প্রধান সূচি

মোড়েলগঞ্জে আমন ধানের চারার সংকট

বাগেরহাটের মোড়েলগঞ্জ উপজেলায় আমন ধান চাষের মওসুম শেষ পর্যায় পৌঁছালেও ধানের চারা অতিবর্ষণে পানিতে তলিয়ে পঁচে নষ্ট হয়ে গেছে। এতে করে আমন চারার চরম সংকট দেখা দিয়েছে। ফলে মোড়েলগঞ্জ উপজেলার অধিকাংশ কৃষক দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। চারা সংকটের কারণে এবার এ অঞ্চলে অনেক জমি অনাবাদি থাকবে বলে কৃষকরা আশংকা প্রকাশ করেছেন।
সংশ্লিষ্ট সুত্র জানায়, বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপ ও পূর্ণিমার জোয়ারের প্রভাবে প্রবল বৃষ্টিতে বাগেরহাটের মোড়েলগঞ্জ উপজেলার ১৬টি ইউনিয়নসহ পৌরশহরের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়। পানিবন্দি হয়ে পড়ে উপজেলার ১০ হাজার মানুষ। পানিতে তলিয়ে যায় পুকুর-ঘের। অবিরাম বৃষ্টিতে ফসলি জমি, বীজতলা, আমন ধান, সবজি, পানসহ বিভিন্ন ফসল পানিতে নিমজ্জিত হয়ে পড়ে। পানি নিষ্কাশনের পর দৃশ্যমান হতে থাকে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয় আমনের বীজতলা। বীজতলা পঁচে ও নষ্ট হয়ে যাওয়ায় নতুন করে দেখা দিয়েছে বীজ সংকট।
উপজেলার প্রায় ১৫০ হেক্টর আমন বীজতলা নষ্ট হয়ে গেছে। ফলে চাষিদের প্রায় ২ কোটি টাকার রোপা আমন মৌসুমের বীজতলা নষ্ট হয়ে গেছে। টানা বর্ষণে বহরবুনিয়া, হোগলাবুনিয়া, পঞ্চকরণ, তেলিগাতি, বারইখালী, বলইবুনিয়া, খাউলিয়া ইউনিয়নের বড়পরী এলাকা, মোড়েলগঞ্জ সদর, নিশানবাড়িয়া ও জিউধরায় অতিরিক্ত পানিতে ৮ হাজার মৎস্য ঘের পানির নিচে তলিয়ে গেছে। মৎস্য ঘেরের ভেরি ধ্বসে গিয়ে বের গেছে বাগদা, গলদাসহ বিভিন্ন প্রজাতির সাদামাছ। এতে ঘের ব্যবসায়ীরা লাখ লাখ টাকার ক্ষতির সম্মুখিন হয়ে পড়েছে। এতে চাষিদের প্রায় ৬ কোটি টাকার মাছ ভেসে গেছে। বিস্তীর্ণ এলাকার বিল ও মাঠ ঘাট বৃষ্টির পানিতে একাকার হয়ে গেছে। এতে করে কৃষকের স্বপ্ন চলতি আমন মৌসুমের বীজতলা নষ্ট হয়ে গেছে। বীজ ধানও মিলছে না। ধান রোপন করতে পারবে কিনা তা নিয়ে সন্দেহ দেখা দিয়েছে কৃষকরা। তবে স্থানীয় কৃষি অফিসের মাধ্যমে তাদেরকে হতাশ না হওয়ার জন্য পরামর্শ প্রদান করা হয়েছে।
এলাকাবাসির সাথে কথা বলে জানা গেছে, বেশিরভাগ জায়গায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের স্লুইজ গেটগুলো অকেজো থাকায় ঠিকমতো পানি নিস্কাশন হচ্ছে না। অর্ধ শতাধিক জলমহলের ইজারা গ্রহিতারা যত্রতত্র নেট পাটা দিয়ে মাছ ধরার কারণে বিল খালের পানি নিস্কাশন বাঁধাগ্রস্ত হচ্ছে। বিল ও খালের খাস জমিতে বহু মানুষ ঘরবাড়ি বানিয়ে বসবাস করছে এবং চলাচলের জন্য ছোট ছোট রাস্তা নির্মাণ করায় পানি আটকে জলাবদ্ধতার চরম সৃষ্টি হয়েছে। এখনও মোড়েলগঞ্জের অধিকাংশ জায়গায় বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ বহরবুনিয়া, হোগলাবুনিয়া, পঞ্চকরণ, তেলিগাতি, বারইখালী, বলইবুনিয়া, মোরেলগঞ্জ সদর, নিশানবাড়িয়া ও জিউধরায় জিউধরা, বহরবুনিয়া বটার খাল, ডেনাতলা, উত্তর ফুলহাতা মাঝের খাল, নোনা খাল, শনিরজোর, কাজি মার্কেটের খাল, ঘষিয়াখালী কবিরাজবাড়ি খালসহ বিভিন্ন ইউনিয়নে সরকারি রেকর্ডীয় খালগুলোতে বাঁধ সৃষ্টি করায় পানি চলাচল বন্ধ হয়ে পড়েছে। এ বাঁধগুলো অতি দ্রুত অপসারণ করে জলাবদ্ধতার হাত থেকে রক্ষা করার জন্য প্রশাসনের প্রতি জোর দাবি জানিয়েছেন। এলাকার বিলের পানি নিস্কাশন বাঁধাগ্রস্থ হওয়ায় জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। ফলে এলাকার হাজার হাজার পরিবার চরম দুর্ভোগের পড়েছে। শত শত মাছের ঘের পানিতে তলিয়ে গিয়ে চাষীরা পড়েছেন ক্ষতির মুখে।
মোড়েলগঞ্জ উপজেলার বহরবুনিয়া ইউনিয়নের ফুলহাতা গ্রামের কৃষক রাকিব হাসান বলেন, ৬ বিঘা জমির বীজতলা সবই নষ্ট হয়ে গেছে। আমাদের এলাকায় মাছ এবং এক ফসলী আমন ছাড়া তেমন কিছুই হয়না। নতুন করে চাষের জন্য অনেক জায়গায় ঘুরেও একমুঠো বীজ পাইনি। এই ক্ষতি কিভাবে পুশিয়ে উঠবো তাই ভেবে পাচ্ছি না।
খাউলিয়া ইউনিয়নের বড়পরী বাসিন্দা মোসলেম আলী শেখ জানান, আমার জমির বীজতলা সবই নষ্ট হয়ে গেছে, এখন বীজ পেতে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। একই এলাকার মো. বাদল মাঝি জানান, ভেড়িবাঁধের অভ্যন্তরে কয়েকদিন পানি আটকে পড়ে আমার মাছের ঘের, সবজি ক্ষেত, বীজতলা ভেসে যাওয়ায় কয়েক লক্ষ টাকার ক্ষতি ক্ষয়-ক্ষতি হয়েছে। স্থানীয় ফখরুল ইসলাম হতাশা প্রকাশ করে জানান, আমিসহ এখানকার আরও কয়েকজনের মাছের ঘের, ক্ষেত-খামার, বীজতলা নষ্ট হয়ে গেছে।
মোড়েলগঞ্জ উপজেলার ভাই ভাই স্টোরের মালিক বীজ ধানের ডিলার সুখদেব হালদার জানান, আমাদের এ বছর চাহিদা ছিল ১০ টনের মত বীজ। কিন্তু আমরা বরাদ্দ পেয়েছি মাত্র সাড়ে তিন টন বীজ ধান। সম্প্রতি বৃষ্টিতে বীজধান নষ্ট হয়ে যাওয়াতে আমাদের কাছে অনেক কৃষক এসেছেন। কিন্তু আমরা কাউকে বীজ দিতে পারছি না।
মোড়েলগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এম এমদাদুল হক জানান, বৃষ্টির পানিতে বীজতলাগুলো নষ্ট হয়ে গেছে। ফলে উপজেলা জুড়ে সকল কৃষকরা এখন হতাশায় রয়েছেন। নতুন করে চাষাবাদের জন্য বীজধান সংগ্রহসহ কৃষকদের দ্রুত সরকারি সহায়তার দাবী জানান তিনি।
মোড়েলগঞ্জ উপজেলা ভারপ্রাপ্ত কৃষি অফিসার মো. সিফাত-আল-মারুফ বলেন, এ বছর মোড়েলগঞ্জে ১৫০ হেক্টর জমিতে আমন ধান রোপনের জন্য লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। ২৭ থেকে ৩০ তারিখ পর্যন্ত ভারী বর্ষণ ও জোয়ারের পানিতে বীজতলা নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি শাক সবজি ডুবে কৃষকের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। কৃষকদের জন্য বিভিন্ন প্রজাতির ধানের বীজ যাতে সংকট না পড়ে তার জন্য উর্ধ্বতন কৃর্তপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে। এছাড়া কৃষকেদের বিভিন্ন পরামর্শ প্রদান করা হচ্ছে।
সরকারি বীজ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান বিএডিসি (বীজ) এর বাগেরহাট কার্যালয়ের সহকারি প্রশাসনিক কর্মকর্তা আকলিমা খাতুন বলেন, কৃষকদের চাহিদা অনুযায়ী আমাদের ৫০ টন বীজ বরাদ্দ ছিল। আমরা ৫০ টনেরও কিছু বেশি বীজ এই মৌসুমে কৃষকদের সরবরাহ করেছি। কিন্তু এখন নতুন করে আর বরাদ্দের সুযোগ নেই।
বাগেরহাট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ মো. শফিকুল ইসলাম জানান, ২৭ থেকে ৩০ তারিখ পর্যন্ত ভারী বর্ষণ ও জোয়ারের পানিতে জেলায় এক হাজার ৫৮৮ হেক্টর রোপা আমনের বীজতলা নষ্ট হয়েছে। ৯৬০ হেক্টর জমির আউশ ধান ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে।
গ্রীষ্মকালীন সবজির ক্ষতি হয়েছে ৩৭৯ হেক্টর জমির। সাড়ে ১০ হেক্টর জমির পান বরজ ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। এতে ২০ হাজার ২০৩ জন কৃষকের ৫ কোটি ৬৫ লাখ তিন হাজার টাকার ক্ষতি হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, বীজতলা নষ্ট হয়ে ক্ষতিগ্রস্থ চাষীদের তালিকা তৈরি করে উর্ধতন কর্তৃপক্ষকে পাঠানো হয়েছে। সরকারী সহায়তা আসলে কৃষকদের দেওয়া হবে। পাশাপাশি ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে আমরা কৃষকদের নানা পরামর্শ দিচ্ছি। এছাড়া বীজ ধানের সংগ্রহের বিষয়ে আমরা কাজ করছি।
এ বিষয়ে পাউবো বাগেরহাটের নির্বাহী প্রকৌশলী বিশ্বজিৎ বৈদ্য জানান, মোড়েলগঞ্জসহ উপকূলীয় এলাকার জলাবদ্ধতা নিরসনে একটি বড় প্রকল্প শীঘ্রই একনেকে উঠবে। এটি অনুমোদন পেলে নতুন নতুন স্লুইজগেট নির্মাণ ও পুরোনো স্লুইজগেটগুলো সংস্কার করে জলাবদ্ধতা দূর করা সম্ভব হবে।

Please follow and like us:





উত্তর দিন

Wordpress Social Share Plugin powered by Ultimatelysocial