কোভিড-১৯ পরবর্তি প্রাথমিক শিক্ষা এবং আমাদের করণীয়
বাংলাদেশে কোভিড-১৯ রোগী প্রথম শনাক্ত হয় ০৮ মার্চ, ২০২০ সালে। ২৭ মার্চ, ২০২০ হতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহ বন্ধ ঘোষণা করা হয় পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত। কোভিড-১৯ এর মতো এক মহাপ্রলয়ের সঙ্গে সংগ্রাম করে টিকে থাকার যুদ্ধে সংযুক্ত হয় আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি। মধ্যবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্ত এবং দরিদ্র পরিবারের শিশুরা শিক্ষা ব্যবস্থাপনা নিয়ে এক গভীর সংকটে পড়ে যায়।
দীর্ঘ ১৮ মাস পর গত বছরের সেপ্টেম্বরে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলে দেয়া হয়েছিল। কিন্তু নতুন করে করোনা সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় গত জানুয়ারিতে আবার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছুটি ঘোষণা করে সরকার, যা ২১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ছিল। কিন্তু দীর্ঘ এই বন্ধের ফলে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার ওপর মারাত্মক ক্ষতি হয়েছে। আজ প্রাথমিক শিক্ষা ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে আরও গভীরে ভাববার যেন সময় এসেছে। কেননা আর্থ-সামজিক উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তিই হলো শিক্ষা। আর প্রাথমিক শিক্ষা হলো তার ভিত। ভিত মজবুত না হলে যেমন কোনো ইমরাত দাঁড়াতে পারে না তেমনি প্রাথমিক শিক্ষা যথাযথভাবে না পেলে কোনো শিশু সুনাগরিক হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলতে পারবে না। এর গুরুত্ব উপলব্ধি করতে ১৯৭৩ সালে যুদ্ধ বিধ্বস্ত বাংলাদেশের কঠিন সময়েও বাঙালি জাতির স্বপ্নদ্রষ্টা, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একসঙ্গে ৩৭ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়কে সরকারিকরণ করেন। তাঁর মৃত্যুর পর অনেক দিন বাংলাদেশে প্রাথমিক শিক্ষার উল্লেখযোগ্য পৃষ্ঠপোষকতা চোখে পড়েনি। ২১ বছর পরে তাঁরই সুযোগ্যকন্যা দেশরত্ন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতায় এসে প্রাথমিক শিক্ষার উন্নয়ন এবং আধুনিককরণে বাস্তবমুখী বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। মূলত তখন থেকেই চিরাচরিত ভগ্ন রূপ থেকে একটু একটু বেরিয়ে আসতে থাকে প্রত্যন্ত এলাকার প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৩ সালে বঙ্গবন্ধুকন্যা একসঙ্গে ২৬ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়কে (দ্বিতীয়বারের মতো) জাতীয়করণ করেন, যা ছিল ২৬ হাজার বিদ্যালয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবার প্রাণের দাবি এবং আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
বাংলাদেশের সংবিধানে শিক্ষাকে মৌলিক অধিকারের স্বীকৃতি আছে। প্রাথমিক শিক্ষা সাধারণত আনুষ্ঠানিক শিক্ষার প্রথম পর্যায়, এ শিক্ষা আসে প্রাক-প্রাথমিকের পরে এবং মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের আগে। সবার জন্য শিক্ষার কথা বলা হয়েছে সংবিধানে ১৫(ক) অনুচ্ছেদে। অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষা ১৭নং অনুচ্ছেদ। ব্রিটিশ-উত্তর পাকিস্তানে ১৯৫১ সালে পূর্ব বাংলা প্রাদেশিক পরিষদে পরবর্তী ১০ বছরের মধ্যে বাধ্যতামূলক অবৈতনিক প্রাথমিক শিক্ষা প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। ১৯৭৪ সালে কুদরত-এ-খুদা প্রণীত ও বাংলাদেশ শিক্ষা কমিশন ১৯৮৩ সালের মধ্যে প্রথম শ্রেণি থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষাকে সবর্জনীন, বাধ্যতামূলক ও অবৈতনিক প্রাথমিক শিক্ষার সুপারিশ করে। জাতিসংঘ সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় ২০১৫ সালের মধ্যে প্রাথমিক শিক্ষায় লিঙ্গ বৈষম্যের অবসান ঘটানোর জন্য সব দেশ একমত হয়। সবাই এ বিষয়ে একমত হবে যে প্রাথমিক শিক্ষা হবে সবর্জনীন, বাধ্যতামূলক, অবৈতনিক এবং সবার জন্য একই মানের সেখানে প্রাথমিক শিক্ষার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্বন্ধে বলা হয়: কয়েকটি মৌলিক বিষয়ে এক ও অভিন্ন শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যসূচি সব ধরনের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঠদান বাধ্যতামূলক করা; মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্দীপ্ত করার মাধ্যমে শিক্ষার্থীর দেশাত্মবোধের বিকাশ ও দেশ গঠনমূলক কাজে উদ্বুদ্ধ করা; শিশুর মনে ন্যায়বোধ, কর্তব্যবোধ,শৃঙ্খলা, শিষ্টাচার, অসাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি, মানবাধিকার, কৌতূহল, প্রীতি, সৌহার্দ্য, অধ্যবসায় ইত্যাদি নৈতিক ও আত্মিক গুণাবলি অর্জনে সহায়তা করা; বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিমনস্ক করা এবং কুসংস্কারমুক্ত মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে উৎসাহিত করা; শিক্ষার্থীকে জীবনযাপনের জন্য আবশ্যকীয় জ্ঞান, বিষয়ভিত্তিক দক্ষতা, জীবন-দক্ষতা, দৃষ্টিভঙ্গি, মূল্যবোধ, সামাজিক সচেতনতা অর্জন এবং পরবর্তী স্তরের শিক্ষা লাভের উপযোগী করে গড়ে তোলা; কায়িকশ্রমের প্রতি আগ্রহ ও মর্যাদাবোধ এবং বৃত্তিমূলক শিক্ষা সম্বন্ধে প্রাথমিক ধারণা সৃষ্টি; আদিবাসীসহ সব ক্ষুদ্র জাতিসত্তার স্ব স্ব মাতৃভাষায় শিক্ষার ব্যবস্থা করা; সব ধরনের প্রতিবন্ধীসহ সুযোগ-সুবিধাবঞ্চিত ছেলেমেয়েদের জন্য সমান সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
দেশে করোনাকালে যেসব খাতের ওপর সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে, তার মধ্যে একটি হলো শিক্ষা। করোনা সংক্রমণ শুরুর দুই বছর পর এখন সেই চিত্র উঠে আসছে। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরের করা ২০২১ সালের বার্ষিক প্রাথমিক বিদ্যালয় শুমারিতে (এপিএসসি) এসব তথ্য উঠে এসেছে। গত মার্চে এই শুমারি প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে। অনেকেই আশঙ্কা করেছিলেন, করোনা পরিস্থিতির কারণে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী ঝরে যেতে পারে। কিন্তু শুমারিতে দেখা গেছে, এবার ঝরে পড়ার হার এক লাফে ৩ শতাংশ কমেছে। ঝরে পড়ার হার এখন ১৪ দশমিক ১৫ শতাংশ, যা ২০২০ সালে ছিল ১৭ দশমিক ২০ শতাংশ। করোনার সংক্রমণ পরিস্থিতির কারণে গত দুই বছর প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা এবং বার্ষিক পরীক্ষা হয়নি। অ্যাসাইনমেন্টের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করে সব শিক্ষার্থীকে ওপরের শ্রেণিতে ওঠানোর সুযোগ দেয়া হয়। বর্তমানে দেশে প্রাথমিক বিদ্যালয়সমূহে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১,৬৯,৫৭,৮৯৪ জন। শিক্ষার উন্নয়নের কথা বলতেই কথা আসে আমাদের শিক্ষকদের বিষয়ে। আমাদের দেশে প্রাথমিক স্তরে শিক্ষকের সংখ্যা প্রায় চার লাখের মতো। তাদের বেশিরভাগেরই স্নাতক ডিগ্রি রয়েছে। আমরা প্রাথমিক স্তরে সার্টিফিকেটধারী শিক্ষক পাচ্ছি কিন্তু তারা পাঠদানে যোগ্যতাসম্পন্ন বা পেডাগজিতে (শিশুদের পাঠদান পদ্ধতির বিজ্ঞান) দক্ষ নয়। এক সমীক্ষায় দেখা যায়, অনেক শিক্ষক এখনও শিক্ষার্থীদের জন্য সৃজনশীল প্রশ্ন প্রস্তুত করতে পারেন না। যোগ্যতাভিত্তিক শিক্ষাক্রমের বাস্তবায়ন তাহলে কীভাবে তারা করবে সে বিষয়ে যথেষ্ট সংশয় আছে। শিক্ষার্থীদের উন্নত ও আনন্দময় শিখন নিশ্চিতকল্পে সরকার ডিজিটাল কনটেন্টের মাধ্যমে পাঠদানের ব্যবস্থা করেছে। কিন্তু ডিজিটাল মাধ্যমে পাঠদান করার অনুষঙ্গ ল্যাপটপের অপ্রতুলতা লক্ষ করা যায়। একসঙ্গে সব শ্রেণিতে ডিজিটাল পাঠদান নিশ্চিত করা এখনও সম্ভব হয়নি। অনেক সময় বিদ্যালয় পরিদর্শন করে দেখা যায়, শিক্ষকরা সঠিকভাবে শিখনফল অর্জন করানো এবং ডিজিটাল পাঠদানের জন্য পেডাগজি ও আইসিটির ইন্টিগ্রেশন বা সমন্বয় ঘটানোতে ব্যর্থ হচ্ছে। এসব কারণে শিক্ষার্থীরা কোচিং ও হাউস টিউটরদের দ্বারস্থ হচ্ছে। আগে শিক্ষকদের প্রতি শিক্ষার্থীদের প্রগাঢ় সম্মান ও শ্রদ্ধা ছিল, শিক্ষকরাও শিক্ষার্থীদের অনুরূপ স্নেহ-আদর দিত যা এখন আর তেমন দেখা যায় না। উপযুক্ত আলোচনায় শিক্ষকগণের দায়বিষয়ক সমসাময়িক চিন্তাকে কেন্দ্র করে প্রাথমিক স্তরের শিক্ষা ও শিক্ষণের জন্য শিক্ষকগণের আশুকরণীয় রয়েছে বলে মনে হয়।
অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ প্রায়ই বলেন, শিশুরা হলো ফুলবাগানের মতো, ভালোভাবে যত্ন নিলে এরা প্রস্ফুটিত হবেই। সুতরাং শিক্ষার্থীর শিখন চাহিদা, বয়স ও মনস্তত্ব বিবেচনা করে তাদের পাঠদানে জড়িত করে তাদের প্রশ্ন করার জন্য মুক্ত ও নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করতে হবে। শিক্ষকদের আধুনিক বিশ্বে চলমান বিভিন্ন শিক্ষাবিষয়ক ধারণা, তত্ত্ব ও তথ্য সম্পর্কে ওয়াকিবহাল থাকতে হবে ও বৈদেশিক প্রশিক্ষণ প্রাপ্তির সুযোগের ব্যবস্থা করতে হবে। শিক্ষার্থীদের শুধু চাকরি নয়, বরং ভালো লেখক, ফটোগ্রাফার, ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা, বক্তা, অভিনেতা, খেলোয়াড়, রাজনীতিবিদ, গবেষক ইত্যাদি হয়েও সমাজে খ্যাতি লাভ করা সম্ভব এটি বোঝাতে হবে।
প্রকৃতপক্ষে শিক্ষা হতে হবে জীবনব্যাপী এবং চলমান। জাতিসংঘের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান ইউনেস্কো এক গবেষণায় জানিয়েছে, শিশুদের বিকাশের জন্য জানতে শেখা, করতে শেখা, মিলেমিশে থাকতে শেখা দরকারি। বিদ্যালয়ে একজন শিশু উক্ত বিষয়াদি সম্পর্কে ধারণা লাভ করবে এটিই প্রত্যাশা। প্রাথমিক শিক্ষার ভিতকে মজবুত না করে মাধ্যমিক বা উচ্চশিক্ষায় শিক্ষার্থীদের উন্নত করে কোনোভাবেই যোগ্য মানবসম্পদ তথা মানব পুঁজি তৈরি করা সম্ভব নয়। সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট গোল (এসডিজি) লক্ষ্যমাত্রা ০৪ (চার) -এ বিধৃত গুণগত শিক্ষা নিশ্চিত করতে যোগ্য শিক্ষক প্রস্তুত করার পাশাপাশি তাদের যথাযথ মর্যাদা দিয়ে সমাজে স্থান দেয়া দরকার যাতে শিক্ষকগণ সম্মানের সঙ্গে সামাজিক স্বীকৃতি নিয়ে বাঁচতে পারে। শিক্ষক প্রশিক্ষণের মান আরও বাড়ানো উচিত। সম্প্রতি ইউনেস্কোর এশিয়া প্যাসিফিক রিজিওনাল ব্যুরো ফর এডুকেশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষকের অভাবেই বাংলাদেশে শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। প্রশিক্ষিত শিক্ষকের হার নেপালে ৯০ শতাংশ, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কায় ৮২ শতাংশ, মালদ্বীপে ৭৮ শতাংশ, মিয়ানমারে ১০০ শতাংশ। এর সঙ্গে শিক্ষকদের যেমন পেশার প্রতি আগ্রহ, নীতি-নৈতিকতা ও কমিটমেন্টের প্রশ্ন জড়িত, তেমনি যথাযথ কর্তৃপক্ষে প্রকাশ পাচ্ছে। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরের তথ্যমতে, দেশে ২৪ ধরনের প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে। এর সংখ্যা এক লাখেরও বেশি। এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক আছেন পৌনে পাঁচ লাখ। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ছাড়াও বিভিন্ন ধরনের এনজিও পরিচালিত স্কুল, বেসরকারি স্কুল ও কিন্ডারগার্টেন রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে প্রায় এক কোটি পঁচানব্বই লাখ চুরাশি হাজার শিশু পড়ালেখা করে। চাই এসব ধরনের প্রতিষ্ঠানের সুষ্ঠু সমন্বয়। আবার শিক্ষার মান্নোয়নকে একটি ৩ চাকা বিশিষ্ট বাহনের সঙ্গে তুলনা করা যায়। বাহনের সঙ্গে তুলনা করা যায়। একটি চাকা অভিভাবক এবং শিক্ষক। আমাদের শিক্ষকগণ শিক্ষার্থীদের নিয়ে প্রায় ৬ থেকে ৮ ঘন্টা প্রতিদিন কাজ করেন। তারা পাঠ্যপুস্তকের বাইরেও বিভিন্ন ধরনের সমসাময়িক বিষয় এবং দেশের স্বাধীনতা, সরকার, বিশ্ব পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করে থাকেন। পাশাপাশি মানুষের প্রতি মানুষের দায়িত্ব কর্তব্য বোধ, সামাজিক শৃঙ্খলসহ জীবনযাপনের নানাবিধ প্রয়োজনীয় বিষয়ে বিদ্যালয়ের সম্মানিত শিক্ষকবৃন্দ সব সময়ই আমাদের কোমলমতি শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় শিক্ষা প্রদান করে থাকেন। কাজেই একই সঙ্গে এ তিনটি বিষয়ের কাঙ্খিত সমন্বয় প্রয়োজন।
ঘুমিয়ে আছে শিশুর পিতা সব শিশুরই অন্তরে। আমাদের আজকের শিশুরাই আগামী দিনে জাতির পিতার কাঙ্খিত সেই সোনার বাংলা আর মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর উন্নত বাংলাদেশের ধারক ও বাহক হবে। কাজেই এসব কোমলমতি শিক্ষার্থীর মানবিক, মানসিক এবং বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার মাধ্যমে সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। রূপকল্প ২০২১ বা জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য জনসম্পদ উন্নয়নের কোনো বিকল্প নেই। সুনাগরিক সৃষ্টিতে এবং প্রগতিশীল সমাজ বিনির্মাণে সব শিশুর মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা এবং একই সঙ্গে তাদের উচ্চতর শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়ন নিশ্চত করা একান্ত জরুরি। শিশুর সার্বিক বিকাশের বড় অংশ নির্ভর করে বিদ্যালয়ের আনন্দঘন পরিবেশ, শিক্ষকের দক্ষতা ও শিখন শেখানো কার্যক্রমের ওপর। এ ক্ষেত্রে শিক্ষকের আন্তরিকতা, শিক্ষার্থীর শারীরিক-মানসিক সুস্থতার প্রতি লক্ষ রাখার বিষয়টিও অতীব গুরুত্বপূর্ণ। প্রাথমিক শিক্ষার বিস্তরণ নিঃসন্দেহে আগের চেয়ে অনেকগুণ বেড়েছে। মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিতকরণে উচিত একবারেই তৃণমূলের সমস্যাগুলোকে আমলে নিয়ে বাস্তবভিত্তিক বিভিন্ন কার্যক্রম হাতে নেয়া কার্যক্রমে সাফল্যের হার সন্তোষজনক হলেও বর্তমান সময়ের মূল চ্যালেঞ্জ শিক্ষার মান নিশ্চিত করা। করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব পরবর্তী মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিতকরণে বর্তমান সময়ে নেয়া কার্যক্রমগুলোর মধ্যে উল্লেখ্যযোগ্য হলো, শিক্ষার বাজেট বাড়ানো, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নির্মাণ, উপবৃত্তি চালু, মিড-ডে মিল, অবকাঠামো উন্নয়ন, আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থা চালুকরণে সব বিদ্যালয়ে মাল্টি মিডিয়া, প্রজেক্টের ও ল্যাপটপ বিতরণ। ১ জানুয়ারি বই বিতরণ উৎসবের মাধ্যমে একযোগে সমগ্র বাংলাদেশে শিক্ষার্থীদের মধ্যে নতুন পাঠ্যপুস্তক সরবরাহ, বিদ্যালয়বিহীন গ্রামে বিদ্যালয় স্থাপন। শিক্ষকদের দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিভিন্ন ধরণের প্রশিক্ষণ আয়োজন। স্লিপ কার্যক্রমের মাধ্যমে বিদ্যালয়ের পরিবেশকে আকর্ষণীয় করে শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়মুখী করা।
সরকারি বিভিন্ন উদ্যোগের পাশাপাশি প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে আমাদের সবাইকে আরও আন্তরিক, দায়িত্বশীল ও যত্নশীল হওয়া প্রয়োজন। যদিও এরইমধ্যে মুজিববর্ষ উদ্যাপন উপলক্ষে প্রতিটি বিদ্যালয়েরই শ্রেণী কার্যক্রমে গতিশীলতা ফিরে এসেছে বিভিন্ন কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণের মধ্য দিয়ে যেমন- গল্পের বই পড়া উৎসব, রিডিং উৎসব, দেয়াল পত্রিকা, সুন্দর হাতের লেখার জন্য নিয়মিত অনুশীলন প্রভৃতি।
মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিতকরণে প্রয়োজন সবার সম্মিলিত উদ্যোগ-সমন্বিত প্রয়াস। অর্থাৎ আমরা যা পেয়েছি তা আমাদের প্রেরণা যা পাইনি তা অর্জন করতে হবে। এই হোক কোভিড-১৯ পরবর্তী প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে আমাদের একমাত্র করণীয়।
লেখক: উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, কাউখালী, পিরোজপুর
