প্রধান সূচি

স্বরূপকাঠীতে মশারি শিল্পে ভাগ্য উন্নয়নের চেষ্টা

পিরোজপুরের নেছারাবাদ (স্বরূপকাঠী) উপজেলার মশারি শিল্পে স্বপ্ন দেখছে ২০ গ্রামের মানুষ। উপজেলার সুটিয়াকাঠী ইউনিয়নের একটি মহল্লাতেই গড়ে উঠেছে মশারী তৈরীর অর্ধ শতাধিক কারখানা। ওই গ্রামের নারী পুরুষ সবাই মিলে বৈদ্যুতিক মেশিন ও পা চালিত সেলাই মেশিন নিয়ে যে যার ঘরেই খুলে বসেছেন মশারি তৈরীর কারখানা। রাজধানীর গাউসিয়া থেকে গজ হিসেবে নেট কাপড় কিনে এনে তারা এ কর্মযজ্ঞ চালিয়ে টিকে আছেন প্রায় ৫০ বছর ধরে। ওই গ্রামের প্রত্যেক পরিবারেই নারী পুরুষের পাশাপাশি দরিদ্র ঘরের শিক্ষার্থীরাও লেখাপড়ার ফাকে ফাকে মশারি সেলাই করে রোজকার করছে। কোন ঘরের ভিতরে না ঢুকলে কেউ বিশ্বাসই করতে চাইবেনা যে, গ্রামের ছায়াঘেরা বাড়িগুলোতে এত মশারি তৈরি হচ্ছে। বাড়ির বাইরে থেকে বোঝার উপায় নেই কি কর্মযজ্ঞ চলছে বাড়িগুলোর মধ্যে। এসব বাড়িতে প্রবেশ করলে চোখে পড়ে বাড়ির পুরুষ এবং মহিলারা একত্রিত হয়ে কারিগর নিয়ে তৈরি করছেন মশারি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে উপজেলার কেবল সুটিয়াকাঠী ইউনিয়নের একটি মহল্লাসহ আশপাশের কৌরিখাড়া, নান্দুহার, ইন্দেরহাট, মিয়ারহাট, সোহাগদল, বিন্না, জিলবাড়ি, চামি, ডুবি, উড়িবুনিয়া ও বলদিয়া ইউনিয়নের পঞ্চবেকিসহ নেছারাবাদ উপজেলার ৩৭টি গ্রামে দুই শতাধিক মশারি তৈরির ছোট বড় কারখানা রয়েছে। এসব গ্রামের অগণিত পরিবারের নিজেরা মশারি তৈরি করছে নিজেদের বসতঘরে। প্রতিদিন এসব গ্রাম থেকে হাজার-হাজার মশারি স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে পাঠানো হয় ঢাকাসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায়।

তবে, উপজেলার ২০ গ্রামের ২০০টি পরিবারে কমবেশি লোক মশারি শিল্পে জড়িত থাকলেও সুটিয়াকাঠির ৯নং ওয়ার্ডের পুরো মহল্লার লোকেরা এখনো পেশাটি আকড়ে ধরে বাচার চেষ্টা করছেন। ওই ওয়ার্ডের প্রত্যেক ঘরেই তৈরি হয় মশারি। গ্রামের অধিকাংশ লোক দরিদ্র হওয়ায় পুঁজির অভাবে বাপ-দাদার এ পেশাকে কোন রকমে আকড়ে ধরে বাঁচার চেষ্টা করছেন। সরকারিভাবে সহজ শর্তে ঋণের অভাবে তারা স্থানীয় এনজিও থেকে চড়া সুদে ঋণ এনে এখন কোনমতে ব্যবসা চালাচ্ছেন।

সুটিকাঠি ইউনিয়নের বৃদ্ধ নজরুল ইসলাম (৮৫) বলেন, স্বাধীনতার পূর্ব থেকে এ গ্রামের লোকেরা মশারি তৈরি করে স্বাবলম্বি হয়েছেন। তবে গ্রামের বেশির ভাগ লোক অভাবী হওয়ায় পুঁজির অভাবে মজুরির বিনিময়ে অন্যর ঘরে মশারি বানিয়ে সংসার নিয়ে আছেন কোনমতে।

মশারি কারিগর লিটন (৩৭) বলেন, বছরে শীতের মৌসুমে তাদের হাতে তৈরি নেট মশারির চাহিদা কম। এসময় ব্যবসা খারাপ থাকে। তিনি বলেন, তাদের হাতে তৈরী একটি মশারি ২০০ থেকে ৫০০ টাকায় বিক্রি হয়। একটি ২০০ টাকার মশারিতে ৫০ টাকা এবং ৫০০ টাকার মশারিতে ১২০ টাকা লাভ হয়। একজনে প্রতিদিন ১০টি মশারি বানিয়ে বিক্রি করতে পারলে মাসে ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকার মশারি বিক্রি হয়। তা থেকে খরচ বাদ দিলে ১৫ থেকে ১৬ হাজার টাকা লাভ থাকে।

দৈনিক মজুরির বিনিময়ে মশারি কারিগর শিল্পি বেগম (৩৩) বলেন, আমাদের ঘরে মোট ৫জন সদস্য। ঘরের ভিতরে আমরা দু’জনে মশারি বানিয়ে যা পাই তা দিয়ে ছেলে মেয়েকে লেখা পড়া করিয়ে সুন্দরভাবে সংসার চলে। তবে ডাল সিজনে কাজ কম থাকে, তখন এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে সংসার চালাই। তখন কিছুটা কষ্ট হয়। যদি নিজেদের ব্যবসাটা হতো তাহলে কোন কষ্ট হতো না। এনজিও দিয়ে চড়া সুদের ঋণে এ ব্যবসা চালানো কষ্টকর।

নেছারাবাদ উপজেলা সদর থেকে সন্ধ্যা নদীর পশ্চিম পাড়ে সুটিয়াকাঠী গ্রাম। এ গ্রামের মহল্লায় মহল্লায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে বাড়ির আঙ্গিনায় গড়ে তোলা হয়েছে মশারি তৈরির কারখানা। তবে একটি মহল্লার সবক’টি পরিবার মশারি তৈরির পেশায় নিয়োজিত। কারখানাগুলোয় ইলেকট্রিক্যাল আর প্যাডেল সেলাই মেশিনের ঠক ঠক শব্দ আর নানা যন্ত্রের ছন্দে ভোর থেকেই গভীর রাত পর্যন্ত চলে কর্মযজ্ঞ। চারদিকের নিস্তব্ধতা ভেঙে অবিরাম শব্দের মূর্ছনা যেন জানিয়ে দেয় এটা আর পাচঁটা মহল্লার মতো নয়, অজপাড়াগাঁয়ের এই মহল্লাটির নাম মশারী পট্টি। এখানকার দরিদ্র মানুষের হাতে এই শিল্পের গোড়াপত্তন হলেও ভাগ্য বদলায়নি তাদের। দাদন ব্যবসায়ী আর চড়া সুদে এনজিও থেকে লোন নিয়ে কোনভাবে তিন বেলা দু’মুঠো খেয়ে বাপ-দাদার আদি ব্যবসাকে টিকিয়ে রাখছে এখানকার লোকজন।

Please follow and like us:





উত্তর দিন

Wordpress Social Share Plugin powered by Ultimatelysocial