ধেয়ে আসছে ঘূর্ণিঝড় ‘মোখা’ : আতঙ্কে পিরোজপুরের নদী পাড়ের বাসিন্দারা
দেশের যে কোনো প্রাকৃতিক দূর্যোগ আসলে দক্ষিণ উপকূলের ক্ষতিগ্রস্থ জেলাগুলোর মধ্যে অন্যতম তালিকায় থাকে পিরোজপুর জেলা। তাই ঘর্ণিঝড় বা সিডরের নাম শুনলেই চরম আতঙ্কে থাকে নদী পাড়ের বাসিন্দারা।
সম্প্রতি ঘর্ণিঝড় সিত্রংয়ের ক্ষতি কাটিয়ে উঠার আগেই প্রবল শক্তি নিয়ে ধেয়ে আসছে ঘূর্ণিঝড় ‘মোখা’। ক্ষতিগ্রস্থ মানুষের দাবি স্থায়ী ভেরিবাধ নির্মাণ না করায় এসব প্রাকৃতিক দূর্যোগে নদী গর্র্ভে বিলিন হচ্ছে শতশত ঘরবাড়ি। এতে গৃহহীণ হয়ে পড়ছে জেলার কয়েক হাজার পরিবার। তবে ঘর্ণিঝড় ‘মোখা’র হাত থেকে রক্ষায় ইতিমধ্যে ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে জেলা প্রশাসন।
সন্ধ্যা, কালিগঙ্গা, বলেশ^র ও কঁচা নদীবেষ্টিত উপকূলীয় জেলা পিরোজপুর। সাগরের খুব কাছাকাছি জেলা হওয়ায় সাগরে সৃষ্ট বেশির ভাগ ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাব পড়ে এ জেলায়। প্রাকৃতিক দূর্যোগ থেকে পিরোজপুর জেলা রক্ষায় মোট ৩৪৯ কিলোমিটার ভেরিবাধ নির্মাণ করা হয়, যা পর্যপ্ত নয়। আবার ভেরিবাধগুলোর বেশির ভাগই রয়েছে ভাঙ্গা ও ঝুকিঁপূর্ণ অবস্থায়। যা দিয়ে প্রতিনিয়তই লোকালয়ে ঢুকছে পানি।
পিরোজপুরের কাউখালী উপজেলার সন্ধ্যা ও কালিগঙ্গা নদীতে কোনো ভেরিবাধ না থাকায় চরম আতঙ্কে আছে প্রায় ৩০টি গ্রামের বাসিন্দারা। তাদের দাবি বারবার ভেরিবাধের দাবি জানালেও সুফল মেলেনি গত ৩০ বছরেও। ঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে বারবার ভাঙ্গছে নদী। স্থায়ী ভেরিবাধ না থাকায় প্রতিবারই ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে দূর্যোগ কবলিত মানুষ। ঘূর্ণিঝড় ‘মোখা’র আগমনী বার্তায় চরম উৎকন্ঠায় উপকূলবাসী। দুর্যোগ কবলিত মানুষ আগ্রাসী ভাঙ্গনে গত ৫০ বছরে চোখের সামনে বিলিন হতে দেখেছে রাস্তাঘাট বসতঘর, ফসলি জমিসহ কোটি কোটি টাকার সম্পদ। কাউখালী উপজেলার একটা বড় অংশ রয়েছে বেড়িবাঁধের বাইরে। যার ফলে ঘূর্ণিঝড় মোখার সময় যত ঘনিয়ে আসছে, এসব গ্রামের মানুষের আতঙ্ক ততো বাড়ছে।
বিশেষ করে বেকুটিয়া, সোনাকুর, সুবিদপুর, আমরাজুড়ি, গন্ধর্ব, হোগলা, সয়না, রগুনানাথপুর, বেতকা, জোলাগাতি সহ বেশকিছু এলাকা ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এসব এলাকা জলোচ্ছ্বাস থেকে রক্ষার জন্য যেমন বাঁধ নেই, তেমনি যাতায়াতের ব্যাবস্থা উন্নত নয়। যার ফলে যেকোন দুর্যোগে এসব এলাকার মানুষের জানমালের ক্ষয়ক্ষতি বেশি হয়ে থাকে।
হোগলা গ্রামের গিয়াস উদ্দিন বলেন, নদী ভাঙ্গনে আস্তে আস্তে বাপ-দাদার সব সম্পত্তি হারিয়েছি। এখন সামান্য জোয়ারের পানিতে জমিসহ ঘর বাড়ি তলিয়ে য়ায়। আর ঝড় বন্যার সময় ৫ থেকে ৬ ফুট পানি ঢুকে গ্রামের ঘর বাড়ি গাছপালা বিনস্ট করে দিয়ে যায়। আমরা সব সময় আতঙ্কে থাকি।
আমরাজুড়ি ইউনিয়ন পরিষদের ইউপি সদস্য ইন্দ্রজিত কুন্ডু বলেন, সোনাকুর গ্রামের অধিকাংশ সন্ধ্যা নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। আমাদের গ্রাম নদীর পাশে থাকলেও আমাদের এখানে কোনো বাঁধ নেই। প্রতিবছরই জোয়ারের পানিতে আমাদের ডুবতে হয়। বিশেষ করে আষাঢ়-শ্রাবণ মাসে হাঁটু সমান পানি উঠে যায় সব জায়গায়। স্থানীয়রা মিলে যে বাঁধ দেই, তা পানির চাপ বাড়লেই ভেঙে যায়।

পিরোজপুরের ইন্দুরকানীতে ঘূর্ণিঝড় ‘মোখা’র আশঙ্কায় আকঙ্কিত কঁচা ও বলেশ^র নদীর তীরবর্তী কয়েক হাজার পরিবার। কঁচা ও বলেশ^র নদীর তীরবর্তী পিরোজপুরের উপকুলবর্তী ইন্দুরকানী উপজেলার ২৫ কিলোমিটার বেড়িবাঁধের মধ্যে অধিকাংশই ঝুঁকিপূর্ণ। এই উপজেলার তিন দিক থেকে নদী বেষ্টিত হওয়ায় হাজার-হাজার পরিবারের বসতি রয়েছে নদী তীরবর্তী এলাকায়। প্রায়ই ভাঙ্গনে বিলীন হচ্ছে বসতবাড়ী ও স্থাপনা। বেড়িবাঁধ না থাকায় অর্ধ-লক্ষাধিক মানুষ ঝুঁকিতে রয়েছেন।
ইন্দুরকানী উপজেলার কঁচা নদী তীরবর্তী কালাইয়া গ্রামের রবিন বেপারী বলেন, ‘রাতে জোয়ার আইলেই আর ঘুম আয় না। বেড়িবাঁধ না থাকায় ঘর পানিতে ডুইব্বা যায়। মোরা সরকারের চাইল-ডাইল চাই না, শক্ত বেড়িবাঁধ চাই।’
এ বক্তব্য নদী তীরবর্তী বাসিন্দাদের সবার। তারা ত্রাণ চায় না, চায় টেকসই বেড়িবাঁধ। বিগতদিে ঘূর্ণিঝড় সিডর, আইলা, আম্পান, ইয়াস এর সময় প্রবল জলোচ্ছ্বাসে এ উপজেলার কঁচা ও বলেশ^র ও নদীর তীরের একাধিক স্থান থেকে বেড়িবাধ ভেঙ্গে বিলীন হয়ে যায়। ২০০৭ সালে সুপার সাইক্লোন সিডরে বেড়িবাঁধ ভেঙ্গে পানি ঢুকে এ উপজেলার ৭২ জনের প্রাণহানি ঘটে। মাঝে মাঝে বেড়িবাঁধ নামমাত্র মেরামত করা হলেও তা আবার প্রবল স্রোতে বিলীন হয়ে যায়। কিন্তু তারপরও টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মানের কোন ব্যবস্থা না করায় এ উপজেলার নদী তীরবর্তী অর্ধলক্ষ লোক সীমাহীন ঝুঁিকতে রয়েছে। গতবছর কিছুদিন আগে টগড়া পয়েন্টের আংশিক বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা হলেও অধিকাংশ বাঁধই বিধ্বস্ত রয়ে গেছে। নদী তীরবর্তী বাসিন্দারা প্রাকৃতির সাথে লড়াই করে ঝড় বৃষ্টি মাথায় নিয়ে টিকে থাকতে চায়।
উপজেলার কঁচা নদীর তীরবর্তী কালাইয়া, টগড়া, সাইদখালী, বালিপাড়া, চরবলেশ^র, কলারণ, খোলপটুয়া, চন্ডিপুরসহ একাধিক স্থানের বেড়িবাধ বিলীন হয়ে যাওয়ায় ওই গ্রামগুলো স্বাভাবিক জোয়ারেই ডুবে যায়। ভাটায় পানি নেমে গেলে তাদের স্বাভাবিক কাজকর্ম করতে হয়।
উপজেলার সবচেয়ে বেশী ক্ষতিগ্রস্থ টগড়া গ্রামের মজিবুর রহমান বলেন, ‘বন্যার পানিতে মোর ঘরের পোতা এক্কালে ধুইয়া লইয়া গেছে। চুলাও নাই। গঙ্গের পাশে বান না থাহায় পানিতে সব লইয়া যায়। আমরা কোন সাহায্য চাই না চাই বেড়িবাঁধ।’
কঁচা ও বলেশ^র নদীর তীরবর্তী পাড়েররহাট ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. কামরুজ্জান শাওন তালুকদার বলেন, পানি উন্নয়ন বোর্ড থেকে কয়েকবার পরিদর্শনে এসেছে। কিন্তু এই এলাকায় টেকসই বেড়িবাঁধের কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। বেড়িবাঁধ না থাকায় এই এলাকার বাসিন্দারা আতঙ্কে রয়েছে।
পিরোজপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মাহবুবে মাওলা মো. মেহিদী হাসান জানান, ইন্দুরকানী উপজেলার তিন দিকে নদী। কঁচা নদীর তীরবর্তী বিলীন হওয়া বেড়িবাঁধের টগড়া প্রান্তের আংশিক নির্মাণ হয়েছে। অন্য বেড়িবাঁধের জন্য উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করা হয়েছে। বরাদ্দ পেলে নির্মাণ করা হবে।
ইন্দুরকানী উপজেলা নির্বাহী অফিসার লুৎফুন্নেসা খানম জানান, ঘূর্ণিঝড় মোখা মোকাবেলায় সতর্ক রয়েছি। বিভিন্ন এলাকার আশ্রায়ন কেন্দ্রগুলো প্রস্তত করে রাখা হয়েছে। সেচ্ছাসেবক সংগঠনগুলোকে প্রস্তুত রাখা হয়েছে। দুর্যোগ মোকাবেলার জন্য সভা করা হয়েছে।
এদিকে, ঘূর্ণিঝড় মোখা’র আগমনি বার্তা জনমনে জানিয়ে দিতে মাঠ পর্যায়ে নামছে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, রেডক্রিসেন্টসহ বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থা।
পিরোজপুর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহেদুর রহমান জানিয়েছেন, জেলায় ২৬১টি ঘূর্ণিঝড় আশ্রয় কেন্দ্র, ১৭০০ সিপিপি সদস্য, ৩২০ জন রেডক্রিসেন্ট স্বেচ্ছাসেবক, ৬৪টি মেডিকেল টিম প্রস্তুত রাখা হয়েছে। ঘূর্ণিঝড় মোকাবেলায় দুর্যোগকালীন ও দুর্যোগ পরবর্তী তৎপরতা চালানোর জন্য প্রস্তুতি রয়েছে।
