প্রধান সূচি

নারী উদ্যোক্তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধি ও চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চ্যালেন্জ মোকাবেলায় বিশ্বব্যাংকের সহায়তার প্রাসঙ্গিকতা

“পৃথিবীতে যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর,
অর্ধেক তার করিয়াছে নারী অর্ধেক তার নর”।- কাজী নজরুল ইসলাম

নারী সৃষ্টির প্রতীক। সৃষ্টির অস্তিত্ব নারী ছাড়া কল্পনায় আনা যায় না। আধুনিক সমাজ-বিজ্ঞানী, প্রত্নতাত্ত্বিক এবং নৃ-তত্ত্ববিদদের মতে, মানব সভ্যতার শুরুতে নারী-পুরুষের অবদান ছিল সমানে সমান। কিছু কিছু ক্ষেত্রে নারীর অবদান বরং বেশিই ছিল। অনুমান করা হয় আগুনের আবিষ্কারক ও ছিল নারী। নারীই প্রথম আগুন ও তাপ দিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে খাদ্য-সংরক্ষণ করতে শিখেছে। বর্তমানে পৃথিবীতে নারীদের অবদান নিয়ে তো রয়েছে অনেকের মুখেই জয়জয়কার।
বাংলাদেশ নারী-পুরুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় উন্নয়নের পথে এগিয়ে চলেছে সমান তালে, সমান গতিতে। দেশের তৃণমূল থেকে শুরু করে জাতীয় উন্নয়নের প্রতিটি ক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে সরকারের নানামুখী পরিকল্পনা ও পদক্ষেপ গ্রহণ, বাস্তবায়নকাজ চলছে। বাস্তবে নারী তার মেধা, যোগ্যতা, দক্ষতা ও শ্রম দিয়ে যুগে যুগে সভ্যতার সব অগ্রগতি এবং উন্নয়নে করেছে সমান অংশীদার।
জাতিসংঘসহ বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা বাংলাদেশের নারী উন্নয়নের ভূয়সী প্রশংসা করছে। জাতিসংঘের এমডিজি অ্যাওয়ার্ড, সাউথ-সাউথ অ্যাওয়ার্ড, প্ল্যানেট ৫০-৫০ চ্যাম্পিয়ন, এজেন্ট অব চেঞ্জ, শিক্ষায় লিঙ্গসমতা আনার স্বীকৃতিস্বরূপ ইউনেসকোর ‘শান্তি বৃক্ষ’ এবং গ্লোবাল উইমেন লিডারশিপ অ্যাওয়ার্ডসহ অসংখ্য আন্তর্জাতিক পুরস্কার অর্জন করেছে বাংলাদেশ। কিছু হতাশা থাকলেও নারীর ক্ষমতায়নে দেশের অর্জন অনেক। হার্ভাড ও ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যৌথভাবে করা ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) জেন্ডার গ্যাপ রিপোর্টে রাষ্ট্র ক্ষমতায় নারীর অবস্থান বিবেচনায় সবাইকে পেছনে ফেলে বিশ্বের এক নম্বরে উঠে আসে বাংলাদেশের নাম। ডব্লিউইএফের হিসাবে নারীর সার্বিক ক্ষমতায়নে ৪৮তম অবস্থানে বাংলাদেশ।
দক্ষতা বাড়িয়ে নারীর শোভন কর্মসংস্থান ও শ্রমশক্তির অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি তাদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে অনুদান ও কারিগরি সহায়তা দেওয়ার জন্য বাংলাদেশ সরকার নানাবিধ কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রায় ১২৯ কোটি টাকা ব্যয়ের একটি প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে । আরো নানাবিধ প্রয়াস চলমান রয়েছে।
বাংলাদেশে মোট উদ্যোক্তার শতকরা ৩১.৬১ শতাংশ নারী। নারী উদ্যোক্তা তৈরির ক্ষেত্রে বিশ্বের অন্য অনেক দেশের তুলনায় এগিয়ে আছে বাংলাদেশ। পরিবার, আর্থ-সামাজিক অবস্থান, ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ, পারস্পরিক সহযোগিতা, আর্থিক সহায়তা এবং ব্যবসায়িক পরিবেশের নানা চ্যালেঞ্জ থাকা স্বত্ত্বেও নারী উদ্যোক্তারা দৃঢ়তার সঙ্গে তাদের ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন।
বিভিন্ন সূত্র মোতাবেক, নারী উদ্যোক্তার এই বিপুল সম্ভাবনা শুধু শহর কেন্দ্রিক নয়। প্রত্যন্ত অঞ্চলেও দেখা মেলে হাজার হাজার নারী উদ্যোক্তার। যারা সাফল্যের সঙ্গে এগিয়ে যাচ্ছেন এবং গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে।
এই ডিজিটাল যুগে নারীরা কোনভাবে পিছিয়ে নেই। পুরুষদের সাথে তাল মিলিয়ে তারাও বিভিন্নভাবে সফলতা অর্জন করছে এবং এগিয়ে যাচ্ছে। বর্তমান যুগে মেয়েদের মধ্যে আত্মনির্ভরশীল হওয়ার প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। আর তাই নিজের একটি ব্যবসা শুরু করার মাধ্যমে অনেক নারীই হয়ে উঠছেন উদ্যোক্তা। বাংলাদেশে সরাসরি কিংবা অনলাইন- দু ধরণের ব্যবসাতেই নারী উদ্যোক্তার সংখ্যা অনেক বাড়লেও উদ্যোক্তারা বলছেন নারী হিসেবে ব্যবসা করা কিংবা ব্যবসা সম্প্রসারণ করার ক্ষেত্রে প্রতিনিয়ত বাধাও বাড়ছে। সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সীমাবদ্ধতা এবং লিঙ্গ বৈষম্য উদ্যোক্তা হওয়ার পথে একটি বড় চ্যালেঞ্জ বা প্রতিবন্ধকতা ।
নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে পুজি হিসেবে লোন বা অনুদান নেয়া খুব একটা সহজ বিষয় নয়। এক্ষেত্রে আর্থিক সচ্ছলতার অভাবও একটি বড় প্রতিবন্ধকতা।
ব্যবসায়িক প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা অর্জন করার জন্য বাংলাদেশের প্রশিক্ষণ কর্মসূচি গুলো খুবই সীমিত যা সফলভাবে ব্যবসা শুরু এবং পরিচালনার ক্ষেত্রে বাধা। অধিকাংশ ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো পুরুষ কেন্দ্রিক হওয়ায় নারীদের নেটওয়ার্কিং এবং মেন্টরশীপের সুযোগ খুবই সীমিত যা উদ্যোক্তা হওয়ার পথে অন্তরায়।
পরিবার ও ব্যবসায়িক দায়িত্বের ভারসাম্য বজায় রাখা নারী উদ্যোক্তাদের জন্য একটি উল্লেখযোগ্য প্রতিবন্ধকতা যা তাদের ব্যবসায় মনোযোগ এবং কাজ করার ক্ষমতার উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। শহরাঞ্চলে নারীরা শিক্ষা ক্ষেত্রে এগিয়ে থাকলেও গ্রামাঞ্চলে নারীদের নিরক্ষরতার হার বেশি যা উদ্যোক্তা হওয়ার পথে অনেক বড় একটি বাধা।
জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রাকৃতিক দুর্যোগ বিবেচনায় পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান সপ্তম। সব প্রাকৃতিক দুর্যোগই সাময়িক অথবা দীর্ঘ সময়ের জন্য মানবিক বিপর্যয় ডেকে আনে। বাংলাদেশে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ফলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কষ্ট ও জীবনসংগ্রামের বিষয়ে আমরা সবাই অবগত। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, জলবায়ু সংকটের কারণে স্থানচ্যুত হওয়া মানুষের ৮০ শতাংশই নারী। সংঘাত ও সংকট – যেমন কোনো প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের পরে বা পানির অভাব ও ফসলহানির প্রভাবে গণ-অভিবাসনের সময় অভিবাসনের যাত্রাপথ ও শরণার্থী শিবিরসহ বিভিন্ন জায়গায় নারী ও মেয়েরা জেন্ডার-ভিত্তিক সহিংসতার মুখোমুখি হওয়ার বৃহত্তর ঝুঁকিতে থাকেন।
নারী ও মেয়েরা জলবায়ু উদ্যোগে নেতৃত্ব দিচ্ছেন ও পরিবর্তন আনছেন। জলবায়ু সংকট মোকাবিলা এবং জেন্ডার সমতা অর্জন একে অপরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সেক্ষেত্রে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুকি হ্রাস ও নারীদের সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য নারী নেতৃত্ব ও নারী উদ্যোক্তা সৃস্টির মাধ্যমে বাংলাদেশে সমতা ভিত্তিক সমাজ গঠন করা সম্ভবপর হবে বলেই গবেষকরা মতামত প্রদান করেছে। তবে বাংলাদেশে নারীদেরকে সক্ষম জনগোষ্ঠী হিসেবে তৈরী করার জন্য সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বাধা যেমন রয়েছে ঠিক তেমনি অর্থনৈতিক চ্যালেন্জ ও অনেক বেশী অন্তরায় হিসাবে কাজ করছে।
চতুর্থ শিল্প-বিপ্লবের প্রভাবে নারীরা সমাজের চালকের আসনে বসবে। নারীরা ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে আরোহন করতে পারবে যার জন্য নারীদেরকে সক্ষম জনগোষ্ঠীতে রূপান্তর করতে হবে। নারীরা সৃজনশীল, কষ্ট সহিষ্ণু, তারা মননশীল তারা প্রতিকূলতাকে জয় করতে জানে। আগামীর বিশ্বে যে জ্ঞান বিজ্ঞানের জয়জয়কার সূচিত হবে, সেখানে পুরুষতান্ত্রিক ইতিহাসের জাল ভেদ করে নারীর জন্য একটি বৈষম্যহীন পৃথিবী উপহার দিতে পারবে। তবে নারীর এই অগ্রযাত্রার থেকে অবরুদ্ধ ও সংকোচিত করা যাবে না, পুরুষদের সহমর্মিতা ও সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে হবে নারীর কল্যাণে।
বাংলাদেশের উন্নতি এবং সমৃদ্ধির লক্ষ্যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনা একাধিক পদক্ষেপ নিয়েছেন যার মধ্যে নারীদের অর্থ-সামাজিক উন্নয়ন গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বিশ্বব্যাংকের সহায়তা অনুরোধ করেছেন এবং বাংলাদেশের নারীদের উদ্যোগের জন্য বিশেষ তহবিল প্রদানের প্রস্তাব করেছেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে প্রকাশিত হয়েছে যে, বাংলাদেশে নারীদের উদ্যোগের উন্নতি এবং অর্থনৈতিক স্বাধীনতা সম্পন্ন করা গুরুত্বপূর্ণ। এ উন্নতির সাথে নারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণের জন্য বিশেষ পরিকল্পনা অনন্য গুরুত্ব অর্জন করেছে।
বিশ্বব্যাংকের সহায়তা নারীদের উদ্যেক্তা পরিবেশ সৃষ্টিতে একটি মাইল ফলক হিসাবে কাজ করতে পারে। এই ধারণার আলোকে, বাংলাদেশের নারীদের অর্থ-সামাজিক উন্নয়নের জন্য বিশেষ তহবিল যেতে পারে নারীদের প্রতিষ্ঠান পরিচালনা, দক্ষতা বৃদ্ধি ও প্রশিক্ষণের জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে। সূদুর ভবিষ্যতে নারী নিজে উদ্যোক্তা হয়ে অন্যের কর্মসংস্থান তৈরিতে যেমন ভূমিকা রাখতে পারবে ঠিক তেমনি নারী উদ্যোক্তাদের সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা আরও জোরালো হতে সহায়তা করবে। এর ফলে ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ এসডিজি লক্ষ্যমাত্রা অর্জন এবং ২০৪১ সালের মধ্যে জেন্ডার সমতাভিত্তিক এক উন্নত-সমৃদ্ধ বিশ্বে প্রবেশের মাধ্যমে আর্থসামাজিক কার্যক্রমে নারীর পূর্ণ অংশগ্রহণ এবং নারীর ক্ষমতায়নে বাংলাদেশ মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত হতে পারবে।

লেখকঃ অমিত দত্ত, প্রভাষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ,
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়।

Please follow and like us:





উত্তর দিন

Wordpress Social Share Plugin powered by Ultimatelysocial