চাঁদপাই নৌ-পুলিশের ওসি’র বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ
সুন্দরবন সংলগ্ন মোংলার চাঁদপাই নৌ থানা পুলিশের ওসি’র বিরুদ্ধে জব্দকৃত মালামাল ও নগদ টাকা আত্মসাতসহ ‘টোকেন’ বানিজ্য ও ঘুষ দুর্নীতির নানা অভিযোগ উঠেছে। ওসি আবুল হোসেন শরিফের একের পর এক অনিয়ম ও অপতৎপরতায় ফুঁসে উঠছে সুন্দরবন সংলগ্ন জয়মনি গ্রামের পেশাজীবীসহ সাধারণ মানুষ। নিরীহ মানুষকে ক্রসফায়ার ও ডাকতিসহ মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোর ভয় দেখিয়ে অর্থ হাতিয়ে নেয়ারও অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা।
নৌ-পুলিশের ওসি’র অনৈতিক কর্মকান্ডের বিরুদ্ধে বুধবার সকালে জয়মনি বাজারে সমবেত হন শত শত গ্রামবাসী। এ সময় ভুক্তভোগীরা স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানের কাছে নৌ-পুলিশের অর্থ বাণিজ্য এবং অনিয়মের চিত্র তুলে ধরেন।
স্থানীয় গ্রামবাসী ও ভুক্তভোগী জেলেরা জানান, সুন্দরবন ও নৌ-পথের চোরাচালান প্রতিরোধে মোংলার জয়মনিতে ২০১৭ সারে স্থাপিত হয় চাঁদপাই নৌ-থানা। এ থানার শুরুতেই নিরাপত্তা, চোরাচালন বন্ধসহ অপরাধী চক্রের আনাগোনা কমবে বলে আশায় বুক বেঁধেছিল এলাকার জেলে-বাওয়ালি ও সাধারণ মানুষ। কিন্তু নৌ-থানা পুলিশের কার্যক্রম দু’মাস যেতে না যেতেই পেশাজীবী ও সাধারণ নিরীহ মানুষকে ঘিরে ওসি আবুল হোসেন নেমে পড়েন নানা অনিয়ম ও অর্থ বাণিজ্য। এখানে যোগদানের পর দুই বছরের অধিক সময় ধরে একই থানায় থাকা এ পুলিশ কর্মকর্তা জড়িয়ে পড়েছেন নানা অনিয়মে। জয়মনি গ্রামের গৃহবধু রহিমা বেগম জানান, সন্ধ্যার পর যুবক থেকে বয়স্ক ও পেশাজীবীরা ঘর থেকে নামলেই নৌ-পুলিশের আতংকে থাকতে হয়। যখন তখনও যে কাউকে মিথ্যা অভিযোগ তুলে নিয়ে গিয়ে মোটা অংকের টাকা দাবি করেন নৌ-পুলিশের সদস্যরা। তাই এমন হয়রানী থেকে রেহাই পেতে প্রতিমাসে মাথাপিছু ২শ’ টাকা করে দিতে হয় নৌ-পুলিশকে। আর এ মাসিক টাকা না দিলে নানা বিপদে পড়তে হয় নিরীহ মানুষকে।
এছাড়া সুন্দরবনের অভ্যন্তরে ও পশুর নদীতে জেলে, বাওয়ালী-মৌয়ালসহ পেশাজীবীদের বহন করতে হয় ওসি আবুল হোসেনের ‘বিশেষ টোকেন’ কার্ড। প্রতি মাসে জন প্রতি ৫শ’ টাকা করে দিতে হয় এ টোকেন কার্ডের জন্য। বন বিভাগের বৈধ পাস পারমিট থাকলেও নৌ-পুলিশের টোকেন কার্ড ছাড়া কেউ নদীতে নামতে পারেন না। কেউ না বুঝে আবার কেউ না বুঝে নৌ-পুলিশের এ টোকেন ছাড়া নদীতে নামলে তাকে ডাকাত কিংবা অপরাধী সাজানোর চেষ্টাসহ উৎকোচ আদায়ে ভয়ভীতি প্রদর্শন করা হয়।
জয়মনি গ্রামের জহুরুল গাজী ও সুলতান হাওলাদার বলেন, নৌ-থানার ওসি’র এ বিশেষ টোকেন নিয়ে চলতে হয় সবাইকে। সুন্দরবনে ও পশুর নদীতে জেলে-বাওয়ালীসহ প্রায় ৩ শতাধিক পেশাজীবীর কাছে রয়েছে এমন টোকেন।
অপর দিকে, বেশি লাভের আশায় এ টোকেন নিয়ে নিষিদ্ধ মৌসুমে সুন্দরবনের নদী-খালে মাছ ও কাঁকড়া আহরণ করে থাকেন ওসি আবুল হোসেন শরিফ এর অনুগতরা। নদীতে অভিযান ও টহলদানকালে টোকেন বিহীন জেলেদের জাল, নৌকা, মাছ ধরার সরঞ্জামাদী থানায় এনে পরে অন্যত্র বিক্রি করার অভিযোগও রয়েছে ওসি’র বিরুদ্ধে। এছাড়া বনের নদী-খালে বিষ প্রয়োগ করে মাছ শিকার, হরিণ শিকারসহ অপরাধী চক্রের সঙ্গে বেশ সখ্যতাও রয়েছে তার।
চিংড়ি পোনা মৌসুমে বাগদা ও গলদা রেনু আহরণ মৌসুমে পোনা আহরণকারীদের সহায়তার মাধ্যমে নৌ-পুলিশের সব চেয়ে বেশি আয় হয়ে থাকে বলে জানান স্থানীয়রা। শুধু নৌ-পথ নয়, লোকালয়েও রয়েছে নৌ-পুলিশের ব্যাপক অপতৎপরতা। স্থানীয় হাট-বাজারের মাছের আড়ৎ, জেলে, মহাজনসহ ক্রেতা ও বিক্রেতাদের কাছ থেকেও নিয়মিত ও মাসিক উৎকোচ আদায় করে থাকে চাঁদপাই নৌ-পুলিশের সদস্যরা। এছাড়া সড়কে চলাচলকারী মটরসাইকেল, টমটমসহ বিভিন্ন যানবাহন ও ক্যারাম বোর্ড খেলা থেকেও চাঁদা আদায় করা হয়। কাঁকড়া চাষাবাদ মৌসুমে স্থানীয় প্রায় ২২০টি হ্যাচারি মালিকদের কাছ থেকে ২ থেকে ৩ হাজার টাকা করে আদায় করেন সরাসরি ওসি নিজেই। আর টাকা না দিলে সুন্দরবন থেকে এ কাঁকড়া অবৈধভাবে আহরণ করা হয়েছে বলে অভিযোগ তুলে হয়রানী করা হয়।
এদিকে, গ্রামের সাধারণ মানুষকে মাদক দ্রব্য সেবন ও বেচাকেনাসহ নানা মিথ্যা অভিযোগ তুলে চাঁদা ও উৎকোচ দাবি করেন ওসি আবুল হোসেন শরিফ। তার অনৈতিক চাহিদা পূরণে ব্যর্থ হলে ক্রসফায়ারসহ মামলায় জড়ানোর ভয় দেখানো হয় বলে অভিযোগ করেন এলাকাবাসি। ওসির এসব অবৈধ পথের আয় বানিজ্য দেখভাল ও ক্যাশিয়ারের দায়িত্ব পালন করেন আনোয়ারুল হোসেন ও অনুজ নামের ওই থানার দুই পুলিশ সদস্য।
উল্লেখ্য, গত সোমবার জয়মনি গ্রামের ৯ যুবককে জুয়া খেলার অভিযোগে আটক করেন নৌ-থানা পুলিশের সদস্যরা। আটককৃতদের কাছ থেকে ২ লাখ টাকা নগদ জব্দ করা হলেও জব্দ তালিকায় দেখানো হয় মাত্র ১৫০ টাকা।
বুধবার জয়মনি বাজারে সমবেত শত শত গ্রামবাসী নৌ-পুলিশের হয়রানী ও অত্যাচারের বিষয়টি স্থানীয় চিলা ইউপি চেয়ারম্যানকে অবগত করেন। চাঁদপাই নৌ-থানা পুলিশের কর্মকান্ড নিয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় চিলা ইউপি চেয়ারম্যান মো. আকবর গাজী। তিনি অভিযোগ করে বলেন, নৌ-থানার ওসি আবুল হোসেন শরিফ টাকা ছাড়া কিছুই চেনেন না। টাকা হলেও তিনি সকল কিছু করতে পারেন। নৌ পুলিশের হয়রানীমূলক কর্মকান্ডে গ্রামের পেশাজীবীসহ নিরীহ মানুষ এখন অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছেন।
মোংলা চাঁদপাই নৌ-থানার ওসি আবুল হোসেন শরিফ তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ভাল কাজ করতে চাইছেন বলেই তার বিরুদ্ধে মিথ্যা অপবাদ ছড়াচ্ছে একটি মহল। সকল সময় তিনি ন্যায়ের পক্ষে এবং অন্যায় কাজের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন।
এ বিষয়ে খুলনা নৌ অঞ্চলের পুলিশ সুপার মো. দ্বীন মোহাম্মাদ বলেন, খুলনর সর্বত্র নৌ-পুলিশ সুনামের সঙ্গে কাজ করছে। তাই অনিয়মে জড়ানোর সুযোগ নেই। তবে লিখিত অভিযোগ পেলে চাঁদপাই নৌ-পুলিশের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ খতিয়ে ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে বলে তিনি জানান।
