প্রধান সূচি

বাগেরহাটে বছরের ৫ মাস পানিবন্দি থাকে ৮০ পরিবার

অতি ভারী বর্ষণের পানিতে তলিয়ে পানিবন্দি অবস্থায় দুর্বিষহ জীবন যাপন করছে বাগেরহাটের সদরের ৮০টি পরিবার। বর্ষা মৌসুম এলেই বৃষ্টির পানি জমে স্থায়ী জলাবদ্ধতা সৃষ্ট হয়ে বছরের ৫ মাসই পানিবন্ধি থাকে এই পরিবারগুলো।

সদর উপজেলার দক্ষিন খানপুর পূর্বপাড়া বসবাসকারী এই ৮০টি পরিবারকে প্রতিবছর আষাঢ় মাস থেকে শুরু করে কার্তিক মাস পর্যন্ত পানিবন্দি থাকতে হয়। অসহায় এসব পরিবারগুলোর রান্না-বান্না বন্ধ থাকে। ছেলে মেয়েদের স্কুল কলেজ যাতায়েত বন্ধ হয়ে যায়। সমস্যা সমাধানে সরকারীভাবে নেই কোন উদ্যোগ। জনপ্রতিনিধিদের নেই ওই এলাকাবাসীর প্রতি কোন গুরুত্ব।

পানি নিঃস্কাশনের ব্যবস্থা না থাকায় পানিবন্দি মানুষগুলো অর্ধাহারে-অনাহারে দিন কাটচ্ছে।  ঘর থেকে বের হলেই দূষিত পানি-কাঁদা। বৃষ্টির পানি জমে সৃষ্টি হওয়ায় জলাবদ্ধতায় পুকুর নর্দ্দমা আর বাথরুমের পানি মিশে একাকার হয়েছে। ব্যবহারের অনুপোযোগী এই পানি মাড়িয়ে নিত্যপ্রয়োজন মেটাতে বাইরে যেতে হয় এলাকাবাসীর। রেকর্ডীয় বৈরাগীর খাল নামে একটি থাকলেও সেটি এখন জমি মালিকদের দখলে। এলাকার কিছু প্রভাবশালীদের দখলে থাকায় অসহায় এই পরিবারগুলো প্রতিকারের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছে।

সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, উপজেলার খানপুর ইউনিয়নের ৮নং ওয়ার্ড দক্ষিণ খানপুর পুর্বপাড়া গ্রামের সারোয়ারের বাডী থেকে মোশাররফ এর বাড়ী পর্যন্ত এক কিলোমিটার সরকারি কাঁচা রাস্তাটি পানিতে ডুবে গেছে। ফলে এলাকার মানুষের যাতায়াত, বাজার ঘাটসহ চিকিৎসা ও দৈনন্দিন বিভিন্ন প্রয়োজনে নোংরা ও দূষিত পানি মাড়িয়ে আসতে হয়। জলাবদ্ধতায় সুপেয় পানির সংকট দেখা দিয়েছে। বাচ্চারা পানিতে হাটা চলার কারণে পায়ের পাতা ও আঙ্গুলের ফাকে ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছে। এ অবস্থায় ভয়াবাহ পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হবার আশংকা করছে পানিবন্ধি এসব পরিবারগুলো। ওই পাড়াতে পারিবারিকভাবে ১২টি কবরস্থান প্রায় ২ ফুট পানির নীচে তলিয়ে আছে। পরিবারগুলো এমনই দূর্ভাগা যে- যদি কোন একজন মারা যায় তবে কবরের জায়গা পাওয়াও মুশকিল।

এলাকার ছাবদুল হাওলাদার তার বাড়ীর উঠানে প্রায় একফুট পানি। পানিতে দড়িয়ে তিনি বলেন, দূর্ভোগের কথা কি বলবো, বাড়ীর উঠানেই এই পানি, তা হালে অন্য সব জায়গায় কি হতে পারে ভেবে দেখুন। আমাদের প্রতি কারোই কোন দরদ নেই, যদি তাই থাকতো তাহলে পানিতে তলিয়ে আমাদের, ক্ষেতের সবজিসহ কোন ফসল নষ্ট হতো না। জলাবদ্ধতার কারণে নারকেল সুপারীর ফলনও কমে গেছে। কবে আমরা এর থেকে রেহাই পাবো আল্লাই ভালো জানেন।

দিনমজুর আলমগীর শেখ বলেন, প্রতি বছরই  বর্ষা মৌসুমে আমরা এই দূর্ভোগের শিকার হই, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি বা সরকারীভাবে এই সমস্যা সমাধানে কেউ আসে না। আমরা খেটে খাওয়া মানুষ, সম্মিলীতভাবে উদ্যোগী হয়ে কিছু করতে গেলে এখানে প্রভাবশালী কয়েকজন লোক আছে তারা বাঁধা দেয়। ফলে হামলার শিকার হতে হয়, তাদের বিরুদ্ধে কোথাও নালিশ করেও কোন ফল হয় না।

ওই এলাকার আরজু হাওলাদার, শাহজান শেখ, মজিবর হাওলাদার, মহব্বত হাওলাদার, জহির হাওলাদারসহ প্রায় অর্ধশত লোক বলেন, এই মৌসুমে মাত্র দুদিন বৃষ্টি হলে, আমাদের খাবার পানি, গোসলের পানি ও বাথরুমের পানি মিশে একাকার হয়ে যায়। এলাকায় একটি নলকূপও নেই একটু ভালো পানি পান করবো। দূষিত কাঁদা পানিতে পায়ের তলা খেয়ে ছিদ্র করেছে। সকল প্রকার সবজী ও রোপা আমন এবং আউষের বীজতলা পানির নীচে। আমাদের পুকুরের মাছ বাড়ীর উঠানে খেলা করে। বাচ্চারা পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। আমাদের প্রতি কারোরই কোন খেয়াল নেই। এক সময় এই পানি রেকর্ডীয় বৈরাগীর খাল থেকে চাকশ্রী বড় খালে চলে যেতো। সেই খাল এখন জমি মালিকদের দখলে। ওই খাল খননে সরকারের পক্ষ থেকে কোন উদ্যোগ নেই। এলাকাবাসি ওই খাল উদ্ধারে গেলে দখলবাজদের হামলার শিকার হতে হবে বা খুন খারাবি হবে। আমাদের দাবি সরকার আমাদের পাশে থেকে এই দূর্ভোগে হাত থেকে মুক্তি দিক। যাতে আমরা পূর্ব পাড়াবাসি পানিবন্ধি হতে পরিত্রান পাই।

৮নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও ওই ওয়ার্ড ইউপি সদস্যের ভাই মো. ফজলু শেখ বলেন, প্রতি বছর এই বর্ষা মৌসুম এলেই পানি জমে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। যা কার্তিক মাস নাগাদ থাকে। এই কয় মাসে ক্ষেত খামারে কোন ফসল ফলাতে পারি না। এই গেল বছরে আমার নিজ ধানের জমি নষ্ট করে বিনামূল্যে ৬৫ বাড়ী পৌনে দুই লক্ষ বালু দিয়েছি, শুধু তাদের কষ্ট দেখে। এক সময় এই পানি বৈরাগীর খাল থেকে অপসারণ হতো, ওই খালে এখন কচুরিপানা জমে বন্ধ হয়ে গেছে। সুযোগ মত ঘের মালিকরা দখলও করে নিয়েছে সে খালটি। যে কারণে এখন আর পানি নিঃস্কাশনের কোন পথ নেই। এখন যদি সরকার উদ্যোগী তাহলে আবার ওই খাল সচল হবে।

এ বিষয়ে খানপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ফকির ফহম উদ্দিনের সাথে কথা হলে তিনি বলেন, বিষয়টি আমি জেনেছি, আপাতত পাইপ দিয়ে পানি সরাবার ব্যবস্থা করেছি। শুকনা মৌসুম এলে একটি ইউ ড্রেন করা হবে, সে পরিকল্পনা ইতিমধ্যে নেয়া হচ্ছে।

Please follow and like us:





উত্তর দিন

Wordpress Social Share Plugin powered by Ultimatelysocial