প্রধান সূচি

আছে কুপিবাতি, রেডিও ও ব্যাটারির টর্চ লাইট

হারিকেনের আলোয় চা বিক্রি করছেন হালিম মিয়া

বিদ্যুতের সহজলভ্যতা আর আধুনিকতার ছোয়ায় হারিয়ে গেছে গ্রামীন জীবন মানের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত অনেক জিনিসপত্র। নব্বই দশকে যে জিনিসগুলো না হলে গ্রামীন মানুষের জীবনমান ছিল খুবই কঠিন। একবিংশ শতাব্দীতে এসে সেসব জিনিস এখন কালের গর্ভে বিলীন। অপরদিকে এই একবিংশ শতাব্দিতেই অনেকটা ইচ্ছে করেই সেসব জিনিস আকড়ে ধরে জীবন জাপন করছেন আব্দুল হালিম নামে এক ষাটোর্ধ্ব চা দোকানি। তার দোকানে আছে কুপিবাতি, হারিকেন, ব্যাটারির টর্চ লাইট এবং রেডিও।
রাতের বেলায় হারিকেন আর কুপিবাতির টিপ টিপ আলোতে লাকড়ির চুলোয় বিক্রি করছেন চা পান ও সিগারেট। সারাদিন এক গেয়েমি দোকানধারি করতে করতে জীবনটা যখন হয়ে যাচ্ছে পানসে। ঠিক তখনি মন মেজাজ ফুরফুরে রাখতে বাজাচ্ছেন রেডিও। শুনছেন ভাটিয়ালি, ভাওইয়া গান। প্রতিনিয়ত শুনছেন খবর, দুর্বার অনুষ্ঠানসহ রেডিওর নানা প্রোগ্রাম।
প্রকৃতিতে দিনের আলো ফুরিয়ে সন্ধ্যা নেমে আধার আসে। সেই আধার দূর করতে সন্ধ্যার সাথে সাথে হারিকেনের কাচের চিমনি পরিস্কার করে তিনি কেরোসিন তেলে জ্বালান সেই হারিকেন, কুপিবাতি। আর এটা তিনি করছেন প্রতিদিনই। রাতে চারপাশে বিদ্যুতের আলোতে হয়তো অনেকের চোখে পড়তে না পারে হালিম মিয়ার চায়ের দোকান। তবে কোন কারণে রাতে বিদ্যুৎ চলে গেলে দূর থেকে যে কারো চোখে পড়বে তার দোকান। কুপি বাতি আর হারিকেনের আলোয় ঘণিভূত অন্ধকারে এক টুকরো আলোর মধ্যে ফুটে উঠে হালিমের চায়ের দোকান।
বর্তমানে এই শীতে চাদর মুড়ি দিয়ে শীতল শরীরকে একঠু উষ্ণ পরশ নিতে অনেকেই আসেন তার দোকানে। উদ্দেশ্য তার লাকড়ির চুলোর আগুনে ফুটানো একটু চায়ে চুমুক দেয়া। চা শেষে কেউ খেয়ে থাকেন পান কেউবা আবার দিচ্ছেন বিড়ির টান।
এভাবেই সেই নব্বই দশকের জীবনমানকে স্বেচ্ছায় আগলে ধরে পিরোজপুরের নেছারাবাদ (স্বরূপকাঠী) উপজেলার স্বরূপকাঠি পৌর শহরের ২নং ওয়ার্ডের ব্র্যাক অফিস সম্মুখে চা বিক্রি করছেন হালিম মিয়া।
ভিন্নমাত্রার এই হালিম মিয়ার দোকানের বেচা বিক্রিও একটু ব্যাতিক্রম। তার দোকানে এসে অনেকে নিজের মত করে চা বানিয়ে খাচ্ছেন। চা খাওয়া শেষে কারো পান খেতে ইচ্ছে করলে নিজ হাতেই পান খেতে হয় বানিয়ে। প্রতিদিন ফজর নামাজ শেষ করে কাক ডাকা ভোরে দোকান খুলেন তিনি। বেলা বাড়ার সাথে সাথে দুপুরে চলে যান বাসায়। গোসল খাওয়া ধাওয়া শেষে চলে আসেন দোকানে। তারপর একনাগাড়ে রাত এগারটা পর্যন্ত চলে তার দোকান।


এই আধুনিক যুগে এসে নব্বই দশকের সেই ভিন্নমাত্রার জীবন যাপনে কেমন লাগে তার। জানতে চাইলে হালিম মিয়ার বলেন, এখন আর গ্রামের কোন ঘরে রেডিও, হারিকেন, কুপিবাতি ব্যাটারির টর্চ লাইট খুঁজে পাবেন না। কারও ঘরে এর একটা দুইটা থাকলেও নষ্ট হয়ে ময়লার স্তুপ পড়েছে। অথচ সে আমলের জিনিসগুলো আমি এখনো ব্যবহার করছি। এগুলো আমার খুব ভাল লাগে। আমি সকালে দোকানে আসি আর দুপুরের খাওয়ার জন্য একটু সময়ের জন্য বাসায় যাই। রাতে বাসায় ফিরে খাবার খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ি। টিভি, বৈদ্যতিক আলো কিছুই লাগেনা আমার।
তিনি বলেন, চল্লিশ বছর ধরে দোকানধারি করছি। একসময় গ্রামে বিদ্যুৎ ছিলনা। ছিল না টিভি, চার্জার লাইট। তখন চলতে অসুবিধা হয়নি। এখন বৈজ্ঞানিক উৎকর্ষতায় সব পাল্টে গেছে। আমার নিজের ঘরে প্রযুক্তি ছোয়া আছে। বিজ্ঞানের আধুনিকতার ছোয়া আমার দোকানে নেই। এখানে আসলে দেখতে পারবেন সেই আশি নব্বই দশকের মানুষের দরকারি জিনিসগুলো। যেগুলো এখনো আমি সানন্দে ব্যবহার করছি।

Please follow and like us:





উত্তর দিন

Wordpress Social Share Plugin powered by Ultimatelysocial