৫ টাকার টোল ৫৫টাকা !
বাগেরহাটের রায়েন্দা-বড়মাছুয়া খেয়াঘাটে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় ॥ যাত্রীরা জিম্মি
উপকূলীয় মঠবাড়িয়ার বড়মাছুয়া ও শরণখোলার রায়েন্দার সীমানায় বলেশ্বর নদীর আন্ত:বিভাগীয় খেয়াঘাটে যাত্রী সাধারণকে জিম্মি করে নির্ধারিত টোলের চেয়ে ১০/১২ গুণ অতিরিক্ত টোল আদায়ের অভিযোগ পাওয়া গেছে। খেয়াঘাটের ইজারাদার অবৈধভাবে সাব-লীজ দিয়ে যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা আদায় করছে।
অতিরিক্ত টাকা দিতে ব্যর্থ হলে সাব-লীজ গ্রহণকারী ও তাদের লোকজন যাত্রীদের ভয়ভীতি, নদীতে ফেলে দেয়ার হুমকি এবং অশালীন ব্যবহার করছে। এমনকি যাত্রীদের হাতে থাকা ব্যাগ বা মালামালের জন্যও জুলুম করে ৫০ থেকে ৭০ টাকা করে আদায় করা হচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ আইনের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুল দেখিয়ে অবৈধভাবে খেয়াঘাট ইজারাদার সাব-লীজ দিয়ে সরকার নির্ধারিত টোলের চেয়ে অতিরিক্ত টাকা আদায় করার ঘটনায় ওই খেয়ায় চলাচলকারী দুই জেলার যাত্রী সাধারণের মাঝে দীর্ঘদিন ধরে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করেও কোন সাড়া তো মিলছেই না বরং এদের অত্যাচারের মাত্রা বেড়েই চলছে। ফলে স্থানীয় খেয়া পারাপারকারী ভুক্তভোগী যাত্রীরা সরকারের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি কামনা করছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, খুলনা বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয় থেকে বাংলা ১৪২৬ সালের জন্য বড়মাছুয়া আন্তঃবিভাগীয় খেয়া ঘাটটি ২৪ লাখ ৫৫ হাজার ৯৪৮ টাকায় সর্বোচ্চ দরদাতা হিসেবে বড়মাছুয়া ইউপি সদস্য ও ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবকলীগ নেতা কাইয়ূম হাওলাদার ইজারা বন্দোবস্ত পায়। ওই ঘাট ইজারা নিয়েই ক্ষমতাসীন দলের নাম ভাঙ্গিয়ে ও স্থানীয় এক প্রভাশালী নেতার নির্দেশে বিধি বহির্ভূতভাবে ইজারাদার কাইয়ুম স্থানীয় একটি চক্রের কাছে অবৈধভাবে ঘাটটি ৬৪ লাখ ৫০ হাজার টাকায় সাব-লীজ দেয়।
সম্প্রতি বড়মাছুয়া খেয়া ঘাটে সরেজমিনে গেলে স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করে বলেন, খেয়া ঘাট পূণ:ইজারা বা সাব-লীজ দেয়ার নিয়ম না থাকলেও পিরোজপুর-বাগেরহাটের দুই জেলার জনগুরুত্বপূর্ণ বড়মাছুয়া খেয়াঘাটটি স্থানীয় ফায়ার সার্ভিসে কর্মরত ফায়ারম্যান সামসুল হক মৃধা, শরণখোলার তৌহিদুল ইসলাম (ডিলার), আবদুল কাদের ও বড়মাছুয়ার মৎস্য আড়ৎদার ফারুক তালুকদার ঘাট ইজারাদার ইউপি সদস্য কাইয়ূমের কাছ থেকে ৬৪ লাখ ৫০ হাজার টাকায় সাব-লিজ নেয়।
ঘাটে যাত্রী সাধারণ, বিভিন্ন যানবাহন ও মালামাল পারাপারের সরকার অনুমোদিত টোল আদায়ের টাকার তালিকা সর্বসাধারণের জ্ঞাতার্থে সহজে দর্শনীয় জায়গায় নোটিশ বোর্ড আকারে টানানোর বিধান থাকলে দু’পারের কোথাও তা টানানো হয়নি। এছাড়াও যাত্রী পারাপারের জন্য লীজ গ্রহণকারীদের নিজস্ব ঘাট থাকার বিধান থাকলেও তাদের চলাচলের ঘাট না থাকায় সরকারি টার্মিনাল ব্যবহার করতে হচ্ছে যাত্রীদের। যাত্রীদের জিম্মি করে সরকারী রেটের ৫ টাকার পরিবর্তে অতিরিক্ত ১০ থেকে ১২ গুন বেশী টোল ও টার্মিনাল ভাড়া ৫ টাকা আদায় করা হচ্ছে।
উদয়তারা বুড়িরচর গ্রামের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. মোজাম্মেল হক (৭০) বলেন, তিনি প্রায়ই এই খেয়া পার হয়ে শরণখোলা আত্মীয়ের বাড়িতে আসা যাওয়া করেন। তাকে টারমিনাল ভাড়া ৫ টাকা ও খেয়া ভাড়া ৫০ করে মোট ৫৫ টাকা দিতে হয়। এর কম দিতে চাইলে ওরা অশালীন ব্যবহার করে করে।
শাখারীকাঠী গ্রামের বিকাশ চন্দ্র মন্ডলের মেয়ে ও মঠবাড়িয়া সরকারী কলেজের বিএ প্রথম বর্ষের ছাত্রী জয়া মন্ডল জানান, টার্মিনাল-খেয়াভাড়া ৫৫ টাকার কম দিতে চাইলে টোল আদায়কারী ট্রলার থেকে নেমে যেতে বলেন। শরণখোলার বাসিন্দা ও মঠবাড়িয়া পৌর শহরের ঐতিহ্যবাহী কে. এম. লতীফ ইনস্টিটিউশনের ইংরেজী বিভাগের সিনিয়র শিক্ষক আয়শা খানম রোজি জানান, আমি মাছুয়া-রায়েন্দা খেয়া পার হয়ে নিয়মিত বাড়িতে আসা যাওয়া করি। এছাড়া বড় মাছুয়া স্টীমার ঘাটের যাত্রীসহ দুই বিভাগের জনসাধারণের চলাচলের একমাত্র মাধ্যম এই খেয়াঘাটটি দ্বিগুনেরও বেশী টাকায় সাব-লীজ নিয়ে জনগনের ওপর ষ্টীম রোলার চালাচ্ছে। সন্ধ্যা নেমে এলে এর অত্যাচারের মাত্রা কয়েকগুন বেড়ে যায়। এছাড়াও যাত্রীদের হাতে থাকা ২/৩ কেজি ওজনের একটি বৈয়াম বা ব্যাগের জন্য অতিরিক্ত ৩০/৪০ টাকা আদায় করছে। এছাড়া প্রতিটি মরটসাইকেল পারাপারের জন্য ১’শ থেকে ১২০ টাকা গুনতে হয় যাত্রীদের।
স্থানীয় ট্রলার চালক সিদ্দিক তালুকদার (৫৫) অভিযোগ করে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে রায়েন্দা-মঠবাড়িয়ার বলেশ্বর নদীতে যাত্রী পারাপার করে আসছি। একজন যাত্রী ট্রলারে উঠালেই তাকে ৪০/৫০ টাকা খেয়া আদায়কারীকে দিতে হচ্ছে। যার ফলে আমি ট্রলার চালানো বন্ধ করে দিয়েছি।
এ ব্যপারে সাব-লীজ গ্রহণকারী ফায়ারম্যান শামসুল হক সাব-লীজ নেয়ার কথা অস্বীকার করে বলেন, আমি ইজারাদারের সাথে শেয়ার আছি।
ঘাট ইজারাদার আব্দুল কাইয়ুম তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, শীঘ্রই দুই পাড়ে যাত্রী ও পণ্য পারাপারের রেট চার্ট টানানো হবে।
খুলনা বিভাগীয় কমিশনার ঢাকায় ট্রেনিং-এ থাকায় তার সাথে যোগাযোগ করা না গেলেও ওই পদে দায়িত্বে থাকা অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (রাজস্ব) ও আন্তঃবিভাগীয় ফেরি ইজারা কমিটির আহবায়ক সুবাস চন্দ সাহা জানান, সরকার অনুমোদিত টোল রেট চার্ট না টানিয়ে অতিরিক্ত টোল আদায় দন্ডনীয় অপরাধ। এ বিষয়ে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
