জোয়ারের পানিতে মোংলার ১ হাজার ৭৬৫টি চিংড়ি ঘের তলিয়ে গেছে
কয়েকদিনের টানা বৃষ্টিতে মোংলা পোর্ট পৌরসভার নিম্নাঞ্চলে স্থায়ী জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে রয়েছে রাস্তাঘাট, ঘরবাড়ী ও দোকানপাট। পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
বিশেষ করে পৌর শহরের শেখ রাসেল সড়ক, গিয়াস উদ্দিন সড়ক, জয়বাংলা, নতুন বাসষ্ট্যান্ড এলাকা, এন্নিওপাড়া, মুসলিমপাড়া ও খ্রিষ্টান কবরস্থান এলাকাসহ বিভিন্ন জায়গায় গত ১০/১২ দিন ধরে পানি জমে রয়েছে। পানি উঠেছে বসত ঘর ও রান্না ঘরে। রাস্তাঘাট ঘর বাড়ী পানিতে তলিয়ে থাকায় রান্না খাওয়া ও চলাচলে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে ওই সকল এলাকার বাসিন্দাদের।
এছাড়া নদী ও খালে পাড়ের এলাকাগুলোতে জোয়ারের পানি উঠে সব কিছু তলিয়ে গেছে। দিনের পর দিন পানির মধ্যে বসবাস করতে হচ্ছে পৌরসভাসহ উপজেলার বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দাদের। পৌর কর্তৃপক্ষকে জমাট বাঁধা এ পানি নিস্কাশনের জন্য বার বার জানানো হলেও তারা কার্যকরী কোন ভূমিকা নিচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে। পৌরসভা বলছে, এ অবস্থায় তাদের কিছুই করার নেই। তবে ভবিষ্যতে জলাবদ্ধতা নিরসনে তাদের পরিকল্পনা রয়েছে।
এদিকে, কয়েকদিনের টানা বৃষ্টিপাত ও নদীতে আকস্মিক জোয়ারের পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় বেড়ি বাঁধ এবং রাস্তাঘাট প্লাবিত হয়ে তলিয়ে গেছে মোংলার বিভিন্ন নিচু এলাকার কয়েক হাজার চিংড়ি ঘের। এতে ভেসে গেছে ঘেরের বাগদা চিংড়িসহ অন্যান্য সাদা মাছও।
বৃষ্টি এবং জোয়ারের পানিতে এখানকার প্রায় ১ হাজার ৭৬৫টি চিংড়ি ঘের তলিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন চাষীরা। এতে প্রায় ৬ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছেন উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা এ. জেড. এম তৌহিদুর রহমান। ঘের মালিকদের জন্য ক্ষতিপূরণ চেয়ে সংশ্লিষ্ট উর্ধতন কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত সুপারিশ পাঠানো হয়েছে বলেও জানান তিনি। তিনি বলেন, বৃষ্টি ও জোয়ারের পানিতে উপজেলার ৬টি ইউনিয়নের ঘেরগুলোতেই কম বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। তবে চাঁদপাই ও চিলা ইউনিয়নের এ ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বেশি। বিশেষ করে মোংলার পশুর ও মোংলা নদীর পাশ ঘেষে যে ঘের রয়েছে সেগুলোতে ক্ষয়ক্ষতি বেশি হয়েছে। জোয়ারের পানিতে নদীর পাশের ঘের আর বৃষ্টির পানিতে ভিতরের ঘের প্লাবিত হয়েছে।
চাঁদপাই ইউনিয়নের কাইনমারী গ্রামের ঘের মালিক নিখিল হালদার বলেন, বৃষ্টি এবং জোয়ারের পানির চাপে ঘেরের বেড়ি বাঁধ ভেঙ্গে এবং তলিয়ে মাছ বের হয়ে যাওয়ার এখন খালি ঘেরই পাহারা দিচ্ছেন তিনি। পাশাপাশি এখন ভেঙ্গে যাওয়া ঘেরের বেড়ী বাঁধ সংস্কারের কাজ করছেন।
কাইনমারী গ্রামের চিংড়ি চাষী বিনয় বিশ্বাস বলেন, কয়েকদিনের টানা বৃষ্টিতে ঘেরে পানি বাড়তে থাকায় যাতে মাছ বের হয়ে না যায় সেজন্য ঘেরের চারপাশে নেট জাল দিয়ে ঘিরে দিয়েছিলাম। কিন্তু হঠাৎ নদীর জোয়ারের পানির চাপে ঘেরের বেড়ী বাঁধ ভেঙ্গে নেটসহ সকল মাছ ভেসে গেছে। আমার দুইটি ঘেরে কোনটিতে একটি মাছও নেই। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত চেষ্টা করে একটি মাছও পাইনি। তাই জাল বালতি নিয়ে খালি হাতে বাড়ী ফিরেছি। একই গ্রামের প্রলয় মন্ডল বলেন, বৃষ্টি ও জোয়ারের পানিতে আমার বাড়ীর পাশের ঘের এবং ঘরবাড়ি তলিয়ে গেছে। কিছুদিন আগে আম্পানে আমাদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। সেই ক্ষতি কাটিয়ে না উঠতেই আবার বৃষ্টি ও জোয়ারের পানি আমাদের সব ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। এখন আমাদের পথে বসার উপক্রম হয়েছে।
কানাইনগর গ্রামের বাসিন্দা মজিদ শেখ বলেন, বৃষ্টিতে তলিয়ে যাওয়ার পর মাটি দিয়ে ঘেরের বেড়ি উঁচু করে দিয়েছিলাম। কিন্তু তাতেও কাজ হয়নি, জোয়ারের পানিতে বেড়ি বাঁধ ভেঙ্গে মাছ যা ছিল তা সব বের হয়ে গেছে। অনেক চেষ্টা করেও আটকে রাখতে পারিনি। কিভাবে সামনের দিনগুলো চলবো, ছেলে মেয়েদের কি দিয়ে লেখা পড়া শিখাবো তা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
বৃষ্টি ও নদীর জোয়ারের পানিতে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেছেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার কমলেশ মজুমদার। তিনি বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে স্থানীয় ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে প্রয়োজনী পর্যাপ্ত সহযোগীতা প্রদানেরও আশ্বাস দিয়েছেন।
মোংলা উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো. নাহিদুজ্জামান জানান, অতি বৃষ্টি ও জোয়ারে তলিয়ে যাওয়া ক্ষতিগ্রস্ত ইউনিয়নবাসীদের মধ্যে জরুরী ভিত্তিতে প্রাথমিকভাবে জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে ৭ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।
অপরদিকে, পানিতে তলিয়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়েছে সুন্দরবনের একমাত্র বন্যপ্রাণী প্রজনণ কেন্দ্র করমজল। গত কয়েকদিন ধরে নদীর অস্বাভাবিক জোয়ারের পানিতে দিনে-রাতে দুইবার প্লাবিত হচ্ছে করমজল। ফলে এখানকার কুমির ও কচ্ছপ প্রজনণ কেন্দ্রের ক্ষতির আশংকা করছেন বনবিভাগ। বর্তমানে করমজল প্রজনণ কেন্দ্রে ৩৬টি হরিণ, ৩০০টি বাটাগুর বাস্কা প্রজাতির কচ্ছপ ও ১৯৩টি লবণ পানি প্রজাতির কুমির রয়েছে। বনের অভ্যন্তরে অতিরিক্ত পানি উঠায় নষ্ট হয়েছে বন্যপ্রাণীর প্রজনণ ও আবাসস্থল।
