প্রধান সূচি

নেছারাবাদে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে লাপাত্তা হচ্ছে সমবায় সমিতির মালিকরা

পিরোজপুরের নেছারাবাদে সমবায় সমিতির সাইনবোর্ডে লক্ষাধিক মানুষের আমানত সংগ্রহ করে কোটি টাকা হাতিয়ে লাপাত্তা হয়েছে ৫০টির বেশি সমবায় সমিতি। আমানত হারিয়ে ভুক্তভোগীরা রাজনৈতিক মহল থেকে শুরু করে সর্বশেষ ধারাবাহিকভাবে প্রশাসনের কাছে দারস্থ হচ্ছেন।
পিরোজপুর সমবায় অফিস থেকে নাম মাত্র লাইসেন্স নিয়ে যত্রতত্র সমবায় সমিতির দোকান খুলে মাঠকর্মীদের মাধ্যমে আমানত সংগ্রহ করে টাকা হাতিয়েছে প্রতারকরা। টাকা হাতিয়ে পলাতক অধিকাংশ সমবায় সমিতির মালিকরা অফিসে তালা ঝুলিয়ে উধাও হয়েছে। কেউবা, আবার আমানত হাতিয়ে এলাকার ভিতরেই গা ঢাকা দিয়ে আছেন। গ্রাহকরা টাকা ফেরৎ চাইতে গেলেই নানা অজুহাত দেখিয়ে সময় ক্ষেপন করছেন তারা। ভুক্তভোগীদের মধ্য দিনমজুর নারী, গৃহীনি এবং অবসরপ্রাপ্ত চাকরিজীবির সংখ্যাই বেশি। শেষ জীবনের নিরাপত্তার আশায় সমবায় সমিতিতে আমানত রেখে টাকা ফেরৎ না পেয়ে আত্মহত্যাসহ নি:স্ব হয়েছেন অনেকে। লাপাত্তা হওয়া ওইসব ভুইফোড় সমবায় সমিতির কারনে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে হিমশিম খাচ্ছে এখনো মাঠ পর্যায়ে টিকে থাকা দু’চারটি সমবায় সমিতি। এছাড়াও মাঠে থাকা বেশ কিছু সমবায় সমিতির লেনদেন ঝুকির মধ্য রয়েছে।
উপজেলার মাগুরা গ্রামের মারুফা বেগম নামে এক গৃহীনির সংসারে অভাব অনটন নিত্য সংঙ্গী। সংসারে শত অভাবের মধ্যও তার মেয়ের শরীরে বেধেছে কঠিন রোগ। চিকিৎসা করাতে প্রয়োজন অনেক টাকার। মেয়ের চিকিৎসার জন্য তিনি একটু একটু করে ‘গ্রামীণ সেবা’ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সমিতিতে টাকা জমিয়েছিলেন। টাকা ফেরৎ চাইতে গেলে সমিতির মালিক মো. আল-আমীন শুরু করেন নানা টালবাহানা।
একই অভিযোগ করে ওই সমিতির অপর এক গ্রাহক মোসাম্মৎ জেসমিন বেগম বলেন, তিনি অনেক কষ্ট করে দুই লাখ ৫০ হাজার টাকা জমিয়ে ছিলেন ওই সমিতিতে। সমিতির মালিক আল-আমীন সেই টাকা না দিয়ে এখন গা ঢাকা দিয়েছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ওই সমিতির মালিক আল-আমীন এরকম দেড় সহ¯্রাধিক গ্রাহকের টাকা নিয়ে অফিসে তালা ঝুলিয়ে তিনি এখন এলাকা থেকে লাপাত্তা।
উপজেলা সমবায় অফিস সূত্রে জানা গেছে, নেছারাবাদ উপজেলায় মোট ২৬৪টি নিবন্ধিত সমবায় সমিতি রয়েছে। যার মধ্যে ১০০টি সমবায় সমিতির লাইসেন্স বাতিল করেছেন সমবায় কর্মকর্তা মো. হাসান রকি। বাতিল হওয়া ওই ১০০টি সমবায় সমিতির মধ্যে তাদের খাতা কলমের হিসাবে ১১টি সমবায় সমিতি গ্রাহকদের আমানত নিয়ে লাপাত্তা হয়েছেন। তবে এ সংখ্যা আরও বেশি বলে জানা গেছে।
সদস্যদের জমা দেওয়া সঞ্চয়ের অর্ধশত কোটি টাকা নিয়ে গা-ঢাকা দিয়েছে আস্থা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি এবং আদমকাঠি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির দুই পরিচালক। পেনশন ডিপোজিট স্কিম পদ্ধতিতে ৫/৬ বছরে দ্বিগুণ মুনাফা দেওয়ার লোভ দেখিয়ে হাজার হাজার সদস্যের কাছ থেকে সমিতি দুটি কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে।
উপজেলার গণপতিকাঠি গ্রামের বিশ্বজিত হালদার খোকনের পরিচালিত আস্থা সমবায় সমিতি ১০/১২টি শাখা অফিসের মাধ্যমে সদস্যদের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকার সঞ্চয় সংগ্রহ করে। একইভাবে আদমকাঠি ক্ষুদ্র সমবায় সমিতির পরিচালক নামধারী হরন্ময় মন্ডল, সুব্রত মজুমদার, বিপুল কির্তনীয়া গং ২০/২৫ কোটি টাকা সঞ্চয় সংগ্রহ করে আত্মগোপনে রয়েছে। পরিচালকরা পালিয়ে থাকায় সদস্যরা তাদের সঞ্চিত টাকা উদ্ধার করতে পাগলের মতো ছুটে বেড়াচ্ছেন। সমিতির নিবন্ধন নিয়ে প্রতিষ্ঠিত এনজিওর স্টাইলে সুদের কারবার করা সমিতির বিষয়ে বরাবর নীরব ভূমিকায় থেকেছে নিবন্ধন সংস্থা সমবায় দপ্তর। আস্থা সমিতির ২০/৩০ জন মাঠকর্মীও সদস্যদের ভয়ে পরিবার নিয়ে লাপাত্তা।
সরেজমিন জানা গেছে, সমবায় দপ্তর থেকে নিবন্ধন নিয়ে নেছারাবাদে শতাধিক সমিতি এনজিওর স্টাইলে সুদের ব্যবসার পাশাপাশি বেআইনি পেনশন ডিপোজিট স্কিম (ডিপিএস) পদ্ধতিতে হাজার হাজার মানুষের কাছ থেকে সঞ্চয় সংগ্রহ করে কোটি কোটি টাকার ব্যক্তিগত সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলেন। এসব সমিতি ৫/৬ বছরে দ্বিগুণ মুনাফার লোভ দেখিয়ে মানুষের কাছ থেকে সঞ্চয় সংগ্রহ করে। সমিতির পরিচালকদের প্রধান টার্গেট থাকে অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারীসহ মধ্যবিত্ত পরিবারের নারী সদস্যরা।
সরেজমিনে নিবন্ধন বাতিল ছাড়াও যে কয়েকটি সমিতির কার্যক্রম মাঠে চলমান রয়েছে। তাদের অধিকাংশ সমিতির লেনদেন আশংঙ্কাজনক বলে জানা গেছে। তাদের কারণে মাঠপর্যায়ে হাতে গোনা দু’চারটি সমতির লেনদেন সন্তোসজনক থাকলেও ইমেজ সংকটে তারা।
সেবক হেল্থ এন্ড এডুকেশন সোসাইটির পরিচালক কৃষ্ণ কান্ত দাস বলেন, আমার সমিতির গ্রাহক সংখ্যা প্রায় দুই হাজার। লেনদেন নিয়ে কারো সাথে সমস্যা হয়নি। তবে গত এক বছরে বেশ কিছু সমবায় সমিতি গ্রাহকের কোটি কোটি টাকা নিয়ে লাপাত্তা হয়েছে। এ কারণে সমিতি পরিচালনায় আমার একটু খারাপ সময় যাচ্ছে। অন্যান্য সমিতির গ্রাহকরা আমানত হারানোর কারণে আমার সমিতির গ্রাহকরাও ভয়ে রয়েছে। এ কারণে প্রতিনিয়ত ৫ থেকে ৭ জন গ্রাহক আমানত উঠিয়ে নিচ্ছেন। তবে কারো সাথে কোন সমস্যা হয়নি।
উপজেলা সমবায় কর্মকর্তা মো. হাসান রকি জানান, আমি নেছারাবাদ উপজেলায় নতুন এসেছি। উপজেলায় যে কয়টা সমিতি আছে সবগুলো সমিতি আমি মনিটারিং করেছি। যে সকল সমিতি নিয়মকানুন মানছে না তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহন করতেছি। যারা আইন মানছে না তাদের আইনি প্রক্রিয়া চলমান।

Please follow and like us:





উত্তর দিন

Wordpress Social Share Plugin powered by Ultimatelysocial