মোংলা বন্দরের শিপিং ব্যবসায়ী চাঁদাবাজ চক্রের কবলে জিম্মি : কোটি টাকা চাঁদা দাবী
বাগেরহাটের মোংলা বন্দরের শিপিং ব্যবসায়ীরা চাঁদাবাজ চক্রের কবলে জিম্মি হয়ে পড়েছে। তারা অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে চাঁদা দাবী করে নানা হুমকী দিচ্ছে।
এমনি একটি চাঁদাবাজ চক্র ১৫ লাখ টাকা চাঁদা নিয়েও ক্ষ্যান্ত হননি, উল্টো আরো এক কোটি টাকা চাঁদা দাবী করেছেন মোংলার শিপিং ব্যবসায়ী ও বন্দর ব্যবহারকারী নূরু এন্ড সন্সের মালিক এইচ এম দুলালের কাছে। খুলনার ৩ কেডিত্র এভিনিউ এলাকার সিগমা শিপিং লাইন্স লিমিটেডের মালিক শেখ রফিকুল ইসলাম বাবলু ও তার সহযোগীরা গত ২৬ আগষ্ট বিকেল সাড়ে ৪ টার দিকে প্রকাশ্য আগ্নেয়াস্ত্রের মুখে জিম্মি করে এ চাঁদার টাকা দাবি করেছেন। অন্যথায় ভূক্তভোগী ব্যবসায়ী এইচ এম দুলালকে কোন প্রকার ব্যবসা করতে না দিয়ে খুন গুমেরও হুমকি দেয়া হয়েছে। এ ঘটনায় মোংলা বন্দরের শিপিং ব্যবসায়ী নূরু এন্ড সন্সের মালিক এইচ এম দুলাল ও তার কর্মকর্তারা ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছেন। ভূক্তভোগী ব্যবসায়ী এইচ এম দুলালের ম্যানেজার সাধন কুমার চক্রবর্তী রফিকুল ইসলাম বাবলুসহ আরো অজ্ঞাতনামা ২/৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেও নিস্তার পাচ্ছেন না। চাঁদাবাজ চক্রটি এখনও তার বিরুদ্ধে নানা অপপ্রচার ও ষড়যন্ত্র চালাচ্ছে যাতে তাকে বিভিন্নভাবে হেনেস্তা করা যায়। এ ছাড়া এ ঘটনায় দায়ের করা মামলা প্রত্যাহার করে নেবার জন্যও দেয়া হচ্ছে নানা রকম ভয়ভীতি আর হুমকি।
অপরদিকে একই দিন বেলা ১১ টার দিকে দুলালের ম্যানেজার সাধন কুমার চক্রবর্তীকে বন্দরের ইঞ্জিনিয়ার ভবনের সামনে রফিকুল ইসলাম বাবলু ও তার সহযোগীরা ১ কোটি টাকা চাঁদার দাবিতে পিস্তলের মুখে জিম্মি করে মারধর ও অপহরণের চেষ্টা চালায়। এ ঘটনাতে সাধন কুমার বাদি হয়ে আদালতের মাধ্যমে রফিকুল ইসলামের ও তার সহযোগীদের নামে থানায় মামলা দায়ের করেছেন।
এদিকে, অভিযোগ উঠেছে, মুল ঘটনাকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করতে সিগমা শিপিং লাইন্সের মালিক শেখ রফিকুল ইসলাম বাবলু নানাভাবে উঠে পড়ে লেগেছে। এ চক্র নিজেদের বাঁচাতে নুরু এন্ড সন্স মালিক এইচ এম দুলালকে জব্দ করতে নানামুখী নীল নকশা ও ষড়যন্ত্র তৈরী করে জ্বালানী তেলের পাওনা টাকার চেক আটকিয়ে তার বিরুদ্ধে একই দিনের ঘটনা বিকেলে সাজিয়ে ৫০ লাখ টাকা চাঁদার দাবিতে পিস্তল ঠেকিয়ে মারাত্মক জখমের ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগ এনে আদালতের মাধ্যমে থানায় উদ্দেশ্যমূলক মিথ্যা কাল্পনিক মামলা দায়ের করেছেন।
শিপিং ব্যবসায়ী এইচ এম দুলালের বিরুদ্ধে মিথ্যা, ষড়যন্ত্র ও উদ্দেশ্যমূলকভাবে দায়ের করা ‘সাজানো’ মামলা প্রত্যাহারের দাবিতে রবিবার বেলা ১১ টার দিকে শহরের শেখ আব্দুল হাই সড়ক এলাকায় ‘আমরা মোংলাবাসী’র ব্যানারে মানববন্ধন ও সমাবেশ কর্মসূচি পালন করা হয়। এ কর্মসূচিতে বক্তব্য রাখেন, সাংবাদিক মনিরুল হায়দার ইকবাল, আহসান হাবিব হাসান, হাসান গাজী, শেখ মো. নূর আলম, এম এ মোতালেব, মাওলানা তানভীর আহম্মেদ, শ্রমিক নেতা এরশাদুজ্জামান সেলিম, জাহাঙ্গীর সর্দার, বাবুল সর্দারসহ শহরের বিভিন্ন শ্রেণি পেশার নেতৃবৃন্দ।
প্রচন্ড বৃষ্টি উপেক্ষা করে শত শত নারী, পুরুষ, শিশু এ মানববন্ধন ও সমাবেশে অংশ নিয়ে এইচ এম দুলালের নামে মিথ্যা মামলা দায়েরের ক্ষোভ, নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান।
এসময় বক্তারা অবিলম্বে এইচ এম দুলালের নামে দায়ের হওয়া মিথ্যা মামলা নি:শর্তভাবে প্রত্যাহারসহ ঘটনার মূল নায়ক শেখ রফিকুল ইসলাম বাবলুকে গ্রেফতারের দাবি জানান। অন্যথায় এ ব্যাপারে মোংলায় শান্তিপূর্ণভাবে কঠোর আন্দোলন সংগ্রাম শুরু করার হুমকি দেয়ন বক্তারা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মোংলা বন্দর ব্যবহারকারী এইচ এম দুলালের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান মেসার্স নুরু এন্ড সন্স কোং আর্ন্তজাতিক অঙ্গনের মহলের সাথে বিভিন্ন ব্যবসা করে বেশ কয়েক বছর ধরে সুনাম অর্জন করে আসছেন এবং এ জন্য মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ থেকে সে কয়েকবার পুরস্কৃত হয়েছেন। এতে ঈর্ষান্বিত হয়ে প্রতিপক্ষ ব্যবসায়ীরা তার বিরুদ্ধে উঠে পড়ে লাগে। গত ২০১৭ সালে এইচ এম দুলাল মোংলা বন্দর জেটির সম্মুখভাগ থেকে রামপাল তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র পর্যন্ত প্রায় ১৩ কিলোমিটার নদী খননের আর্ন্তজাতিক ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান প্রায়তীকুশাল সি ঈগল ড্রেজিং জেভি’র সাথে জ¦ালানী তেল (ডিজেল/ফার্নেস) সরবরাহে চুক্তিবদ্ধ হয়। এরপর চুক্তি অনুযায়ী তেলও সরবরাহ করেন দুলাল। কিন্তু গত ২৩ ফেব্রুয়ারী পর্যন্ত তেল সরবরাহের মূল্য হিসেবে ওই ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান প্রায়তীকুশাল সি ঈগল ড্রেজিং জেভি’র কাছে মেসার্স নুরু এন্ড সন্স কোং এর মালিক এইচ এম দুলাল প্রায় ৩ কোটি ৬৪ লাখ ৯৩ হাজার টাকা পাওনা হন। এরই মধ্যে পাওনা টাকার মধ্যে তিন দফায় ৩৬ লাখ ২২ হাজার ৮শ’ এবং ১ কোটি ৮ লাখ ৫০ হাজার ও ২ কোটি টাকার চেক দেয় প্রায়তীকুশাল সি ঈগল ড্রেজিং জেভি নামক কোম্পনীটি। কিন্তু ওই চেকের টাকা ছাড় করাতে বাঁধা হয়ে দাঁড়ায় প্রায়তীকুশাল সি ঈগল ড্রেজিং জেভি’র বাংলাদেশের স্থানীয় এজেন্ট খুলনাস্থ ৩ কেডিত্র এভিনিউ এলাকার সিগমা শিপিং লাইন্স লিঃ এর মালিক শেখ রফিকুল ইসলাম বাবলুসহ তার সহযোগীরা। এর আগে ২০১৬ সালে সিগমা শিপিং লাইন্স’র মালিক শেখ মো. রফিকুল ইসলাম বাবলু জ্বালানী তেল সরবরাহ বাবদ চাঁদা চাইলে ব্যবসায়ীক স্বার্থে দু’দফায় নুরু এন্ড সন্স কোং পক্ষ থেকে তাকে ১৫ লাখ টাকা চাঁদা প্রদান করা হয়। অতি সম্প্রতি মূল কোম্পানীর জ্বালানী সরবরাহের দেয়া চেকের ওই টাকা ছাড় করাতে গেলে বাবলু ও তার সহযোগীরা নুরু এন্ড সন্স কোম্পানীর কাছে পুনরায় ১ কোটি টাকা চাঁদা দাবি করে। এ চাঁদার টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে গত ২৬ আগষ্ট সকাল ১১ টার দিকে প্রকাশ্যে মোংলা বন্দরের ইঞ্জিনিয়ারিং বিল্ডিং চত্বর এলাকায় বন্দর ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠান মের্সাস নুরু এন্ড সন্স কোং এর ম্যানেজার সাধন কুমার চক্রবর্তীকে সিগমা শিপিং লাইন্সের মালিক শেখ রফিকুল ইসলাম বাবলুসহ তার সহযোগীরা আগ্নেয়াস্ত্র¿ দেখিয়ে ভীতি প্রদর্শন, মারধর, অপহরণের চেষ্টাসহ প্রাণনাশের হুমকি দিয়েছেন। এ সময় সাধনের ডাক চিৎকারে আশপাশের লোকজন জড়ো হলে বাবলু তার বাহিনী নিয়ে সটকে পড়ে। এ ঘটনায় গত ৪ আগষ্ট আদালতের আদেশে দু’টি মামলাই রেকর্ড করা হয় বলে জানান মোংলা থানার ওসি মো. ইকবাল বাহার চৌধুরী।
এদিকে মুল ঘটনাকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করতে সিগমা শিপিং লাইন্সের মালিক শেখ রফিকুল ইসলাম বাবলু নানাভাবে উঠে পড়ে লেগেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ চক্র নিজেদের বাঁচাতে নুরু এন্ড সন্স মালিক এইচ এম দুলালকে জব্দ করতে নানা নীল নকশা ও ষড়যন্ত্র তৈরী করতে থাকে। এইচ এম দুলাল অভিযোগ করে বলেন, জ্বালানী তেলের পাওনা টাকার চেক আটকিয়ে চাঁদা দাবি করেই বাবলু ক্ষ্যান্ত হননি উল্টো তার বিরুদ্ধে একই দিনের বিকেলের ঘটনা সাজিয়ে ৫০ লাখ টাকা চাঁদার দাবিতে আদালতের মাধ্যমে তার ম্যানেজারের বিরুদ্ধে থানায় উদ্দেশ্যমুলক একটি মিথ্যা কাল্পনিক মামলা দায়ের করেছেন। এতে তার সামাজিক ও ব্যবসায়িক সুনাম ক্ষুন্ন করার অপতৎপরতা চালানো হচ্ছে। এ ঘটনার সঠিক তদন্ত করলে আসল রহস্য বের হয়ে আসবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
এ ব্যাপারে মোংলা থানার ওসি ইকবাল বাহার চৌধূরী জানান, চাঁদাবাজির দুটো ঘটনাই আমরা তদন্ত করে দেখছি। তদন্ত শেষ হলেই বোঝা যাবে কোনটি সঠিক ও আসল ঘটনা। ওসি অবশ্য এর বেশী কিছু মন্তব্য করতে রাজি হননি।
এ বিষয়ে রফিকুল ইসলাম বাবলুর বক্তব্য জানতে তার মোবাইল ফোনে (০১৬১৩ ৩৬৩৫৩৫) যোগাযোগ করা হলে ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়। তবে তিনি কয়েকটি পত্রিকায় প্রতিবাদ বিজ্ঞাপন দিয়ে জানিয়েছেন, তার নামে নুরু এন্ড সন্স কোম্পানীর ম্যানেজার সাধন কুমার চক্রবর্তী মিথ্যা চাঁদাবাজি মামলা দায়ের করেছেন। তিনি কোন সন্ত্রাসী কার্যকলাপের সাথে জড়িত নন।
