মাতৃভাষার চর্চা : উদ্ভব ও ক্রমবিকাশ
বাংলা আমাদের মাতৃভাষা। মাতৃভাষা যেন এক অপরূপ রূপকথার রাজ্য। আমাদের সব প্রয়োজনের কথা, অপ্রয়োজনের কথা, হাসি-কান্না, আনন্দ-বেদনার কথা মাতৃভাষায় যতোটা সহজ করে, সুন্দর করে প্রকাশ করা যায়, পৃথিবীর অন্য কোনো ভাষার মাধ্যমে তা সম্ভব নয়।
আর এজন্যই কবির ভাষায়-
“নানান দেশের নানান ভাষা
বিনা স্বদেশী ভাষা, মিটে কি আশা ?”
না, মাতৃভাষা ছাড়া কিছুতেই মনের আশা পূরণ হয় না। আমরা দেখি আমাদের দেশের অনেকেই চমৎকার ইংরেজি জানেন। সুন্দর করে ইংরেজিতে কথা বলেন। এতে আমাদের তাক লেগে যায়। কিন্তু আমরা কি জানি, মাতৃভাষা ভালো করে না জানলে, বিদেশী ভাষাও ভালো করে রপ্ত করা যায় না! একজন বাঙালি যখন ইংরেজিতে কথা বলেন তখন কিন্তু মনে মনে বাংলা ভাষাতেই অনুবাদ করে ইংরেজি বলেন। তাই অন্যের মাতৃভাষা কখনোই নিজের মাতৃভাষার মতো আপন হয় না।
আমাদের মাতৃভাষা বাংলার জন্ম হয়েছে আজ থেকে প্রায় দেড় হাজার বছর আগে। মানুষের জন্মের ক্ষেত্রে যেমন দিন তারিখ থাকে, ভাষার বেলায় কিন্তু তা থাকে না। ভাষার জন্ম হয় ধীরে ধীরে। এক ভাষা থেকে আরেকটা ভাষার জন্ম হতে শত শত বছর লেগে যায়। এজন্য কোনো ভাষারই জন্ম তারিখ নাই। তাই জন্ম দিন পালন করারও কোনো উপায় নাই।
ভাষার জন্ম দিন না-ই-বা থাকলো। কিন্তু তার বংশ পরিচয় বা শৈশব কৈশোরের কথা কার না জানতে ইচ্ছে হয়। আমাদের এতো যে প্রিয় বাংলা ভাষা আমরা কেনোই বা জানবো না তার বংশ পরিচয়ের কথা, তার শৈশব, কৈশোর দিনগুলোর কথা। আমরা যতো জানবো, ততই আমাদের দরদ বাড়বে আমাদের ভাষার প্রতি।
বাংলা ভাষার বংশ পরিচয় খুঁজতে খুঁজতে আমরা যদি পেছনের দিকে যাই, তা হলে পাবো একটি ভাষা গোষ্ঠীয় পরিচয়। এর নাম ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা। আজ থেকে প্রায় সাত হাজার বছর আগে ছিল এ ভাষার অস্তিত্ব। এ ভাষাগোষ্ঠী থেকেই জন্ম নিয়েছে বর্তমান পৃথিবীর সব ভাষাগুলো। এই ভাষারই একটি শক্তিশালী বংশের নাম ‘শতম’। ‘শতম’ ভাষাগোষ্ঠীর একট অংশের নাম হচ্ছে ইন্দো-ইরানীয় ভাষা। আজ থেকে আনুমানিক চার হাজার পাঁচশ বছর আগে দজলা-ফোরাত নদীর তীরে মেসোপটেমিয়া সভ্যতা নামে যে সভ্যতা গড়ে ওঠেছিল-সেই মেসোপটেমিয়ার লোকেরা এ ভাষায় কথা বলতো। তাদের জীবিকা ছিল পশুচারণ। পশু চরিয়ে তারা জীবিকা নির্বাহ করতো। শত শত বছর এক অঞ্চল বসবাসের কারণে তাদের পশু খাদ্য-ঘাস ফুরিয়ে গেল। নতুন ঘাসের সন্ধানে তারা নতুন নতুন চারণ ভূমির সন্ধানে ছড়িয়ে পড়লো নানান দিকে। মেসোপটেমিয়াবাসীদের এক অংশ একদিন এসে উপস্থিত হলো এই ভারতীয় উপমহাদেশে। এক বসতি ভেঙে আরেক বসতি গড়ে দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে এই উপমহাদেশে আসতে সময় লেগে গেল কম করে হলেও এক হাজার ৩শ’ বছর।
এতো দিনে নানান স্থানে বসবাসের কারণে, প্রকৃতির নানান প্রভাবে তাদের মুখের ভাষারও পরিবর্তন হয়ে যায়। খ্রিস্টপূর্ব ১২০০ সালে ভারত উপমহাদেশে যারা বসতি স্থাপন করেছিল তাদের ভাষার নাম ছিল ভারতীয় আর্য ভাষা। এর আরেক নাম হলো বৈদিক ভাষা। বেদ হচ্ছে ভারতীয় আর্যদের ধর্মগ্রন্থের ভাষা। এই বেদের ভাষাই পরে পন্ডিতেরা সংস্কার করে তৈরি করেছে সংস্কৃত ভাষা। জনগণ যে ভাষায় কথা বলতো তার নাম প্রাচীন কথ্য ভারতীয় আর্য ভাষা। এই প্রাচীন কথ্য ভারতীয় আর্য ভাষা বা জনগণের মুখের ভাষা থেকেই নানান স্তর পেরিয়ে সৃষ্টি হয়েছে আমাদের প্রিয় মাতৃভাষা বাংলা।
কথ্য ভারতীয় আর্য ভাষার পরবর্তী স্তর হচ্ছে ‘প্রাচীন প্রাচ্য ভাষা’। এ থেকে সৃস্টি হয়েছে ‘মাগধী প্রাকৃত ভাষা’। পরে মাগধী প্রাকৃত ভাষা পরিবর্তিত হয়ে সৃষ্টি হয়েছে ‘গৌড়ীয় প্রাকৃত ভাষা এবং ‘গৌড়ীয় অপভ্রংশ ভাষা’।
গৌড়ীয় অপভ্রংশ ভাষা এক সময় হারিয়ে গেছে। রেখে গেছে তার তিনটি সন্তান। এর একটি হচ্ছে বিহারী ভাষা, একটি প্রাচীন উড়িয়া ভাষা এবং অপরটির নাম বঙ্গ-কামরূপী ভাষা। এই বঙ্গকামরূপী ভাষারই সন্তান হচ্ছে আমাদের বাংলা ভাষা।
এভাবেই নানান পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছে আমাদের আজকের বাংলা ভাষা। প্রিয় মাতৃভাষা বাংলাকে আজকের এ পর্যায়ে এসে পৌঁছাতে অনেক প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াই করতে হয়েছে। বৌদ্ধ শাসক পাল রাজাদের পরে যখন এদেশে সেনরা শাসন ক্ষমতায় এসেছিল তখনি বাংলা ভাষাকে শৈশবেই মেরে ফেলার ষড়যন্ত্র হয়েছিলো। কিন্তু মুসলিম শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলা ভাষা আবার নব-জন্ম লাভ করে।
এরপর আরেকবার বাংলা ভাষাকে নিয়ে ষড়যন্ত্র হয় ইংরেজ আমলে। এ সময় সংস্কৃত ভাষার ব্যাকরণ চাপিয়ে দেয়া হয় বাংলা ভাষার ওপর। বলা হয়, বাংলা হচ্ছে ‘সংস্কৃত ভাষার দুহিতা’ বা কন্যা। এ সময় মুসলিম পুঁথি লেখকরা বাংলা ভাষায় সংস্কৃত শব্দের সমাবেশ না ঘটিয়ে জনগণের মুখের ভাষার শব্দ নিয়ে লেখা চালিয়ে যেতে থাকেন। এভাবে এবারও বাংলা ভাষা ষড়যন্ত্রের কবল থেকে রক্ষা পায়।
এরপর ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির কথাতো আমরা সবাই জানি। পাকিস্তানী শাসকরা বাংলার পরিবর্তে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করতে চেয়েছিল। এর বিরুদ্ধে বাংলার সকল মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়ে প্রতিবাদের ঝড় তুলেছিল। অবশেষে সালাম, রফিক, বরকত, জব্বার আরো নাম না জানা শহীদের রক্তের বিনিময়ে আমরা বাংলা ভাষার অধিকার ফিরে পেয়েছি। পরবর্তী পর্যায়ে ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর জাতিসংঘ একুশে ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসাবে ঘোষণা করে।
বাংলাদেশ এখন স্বাধীন দেশ। তাই এদেশের মানুষেরই দায়িত্ব মাতৃভাষাকে সবার ওপরে স্থান দিয়ে গভীর মমতায় এর চর্চা করে বিকশিত করা, এর সমৃদ্ধির জন্য আন্তরিকভাবে কাজ করা।
লেখক :
ড. সাহিদা খানম, প্রভাষক, নর্দান ইউনিভারসিটি, খুলনা।
