জমিদারী স্ট্রেট প্রায় ৩২০ বিঘা জমির উপর নির্মিত সুবিশাল আকিৃতির নৈপূন্যঘেরা কারুকাজ সম্বলিত একটি বাড়ি রয়েছে। সুবিশাল আকিৃতির বাড়িটিতে ১০৩ টি কক্ষ ছাড়াও বাড়ির পূর্বদিকে ৩য় তলা, উত্তর দিকে প্রথম তলা, দক্ষিণ দিকে ২য় তলা এবং পশ্চিম দিকে একটি বিশাল আকারের কারুকার্য খচিত গেইটসহ ২য় তলা একটি ভবন রয়েছে। বাড়িটির চতুর্দিকেই রয়েছে ইমারত ও কারুকার্যপূর্ণ সুসম্পন্ন দর্শনীয় নির্মানশৈলী। বিশাল ভবনটির প্রতিটি কক্ষেই রয়েছে মোজাইক, টাইলস্ লাগানো ও কারুকার্য খচিত দরজা জানালা। জমিদার বাড়ি ঘিরে পশ্চিমে রয়েছে একটি বিশাল পুকুর, উত্তরে রয়েছে বিশাল আকারে দুর্গা পূজামন্ডপ, অতিথিদের থাকা খাওয়া ঘুমানোর জন্য রয়েছে ৩১টি কক্ষ বিশিষ্ট একটি ভবন। তার পাশেই রয়েছে বালাপুর হাই স্কুল। উত্তরে রয়েছে পুরাকীর্ত্তি বিশিষ্ট অসমাপ্ত একটি কলেজ। বাড়ির সম্মুখেই রয়েছে একটি বিশাল আকারের পুকুর। এর পাশেই রয়েছে শিশু-কিশোরদের খেলাধুলা করার একটি বিশাল মাঠ।

বালাপুর জমিদার বাড়ী

তৎকালীন সময়ে এই জমিদার বাড়িতে বিচারের জন্য জমকালো বৈঠক বসত। সকাল-সন্ধ্যায় জমিদার বাড়িতে শঙ্খ, ঘন্টি, কাশর, করতাল, জয়শীরি, ঢাক-ঢোল, সানাই, কেনেটসহ নানা ধরনের আকর্ষনীয় বাদ্যযন্ত্র বাজাতো। জমিদার বাড়ির রমণীরা দল বেঁধে পুকুরে স্নান শেষে মন্দিরে পূজা অর্চনায় বসতো। আবহমান যুগের ধারাবাহিকতায় আজ সেই মন্দির ধ্বংসযজ্ঞে পরিনত হয়েছে। ঐতিহাসিক জমিদার বাড়ির দৃষ্টি নন্দিত শত-শত বিরল প্রজাতীর বৃক্ষ আজ বিলুপ্তির পথে। অপরিচ্ছন্ন মন্দিরে প্রতিমার স্থান দখল করে ফেলেছে সর্পকুল। বিষাক্ত সাপের ভয়ে কেউই মন্দিরে এবং তার আশপাশে যেতে সাহস পায় না।

বালাপুর জমিদার বাড়ী

বৃটিশ ঔপনেবেশিক শাসন আমলে দেশ বিভাগের পর ১৯৪৭ সালে তৎকালীন বালাপুরের জমিদার বাবু কালীচরন স্ব-পরিবারে ভারতের কলকাতায় চলে যান। ভারতে চলে যাবার পূর্বে জমিদারী স্ট্রেট দেখাশোনার দায়িত্বে নিয়োজিতদেরকে এ বিশাল সম্পত্তি ও জমিদারীর ভিটে তত্ত্বাবধানের জন্য নির্দেশ দিয়ে যান। জমিদারের দীর্ঘ অনুপস্থিতির কারণে তত্ত্বাবধায়কগণ তাদের তৈরি ভুয়া কাগজ-পত্র তৈরি করে যার-যার প্রভাব অনুযায়ী বিশাল এই সম্পত্তি ভোগ দখল করে আসছে।

বালাপুর জমিদার বাড়ী

এ বাড়ি থেকে প্রায় ২ কি.মি. দূরে (ভংগার চর সংলগ্ন) মেঘনা নদীর তীরে জমিদারের প্রতিষ্ঠিত কারুকার্য খচিত এক তলা বিশিষ্ট একটি বিশাল ভবন ছিল, যা মেঘনা নদীতে জমিদার বাড়ির স্টিমার ঘাট হিসেবে ব্যবহ্নত হতো। ভারতের কলকাতা থেকে স্টিমার এসে বণিকরা এখানে মালা-মাল ও পন্য সামগ্রী এই ঘাটে খালাস করতো। জমিদার বাবু স্টিমারে চড়েই তৎকালীন এপার বাংলা এবং ওপার বাংলার সংঙ্গে সওদাগরী-বাণিজ্য করত। রাতের বেলায় জমিদার বাবু ঘোড়া দৌড়িয়ে স্টিমার ঘাটে এসে প্রমোদ বালাদের নিয়ে আনন্দ স্ফূর্তি, ভোগ-বিলাস করতো। কালের সাক্ষী হিসেবে স্টিমার ঘাটটি বর্তমানে মেঘনায় বিলীন হয়ে গেছে। দর্শনীয় জমিদার বাড়ী দেখতে এখনো দূর-দূরান্ত থেকে পর্যটকেরা এসে নয়নাভিরাম দৃশ্য দেখে মুগ্ধ হয়ে সারাবেলা কাটিয়ে দেন। স্বাধীনতার দীর্ঘ ৪১ বছরে বহু সরকার ক্ষমতায় আসছে গেছে কিন্তু ঐতিহ্যবাহী জমিদার বাড়িটি সংস্কার মেরামতে কোন পদক্ষেপ গ্রহন না করায় এলাকাবাসী চরম ক্ষোভ প্রকাশ করে বাড়িটি যাদুঘরে পরিনত করার জন্য সরকারের প্রতি আহবান জানান। বর্তমানে কর্তৃপক্ষের অবহেলায় আজ ভবনটি ধ্বংসের মুখে। দ্রুত সংস্কার-উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহন করা না হলে ঐতিহ্যবাহী বাড়িটির প্রাচীন স্থাপত্য লুটিয়ে পড়বে মাটিতে, হারিয়ে যাবে বালাপুরের জমিদারের ইতিহাস ঐতিহ্য। কর্তৃপক্ষের সু-নজর পেলে এ জমিদার বাড়ি হতে পারে আকর্ষণীয় একটি নান্দনিক পর্যটন কেন্দ্র ।

বালাপুর জমিদার বাড়ী

নরসিংদীর মেঘনার তীরবর্তী সদর উপজেলার পাইকারচর ইউনিয়নের বালাপুরের ঐতিহাসিক জমিদার বাড়িটি সরকারি পৃষ্টপোষকতার অভাবে এখন ঝুকিপূর্ন অবস্থায় রয়েছে। এলাকার সচেতন মহল জানান, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সরকারের সার্বিক তত্বাবধানের অভাবে শত বছরের প্রাচীন কারুপন্য নকশা সন্বলীত ঐতিহাসিক নিদর্শন জমিদার বাড়িটি আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে।

কিভাবে যাবেন :

দেশের যে কোন স্থান থেকে নরসিংদীর মাধবদী বাস স্টপেজে পৌছতে হবে। এখান থেকে বালাপুর যাবার বিভিন্ন মাধ্যম পাবেন। একটি সিএনজি বা অটো রিকশা নিয়ে খুব সহজেই  পৌঁছাতে পারবেন।

Please follow and like us:





উত্তর দিন

Wordpress Social Share Plugin powered by Ultimatelysocial