বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস-২০২০
“কোভিড-১৯ প্রতিহত করি : নারী ও কিশোরীদের স্বাস্থ্য অধিকার রক্ষ করি” এই প্রতিপাদ্য নিয়ে পালিত হচ্ছে বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস-২০২০। প্রতিবছরের ন্যায় এবারও ১১ জুলাই সারাবিশ্বে একযোগে বিশ্বি জনসংখ্যা দিবস পালিত হচ্ছে। বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস উৎযাপনের লক্ষ্য হল জনসংখ্যা ও প্রজনণ স্বাস্থ্য বিষয়ে মানুষকে সচেতন করা এবং যৌন ও প্রজনণ স্বাস্থ্য সুরক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরা। ১৯৮৯ সালে ইউএনডিপি’র গর্ভনিং কাউন্সেল দ্বারা ১১ জুলাইকে বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
বৈশ্বিক কোভিড-১৯ মহামারীকে বিবেচনা করে জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল নারী ও কিশোরীদের যৌন ও প্রজনণ স্বাস্থ্য সেবার প্রয়োজনীয়তা এবং সেবার গুরুত্বের ওপর বিশেষভাবে জোর প্রদান করছে। পাশাপাশি যৌন ও প্রজনণ স্বাস্থ্য অধিকার ও সুরক্ষায় এবং টেকসই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য জাতীয় ও আর্ন্তজাতিকভাবে গৃহীত পদক্ষেপগুলোর বাস্তবায়নের ওপরও বেশ জোর প্রদান করা হচ্ছে।
মেরীস্টোপস ইন্টারন্যাশনাল এর একটি গবেষণার বরাত দিয়ে জানা যায় যে, লকডাউন ও পরিবার পরিকল্পনা সেবা সীমিতকরণের কারণে অনেক প্রজনণক্ষম নারীরা তাদের প্রয়োজনীয় প্রজনণ স্বাস্থ্য সেবা পাচ্ছে না। পাশাপাশি অন্যান্য প্রজনন স্বাস্থ্য সেবা যেমন মাতৃমৃত্যু, শিশু মৃত্যু, নিরাপদ গর্ভপাত, নিরাপদ প্রসব, দক্ষ সেবাদানকারীদের দ্বারা প্রসব ইত্যাদি সেবাগুলোও মারাত্নকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। মেরীস্টোপস ইন্টারন্যাশনাল আরও আশঙ্কা করছে যে, চলমান লকডাউন ছয় মাস পর্যন্ত থাকলে সারা বিশ্বে ১০.৪ মিলিয়ন নারী যৌন ও প্রজনণ স্বাস্থ্য সেবা থেকে বঞ্চিত হবে।
জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের মতে, কোভিড-১৯ মহামারীর কারণে ইতোমধ্যেই বাজারে জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর বিরাট ঘাটতি দেখা দিয়েছে। যদি এরকম পরিস্থিতি চলতে থাকে তাহলে বাংলাদেশসহ স্বল্প আয় ও মধ্যম আয়ের প্রায় ৭০ লক্ষ নারীরা অনাকাঙ্খিত গর্ভধারণের শিকার হবে। একইভাবে অনাকাঙ্খিত গর্ভধারণের হার বর্তমানে ১২%। কিন্তু এহেন পরিস্থিতি চলতে থাকলে তা কয়েকগুন পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। চলমান করোনা পরিস্থিতির কারণে বাল্যবিয়ের হারও বেড়ে গেছে। স্কুল, কলেজ ছুটি থাকার কারনে এবং অনেকেরই কর্মহীনতার কারণে অল্প বয়সের মেয়েদের বিয়ে দেয়া হচ্ছে। অনেকেই অল্পবয়সী মেয়েদের বিয়ে দেয়াকে পরিবারের চাপ কমানোর উপায় হিসেবে দেখছে। যদি এই পরিস্থিতি বিদ্যমান থাকে তাহলে করোনা পরবর্তী সময়ে কিশোরীদের একটি বিশাল অংশ কিশোরী মা হয়ে যাবে। যারা অপুষ্ট শিশু জন্মদানসহ নিজেরাও বিভিন্ন শারীরিক ও মানসিক সমস্যার মধ্যে থাকবে বলে আশংকা করা হচ্ছে। যা পারিবারিক সহিংসতা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে আবির্ভূত হবে বলে অনেক বিশেষজ্ঞই মনে করছেন।
পরিবার পরিকল্পনা সেবাখাতে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অনেক সাফল্য অর্জন করেছে। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এমডিজি-২০১০ অ্যাওয়ার্ড জিতেছেন মাতৃমৃত্যুর হার হ্রাসের জন্য। ২০০৪ সালে মাতৃমৃত্যুর হার ছিল ৩.২০ (প্রতি হাজার জীবিত জন্মে) যা বর্তমানে হ্রাস পেয়ে হয়েছে ১.৬৫। ২০০৬ সালে ০-৫ বছর বয়সী শিশু মৃত্যুহার ছিল ৬৫ (প্রতি হাজার জীবিন জন্মে) যা বর্তমানে হয়েছে ২১। ২০১১ সালে যেখানে দক্ষ সেবাদানকারীদের দ্বারা প্রসব করানোর হার ছিল ৩২% ২০১৯ সালে এসে তা দাড়িয়েছে ৪৭% এ। ১৯৭৫ সালে নারী প্রতি সন্তান জন্মহার ছিল ৬.৭ যা ২০১৯ এ এসে দাড়িয়েছে ২.০৪ এ। পরিবার পরিকল্পনার অপূরনীয় চাহিদার হার ১৭.৬০% থেকে ২০১৯ সালে হ্রাস পেয়ে হয়েছে ১২%। পদ্ধতি ব্যবহার ছেড়ে দেওয়ার হার ৪৯% থেকে হ্রাস পেয়ে হয়েছে ৩০%। ১৯৭৫ সালে পদ্ধতি ব্যবহারের হার ছিল ৭% যা বর্তমানে দাড়িয়েছে ৬৪% এ। পরিবার পরিকল্পনা ও প্রজনন স্বাস্থ্য খাতে বাংলাদেশের এসব উল্লেখযোগ্য অর্জন।
২০২০-২১ অর্থ বছরে পরিবার পরিকল্পনা খাতে ২৯,২৪৭ কোটি টাকা বাজেট বরাদ্দ করা হয়েছে। যা পূর্ববর্তী বাজেটের চেয়ে ১৩ শতাংশ বেশি। মেরীস্টোপস বাংলাদেশের এডভান্স ফ্যামলি প্লানিং কার্যক্রমের সমন্বয়ক মনজুন নাহার এক সাক্ষাৎকারে বলেন, করোনাকালীন ও করোনা পরবর্তী পরিবার পরিকল্পনা সেবা নিশ্চিতকরণে এই বাজেট কতটা সহায়ক হবে তা ভেবে দেখা দরকার পাশাপাশি বাজেটের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিতকরণে ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে পরিবার পরিকল্পনা খাতে বাজেট বৃদ্ধি করা দরকার। স্থানীয় সরকারের সম্পৃক্ততা বৃদ্ধির মাধ্যমে মনিটরিং ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
এফপি ২০২০ এর লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী টিএফআর ২.০০ তে নামিয়ে আনা এবং ২০২২ সালের মধ্যে পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি ব্যবহারের হার ৭৫% এ উন্নীত করার জন্য পরিবার পরিকল্পনা সেবায় আরও গতিশীলতা আনয়ন করা প্রয়োজন। ইত্যেমধ্যেই পরিবার পরিকল্পনা খাতে জনবল সংকট প্রকট হয়ে উঠেছে। বিদ্যমান কোভিড-১৯ পরিস্থিতিতে উপযুক্ত ও মানসম্পন্ন নিরাপত্তা সামগ্রীর অভাবে অনেকেই সেবাদান থেকে বিরত থাকছে। এমন অবস্থা চলতে থাকলে হয়ত পরিবার পরিকল্পনায় আমাদের অর্জনগুলো ম্লান হয়ে যাবে। সেক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ এবং নার্স ও মিডওয়াইফদের পরিবার পরিকল্পনা সেবায় যুক্ত করে বিদ্যমান সমস্যার সমাধান পাওয়া যেতে পারে। অপরদিকে পরিবার পরিকল্পনা সেবা কেবলমাত্র সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকেই প্রদান করা হচ্ছে। সেক্ষেত্রে বেসরকারী মেডিকেল কলেজগুলো পাঠ্যক্রমে পরিবার পরিকল্পনা সেবাকে সংযোযন ও বেসরকারি সেবাদানকারী সংস্থাগুলোর মাধ্যমে সেবা প্রদান এ খাতকে আরও শক্তিশালী করে তুলতে পারবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এক্ষেত্রে বিদ্যমান সেবা নীতিমালায় প্রয়োজনীয় পরিবর্তন সাধন করে পরিবার পরিকল্পনা ও জনসংখ্যা খাতকে আরও বেশি শক্তিশালীকরণের ওপর জোর প্রদান করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞগণ।
