শ্রীমঙ্গলে পাহাড়ের ভাজে ভাজে সৌন্দর্য্যরে মূর্ছনা
ভ্রমণ পিপাসুদের সৌন্দর্য্যের হাতছানি দিচ্ছে দুটি কুঁড়ি একটি পাতার দেশ মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল উপজেলা। পর্যটন মৌসুম হওয়াতে এখন ভ্রমণ পিয়াসুদের আকর্ষণীয় স্থান হয়ে উঠেছে শ্রীমঙ্গল। চায়ের রাজধানী খ্যাত সিলেটের শ্রীমঙ্গল আপনাকে প্রথমেই মুগ্ধ করবে ছোট বড় পাহাড়ের টিলায় চায়ের বাগান।
বাংলাদেশের উত্তর-পূর্ব প্রান্তে অবস্থিত এ উপজেলাটিতে রয়েছে সৌন্দর্যের অসংখ্য নিদর্শন। এ উপজেলায় চা বাগান ছাড়াও আকর্ষণীয় উল্লেখযোগ্য স্থানের মধ্যে রয়েছে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, হাম হাম ঝর্ণা, মাধবকুন্ড জলপ্রপাত, মাধবপুর লেক ও বাইক্কা বিল।
তবে প্রকৃতি প্রেমীদের মতে শ্রীমঙ্গলের পাহাড়ের ভাজে ভাজে রয়েছে অপার সৌন্দর্যের লীলাভূমি। রাজধানী ঢাকা থেকে প্রায় দুই শত কিলোমিটার দূরত্বে ভারত সীমান্তের কাছাকাছি দেশের উত্তর পূবাঞ্চলীয় সিলেট বিভাগের মৌলভীবাজার সদর জেলা থেকে ২০ কিলোমিটার দক্ষিণে শ্রীমঙ্গল উপজেলা। সাধারণত অন্যান্য দিনের চেয়ে ছুটির দিনগুলোতে পর্যটন মুখরিত হয়ে উঠে এ উপজেলাটি। শ্রীমঙ্গল শহরের প্রাণকেন্দ্রে প্রবেশের মুখে আপনি দেখতে পাবেন ছোট বড় পাহাড়ের টিলায় চা বাগানের মধ্য থেকে আঁকা বাঁকা রাস্তা।
চা শিল্পের জন্য শ্রীমঙ্গলের পরিচিতি দেশব্যাপী। প্রকৃতি প্রেমীরা শ্রীমঙ্গলের পরতে পরতে চা বাগানের এ সৌন্দর্যে বেশি আকর্ষিত হয়। এছাড়াও পাহাড়, অরণ্য, হাওড় আর সবুজ চা বাগান ঘেরা নয়নাভিরাম দৃশ্য আর অপূর্ব সৌন্দর্যমন্ডিত নৈসর্গিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি শ্রীমঙ্গল। আকর্ষিত পাহাড়ে চা বাগান ছাড়াও আনারস আর লেবু চাষ করা হয়ে থাকে। যা এখানকার কৃষিজীবী মানুষদের একটা বড় আয়ের উৎস।
শ্রীমঙ্গলের বিস্তীর্ণ পাহাড়ী অঞ্চলের বসবাসরত স্বতন্ত্র সত্ত্বার উপজাতি জনগোষ্ঠী খাসিয়া, মণিপুরি, টিপরা ও গারোদের জীবনাচর, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সাধারণ বাঙালীর থেকে ভিন্ন। 
যেভাবে যাবেন :
ঢাকা থেকে বাসে অথবা ট্রেনে শ্রীমঙ্গল যাওয়া যায়। এছাড়া চট্টগ্রাম থেকেও বাসে অথবা ট্রেনে সরাসরি শ্রীমঙ্গল যাওয়া যায়। ঢাকা থেকে শ্রীমঙ্গল বাসে যেতে দুরত্ব ৪ ঘন্টা ৩০ মিনিট। তবে রাস্তায় যানজট থাকলে আরও বেশি সময় লাগতে পারে। ঢাকা থেকে শ্রীমঙ্গলে বাসে যেতে জনপ্রতি ভাড়া ৩৮০ টাকা থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত। এদিকে ঢাকার কমলাপুর থেকে প্রতিদিন ট্রেন ছেড়ে যায় শ্রীমঙ্গলের উদ্দেশ্য।
কোথায় উঠবেন :
পর্যটন এলাকা হওয়ায় শ্রীমঙ্গলে অনেক হোটেল, কটেজ, রিসোর্ট রয়েছে। মান ও সৌন্দর্যের কথা চিন্তা করে কটেজগুলোকে ছোট পাহাড়ের টিলায় করা হয়েছে। যাতে করে ভ্রমণপ্রেমীরা সাচ্ছন্দে প্রকৃতির সান্নিধ্য উপভোগ করতে পারেন। এক্ষেত্রে মাঝারি রিসোর্টগুলোতে ডাবল রুমের ভাড়া পড়বে ২ থেকে ৫ হাজার টাকা এবং সিঙ্গেল রুমের ভাড়া পড়বে ১ হাজার টাকা থেকে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত। শ্রীমঙ্গল শহর থেকে প্রায় তিন-চার কিলোমিটর উত্তর-পূর্বে গেলে পাহাড়ের টিলায় ও গ্রামীণ পরিবেশে ছোট বড় অনেক রিসোর্ট ও কটেজে রুম ভাড়া পাওয়া যাবে।যেসব জায়গায় ঘুরে দেখতে পারেন :
শ্রীমঙ্গলের সৌন্দর্য উপভোগ করতে হলে আপনাকে সময় নিয়ে আসতে হবে। পরিবারসহ কিংবা বন্ধু-বান্ধব নিয়ে আসলে প্রথমেই আপনাকে একটি অটোরিক্সা বা সিএনজি রিজার্ভ করতে হবে। সারাদিনের জন্য একটি অটোরিক্সা অথবা সিএনজি ভাড়া পড়বে ১৫শ’ টাকা থেকে দুই হাজার টাকা। দ্রুত সময়ে সবকিছু ঘুরে দেখতে হলে আপনাকে সিএনজি ভাড়া করতে হবে। শ্রীমঙ্গলের আশে পাশে চা বাগানগুলো ঘেরা।
লাল টিলা :
শ্রীমঙ্গল শহর থেকে একটু অদূরে ‘ফিনলে টি স্টেট’ এর ভেতর থেকে চার কিলোমটির দূরে আপনি লাল টিলায় যেতে পারেন। সমতল থেকে প্রায় ১০ ফুট উচুঁ লাল টিলার উপরে হিন্দু ধর্মালম্বীদের একটি তীর্থস্থান ও মন্দির রয়েছে। টিলায় উঠার জন্য পাহাড় কেটে রাস্তা বানানো হয়েছে। লাল টিলার উঁচুতে দাড়িয়ে আশেপাশের সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারবেন।
বাইক্কা বিল :
মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গলের হাইল হাওড়ের পূর্ব দিকের প্রায় ১০০ হেক্টর আয়তনের একটি জলাভূমির নাম বাইক্কা বিল। শ্রীমঙ্গল শহর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে। বাইক্কা বিলের প্রধান আকর্ষণ পরিযায়ী আর স্থানীয় পাখি। বাইক্কা বিলের মধ্যে প্রবেশ করতে হলে আপনাকে প্রথমেই টিকেট কাটতে হবে। বর্ষাকালে সাধারণত বাইক্কা বিলের ভেতর নৌকায় করে ঘুরতে পারেন। পদ্ম ফুল আর সাদা শাপলার মেলবন্ধন দেখা মিলবে বিলের ভেতরে। একটু অদূরেই ওয়াচ টাওয়ারে উঠে উপভোগ করতে পারেন পুরো বিলটির। এ সময় দেখা মিলবে ছোট পানকৌড়ি, শঙ্খচিল, ভূবন চিল, পালাসী কুড়া ঈগল, গুটি ঈগল ইত্যাদি। তবে শীতকালে আরও নানা প্রজাতির অতিথি পাখির দেখা মিলবে।
লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান :
লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলায় অবস্থিত একটি সংরক্ষিত বনাঞ্চল। শ্রীমঙ্গল শহর থেকে লাউয়াছাড় জাতীয় উদ্যানের দূরত্ব প্রায় ১০ কিলোমিটার। প্রকৃতির অপরূপ এই ভান্ডারে রয়েছে অসংখ্য প্রজাতির গাছ-পালা, বিচিত্র রকমের বন্যপ্রাণী যেমন- হরিণ, বানর, বিভিন্ন প্রজাতির শাপ, বন মোরগ, মেছো বাঘ দেখতে পাওয়া যায়। এ বনটির আয়তন প্রায় ১ হাজার ২৫০ হেক্টর। লাউয়াছাড়া জাতীয় উদ্যানের ভেতর দিয়ে সিলেটের রেলপথ চলে গেছে। এ উদ্যানটির ভেতর রয়েছে এক, দেড় ও তিন ঘন্টার তিনটি ট্রেইল, যেখানে পর্যটকরা প্রকৃতির খুব কাছ থেকে উপভোগ করতে পারেন। তিনটি পথের মধ্যে একটি ৩ ঘন্টার পথ, একটি এক ঘন্টার এবং অপরটি ৩০ মিনিটের পথ। উদ্যানটিতে প্রবেশ করতে হলে আপনাকে টিকেট কাটতে হবে।
কী খাবেন :
শ্রীমঙ্গলে খাবারের খরচ অনেক কম। প্রায় সব ধরণের রেস্তোরাই রয়েছে শহরে। সবচেয়ে আকর্ষণীয় হিসেবে রয়েছে সাত রঙের চা। শ্রীমঙ্গলে সুটকি ভর্তা একটা জনপ্রিয় খাবার। এছাড়া খাবার হোটলেগুলোতে সিলেটের এতিহ্যবাহী সাতকরা দিয়ে মাংস রান্না করা হয়ে থাকে। তাই ভ্রমণ পিয়াসু মানুষদের জন্য শ্রীমঙ্গল একটি আকর্ষণীয় স্থান। পাহাড়ের মেঠো পথ ধরে সবুজে ঘেরা নয়নাভিরাম চা বাগান যে কেউকে মুগ্ধ করে ফেলবে।
