ঘটনাস্থল : পিরোজপুরের নাজিরপুর
নামজারীতে ঘুষ নেওয়ার নির্দেশনা এসিল্যান্ডের !
‘প্রতিটি নামজারী কেসের জন্য আমাকে ৪ হাজার টাকা করে দিবেন, আর আপনারা নিবেন ২ হাজার টাকা, মোট ৬ টাকা করে নিবেন। তবে ৬ হাজার টাকার উপরে যেন না নেয়া হয়। ‘খ’ তফসিলের নামজারী কেসের জন্য আমাকে প্রতিটি কেসের জন্য ১০ হাজার টাকা করে দিবেন আর আপনারা ৫ হাজার টাকা করে নিবেন, মোট ১৫ হাজার টাকা করে নিবেন।’
ভূমির নামজারী (মিউটেশন) করাতে এভাবেই ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তাদের (তহসিলদার) ঘুষের টাকা নেওয়ার জন্য নির্দেশনা দিয়েছেন পিরোজপুরের নাজিরপুর উপজেলার সহকারী কমিশনার-ভূমি (এসিল্যান্ড) মো. মাসুদুর রহমান। তার আর এ নির্দেশনা ও ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তাদের কথোপকথনের একটি অডিও ভাইরাল হয়েছে।
সম্প্রতি উপজেলার ইউনিয়ন ভূমি অফিসের ভূমি সহকারী কর্মকর্তাদের নিয়ে সহকারী কমিশনার (ভূমি) এর কার্যালয়ে এক বৈঠকে তিনি এ নির্দেশনা দেন।
ভাইরাল হওয়া অডিও-তে শোনা যায়, নাজিরপুর উপজেলার সহকারী কমিশনার-ভূমি (এসিল্যান্ড) মো. মাসুদুর রহমান ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তাদেন বলতে বলেন যে- ‘আপনারা যে পার কেসে ডিলিংস করেন তা এনসিওর করার কোন ওয়ে আছে ? খোলামেলা কথা বলার জন্য তিনি বলেন, আপনাদের মতামত শুনি যে আপনারা কি চচ্ছেন।’
এসময় বৈঠকে উপস্থিত মাটিভাংগা ইউনিয়নের ভূমি সহকারী কর্মকর্তা মো. সুজন বলেন, ‘২ একরের বেশি জমি হলে তখন আমরা কত নিবো? শ্রীরামকাঠী ইউনিয়নের ভূমি সহকারী কর্মকর্তা পরিমল চন্দ্র বলেন- এটা স্যারের উপর নির্ভর করে আপনি যেভাবে বলবেন সেভাবে আমরা নিবো। সাতকাছিমা ভূমি সহকারী কর্মকর্তা শাহজাহান কবির বলেন- সকল কেসে (১ একর, ২ একর বা ৩ একর বা তার চেয়েও বেশি জমির ক্ষেত্রে) সমান হওয়া উচিৎ যেমন ৫ হাজার টাকা ছিল সেখানে আপনি বললে ৪ হাজার টাকায় নামাইয়া আনতে পারি, আপনি যেভাবে বলবেন স্যার।’
এসময় সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. মাসুদুর রহমান বলেন, ‘ধরেন আমি ৪ হাজার টাকা নির্ধারণ করে দিলাম, আপনারা কত ড্রিল করবেন।’
এ বিষয়ে মাটিভাংগা ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা (তহসিলদার) মো. সুজন বলেন, এখানে যদি ৪ হাজার টাকা দেওয়া যায় তাহলে মোট ৫ হাজার ৫০০ টাকা হলে হয়, আমরা সর্বোচ্চ হাজার টাকার বেশী নিবো না। সাতকাছিমা ইউনিয়নের শাহজাহান কবির বলেন, এখানে ৪ হাজার টাকা, মোট ৬ হাজার টাকা হলে হয়।’
তখন সহকারী কমিশনার (ভূমি) বলেন, ‘এ অর্থ বছরের জন্য প্রতিটি নামজারী কেসের জন্য আমাকে ৪ হাজার টাকা করে দিবেন আর আপনারা ২ হাজার টাকা মোট ৬ হাজার টাকা নিবেন।’
এরপর আবার তাকে বলতে শোনা যায়, ‘একচ্যুয়ালি আপনার কয় টাকা নিতে চান বলেন এবং সে তার দিক থেকে প্রস্তাব করেন আমাকে ৪ হাজার টাকা করে দেন, আপনারা ১ হাজার ৫০০ টাকা মোট ৫ হাজার ৫০০ শত টাকা করে নেন। তখন সেখমাটিয়া ইউনিয়নের ভূমি সহকারী কর্মকর্তা মো. হাসন হাওলাদার ও দেউলবাড়ী দোবরা ইউনিয়নের ভূমি সহকারী কর্মকর্তা মিজানুর রহমান ও দীর্ঘা ইউনিয়নের ভূমি সহকারী কর্মকর্তা এজেডএম জাকির হোসেন বলেন- স্যার এটা ৬ হাজার করা হোক।’
উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) তখন প্রতিটি নামজারীর জন্য চুড়ান্ত করে নির্দেশনা দেন এবং বলেন ৬ হাজার টাকার উপরে যেন না নেওয়া হয়। এ সময় তিনি আরও বলেন- ‘খ’ তফসিলের নামজারী কেসের জন্য আমাকে প্রতিটি কেসের জন্য ১০ হাজার টাকা করে দিবেন, আর আপনারা ৫ হাজার টাকা করে নিবেন, মোট ১৫ হাজার টাকা নিবেন।
জানা যায়, নামজারি (মিউটেশন) করতে সরকার নির্ধারিত ফি হচ্ছে ১ হাজার ১৭০ টাকা। এর মধ্যে নামজারির আবেদনের ফি ২০ টাকা, নোটিশ জারি ফি ৫০ টাকা, রেকর্ড সংশোধন বা হালনাগাদ করণ ফি ১ হাজার টাকা ও প্রতি কপি নামজারী খতিয়ান সরবরাহ বাবদ ১০০ টাকা। অথচ সেখানে নামজারীর করার জন্য সাধারণ মানুষের কাছ থেকে ৬ হাজার টাকা করে নেওয়ার জন্য অধিনস্ত ইউনিয়ন ভূমি অফিসের কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দিয়েছেন নাজিরপুর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. মাসুদুর রহমান। বিষয়টি এলাকায় তোলপাড় চলছে। তবে নামজারীর ক্ষেত্রে অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করছেন বৈঠকে উপস্থিত থাকা ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তারা।
এ বিষয়ে সাতকাছিমা ভূমি সহকারী কর্মকর্তা শাহজাহান কবির বলেন, ‘স্যারের সাথে প্রতি মাসেই সভা হয়। তবে তিনি নামজারীতে টাকা নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়ার কথা স্মরণ পড়ছে না। অডিওতে তার কন্ঠের কথা শোনা যাওয়ার কথা বললে তিনি বলেন, বিষয়টি আমি মনে করতে পারছি না।
শ্রীরামকাঠী ইউনিয়নের ভূমি সহকারী কর্মকর্তা পরিমল চন্দ্র বলেন, ‘আমি ওদিন উপস্থিত ছিলাম না।’
অডিও এর বিষয়ে নাজিরপুর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. মাসুদুর রহমান বলেন, ‘আমি উপজেলায় নতুন যোগদান করেছি। উপজেলার খাস জমি উদ্ধার নিয়ে অনেক কাজ করায় কিছু কিছু মহলের রোষানলে পড়তে হয়েছে। তারাই আমার বিরুদ্ধে নানা ষড়যন্ত্র করছে। অডিওটি কিভাবে হলো আমি তা জানি না।’
অডিও এর কন্ঠ তার কিনা প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, তিনি তা এড়িয়ে গিয়ে বলেন, বিষয়টি দু:খজনক। আমি একটা পরীক্ষার জন্য বর্তমানে ঢাকায় অবস্থান করছি। কর্মস্থলে এসে খোঁজ খবর নিয়ে জানানো যাবে।’
ঘটনার বিষয়ে নাজিরপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার ডা. সঞ্জীব কুমার দাস জানান, গত ১৬ সেপ্টেম্বর অডিও এর বিষয়টি অমি অবগত হই। সাথে সাথে বিষয়টি উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে এবং উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি)কে আমি শোকজ করেছি।
পিরোজপু জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহেদুর রহমান জানান, অডিও এর বিষয়টি তদন্তের জন্য জেলা স্থানীয় সরকার বিভাগের উপ-পরিচালক মো. সেলিম হোসেনকে প্রধান করে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। মঙ্গলবার থেকে কমিটি কাজ শুরু করবে। খুই অল্প সময়ের মধ্যে তদন্ত কাজ শেষ করে সে অনুযায়ী যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
