প্রধান সূচি

শীতার্ত মানুষদের পাশে দাঁড়ানো আমাদের মানবিক দায়িত্ব

রুক্ষ প্রকৃতি, শুষ্ক আবহাওয়ায় চির চেনা শীত কাল। গাছের ঝরা পাতা, কুয়াশাচ্ছন্ন ভোরবেলা সবকিছু জানান দিচ্ছে শীতের তীব্রতা। শীতে চারপাশের পরিবেশ কাঁপতে শুরু করেছে। দিন যত যাচ্ছে, শীতের প্রকোপও তত বাড়ছে। আর এই শীতে অভাবী মানুষের জন্য জরুরি হয়ে পড়েছে শীতবস্ত্রের। অভাবে কারণে অনেকের পক্ষে আলাদাভাবে শীতের কাপড় কেনা দু:সাধ্য হয়ে পড়ে। নিম্ন আয়ের মানুষের দুর্ভোগও বাড়তে শুরু করেছে। গরম কাপড়ের অভাবে অসহায় মানুষগুলো রাতে ঘুমাতে পারে না। শীতার্ত মানুষগুলো কতটা দুর্বিষহ জীবন যাপন করে। তা শহর-নগরের ফুটপাত, রেলস্টেশনে গেলে বোঝা যায়। শীতার্ত মানুষগুলোর দূর্বিষহ জীবনের কথা ভেবে তাদের পাশে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেওয়া বড় সেবা। তাদের জন্য গরম কাপড়ের একটু সহায়তা লাঘব করতে পারে তাদের কষ্ট এবং দুর্বিষহ জীবন। আর শীতার্তদের সেবা মানুষের জন্য হতে পারে মানবতার সবচেয়ে বড় সেবা।
শীতে এখন কাঁপছে গোটা দেশ। ঘন কুয়াশা আর হিমেল হাওয়ায় সারাদেশে শীতের তীব্রতা বেড়েই চলেছে। বাংলাদেশ নাতিশীতোষ্ণ দেশ হলেও বছরের শেষের দিকে এদেশে শীতের প্রকোপটা বাড়তে শুরু করে। ডিসেম্বর থেকে জানুয়ারির শুরু পর্যন্ত হাড় কাঁপানো শীতে স্থবির হয়ে পড়ে জনজীবন। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং হ্রাস ঘটে। তাপমাত্রা যখন কমতে থাকে তখনই শীতের তীব্রতা বেড়ে যায়। তখন ভোগান্তিতে পড়ে গরিব-দু:খী লোকজন। বিশেষত যাদের শীতবস্ত্র কেনার সামর্থ্য নেই। সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়ে অভাবী ও গরিব মানুষ। এর পাশাপাশি বাড়ে ঠান্ডাজনিত রোগব্যাধি। সবচেয়ে বেশি কষ্টে পড়ে শিশু, নারী, প্রতিবন্ধী ও বয়স্করা। তারা সর্দি-কাশি, হাঁপানিসহ ফুসফুসজনিত বিভিন্ন রোগে ভোগে। কনকনে ঠাÐায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে তাদের জনজীবন।
শীত এলে অনিবার্যভাবেই প্রকৃতিতে ঘটে কিছু পরিবর্তন। হেমন্তের ফসল কাটা শেষ হয়। নবান্নের সঙ্গে পিঠা পায়েসের আয়োজন চলে গ্রামাঞ্চলে। শীত একদিকে যেমন উৎসবের আমেজ নিয়ে আসে। অন্যদিকে তীব্র শীত জীবনযাত্রা বিপন্ন করে তোলে মানুষ জনের। বিশেষ করে দরিদ্ররা শীতের কাপড়ের অভাবে কষ্ট পায়। শীতকাল কারো কারো জন্য আনন্দের বিষয় আবার কারো জন্য বিষাদের। শীত মানেই কুয়াশা-মোড়ানো ভোরে চুলোর পাশে বসে পিঠা খাওয়া। গল্পের আসরে বসে ধুমায়িত চা-কফির উষ্ণ স্বাদ। দীর্ঘ রাতে লেপ-কম্বলের ওম লাভের আনন্দ। কিন্তু যাদের নুন আনতে পান্তা ফুরোয় তাদের জন্য শীত মানে ভয়াবহ দু:সংবাদ। শীতকাল বিত্তবানদের জন্য বিলাসিতায় কাটানোর ঋতু হলেও, দরিদ্রদের জন্য পরিলক্ষিত হয় ভিন্ন চিত্র। শীতকাল যেমন দুহাত ভরে প্রকৃতিকে উপহার দেয়, তেমনি প্রকৃতি থেকে ছিনিয়ে নিয়ে যায় শত শত মানুষের প্রাণ। পর্যাপ্ত শীতবস্ত্রের অভাবে তাদের কাছে এই ঋতু হয়ে ওঠে মৃত্যুযন্ত্রণার সমতুল্য। তীব্র শীত দেখিয়ে যায় তার নিষ্ঠুর রূপ। সড়কের পাশে, বাস ও ট্রেন স্টেশনে, বাজার-ঘাটে রাতের বেলা এমন অনেক অসহায় মানুষকে পড়ে থাকতে দেখা যায়। তাদের রাত কাটে নির্ঘুম অবস্থায় শীতের প্রকোপে জবুথবু হয়ে।
ঋতুর আবর্তনে শীত আসবে, এটাই স্বাভাবিক। এর সঙ্গে খাপ খেয়েই আমাদের বেঁচে থাকতে হবে। তবে তীব্র শীতে গরিব ও দুস্থ মানুষের বেঁচে থাকা কষ্টকর হয়। সমাজের অসহায় ও শীতার্ত মানুষদের পাশে দাঁড়ানো আমাদের সকলেরই নৈতিক দায়িত্ব। জীবনযাত্রা কষ্টকর হয়ে পড়ে দিনমজুর, ভ্যানচালক, ইজিবাইক চালক, পাথর শ্রমিক, চা শ্রমিকসহ সাধারণ কর্মজীবী এবং ছিন্নমূল মানুষের। খেটে খাওয়া মানুষরা প্রচন্ড ঠান্ডায় কাজে যোগ দিতে দুর্ভোগে পড়ছেন। তাদের প্রয়োজনীয় শীতবস্ত্রের অভাবে কষ্ট হচ্ছে বেশি। তাই সমাজের বিত্তবান ও মানবিক বোধসম্পন্ন মানুষদের দূর্দশাগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো একান্ত প্রয়োজন। তাই সবাইকে নিজ নিজ দায়িত্ববোধ থেকে এগিয়ে আসতে হবে। ব্যক্তি উদ্যোগের মাধ্যমে এমন পরিস্থিতি থেকে শীতার্তদের রক্ষা করা যায়। দরিদ্র মানুষের জন্য শীতবস্ত্র বিতরণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মানব সেবা। অসহায়দের সাহায্যের মাধ্যমেই তৈরি হবে মানবিক সেতুবন্ধন। আমাদের সামান্য সহযোগিতায় শীতার্ত মানুষরা সুস্থ ও ভালো থাকতে পারবে। কনকনে শীতে শীতবস্ত্র তাদের মুখে হাসি ফোটাবে। এর মাধ্যমে প্রকাশ পাবে মানুষের প্রতি আমাদের মমত্ববোধ ও ভালোবাসা।
শীতে কর্মজীবী মানুষ খুব কষ্ট পায়। কুয়াশা আর ঠান্ডার মধ্যেও জীবিকার সন্ধানে সবকিছু অতিক্রম করে তাদের কাজে নামতে হয় দুমুঠো ভাতের জন্য।শীতের সময় বিভিন্ন জায়গায় শীতবস্ত্র বিতরণ করা হয়। কিছুটা হলেও শীতার্ত মানুষ স্বস্তি লাভ করে গরম কাপড় পেয়ে। সরকারিভাবে অনেক সময় শীতবস্ত্র বিতরণ করা হয়। ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা কিংবা সিটি করপোরেশনের মাধ্যমে শীতবস্ত্র দেওয়া হয়। আবার কখনো সরকারদলীয় নেতাদের মাধ্যমে আসে। শীতে যে কাপড় শীতার্ত গরিব মানুষ পাবে বলে ধারণা করা হয়, অনেক সময় ঘটে তার উলটো। যাদের কম্বল বিতরণ করতে দেওয়া হয়, তাদের মধ্যেই শুরু হয়ে যায় শীতবস্ত্র সংগ্রহের প্রতিযোগিতা। আবার কোথাও কোথাও শীতবস্ত্র বিতরণে দলীয়করণও লক্ষ করা যায়। যা মোটেও কাম্য নহে।
প্রতি বছর শীত এলে শীতার্তদের পাশে দাঁড়ানোর কথা উচ্চারিত হয়। সমাজের সামর্থ্যবান জনদরদি মানুষ ব্যক্তিগতভাবে এবং সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অন্যান্য সংগঠন, প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কম্বল ও শীতবস্ত্র দরিদ্র মানুষের মধ্যে বিতরণ করেন। যুবকরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে পুরনো কাপড় সংগ্রহ করে এবং তা গরিবদের মধ্যে বণ্টন করেন। শীত এলে এসব ছিল চিরচেনা সামাজিক কর্মকাÐ। এই হাড়কাঁপানো শীতে যে বিপুল জনগোষ্ঠী বর্ণনাতীত দু:খ-কষ্টে দিনাতিপাত করছে, তাদের পাশে দাঁড়ানো আমাদের সকলের দায়িত্ব।
আমাদের নিজেদের অতিরিক্ত থাকা শীতবস্ত্র থেকে একটি বা দুটি শীতার্তদের দিলে হতদরিদ্র মানুষগুলো একটু উষ্ণতায় স্বস্তি পাবে। শীতার্তদের পাশে দাঁড়াতে প্রতিবছর বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এগিয়ে আসে। কিন্তু শুধু সংগঠন দিয়ে এ উদ্দেশ্য সফল করা খুব কষ্টকর। কারণ স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোর আয়ের তেমন কোনো উৎস নেই। তাই আমরা প্রত্যেকে যদি একসঙ্গে এগিয়ে আসি, দিনশেষে একটি বৃদ্ধ মানুষ বা শিশুকে সাহায্য করি নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী তবে অনেকাংশে শীতবস্ত্রহীনতার কষ্ট লাঘব হবে। শুধু সরকার নয়, দেশের প্রতিটি নাগরিক যদি সাহায্যের হাত বাড়ায় তবে হাসি ফুটবে অসহায় মানুষের মুখে, বাঁচবে জীবন। প্রয়োজন একটু মানবিক হওয়া।
প্রকৃতির নিয়মে ঋতুর পরিবর্তন হবে। এটাই স্বাভাবিক। এ জন্য প্রতিটি ঋতুই যেন উপভোগ করা যায় সে ব্যাপারে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি থাকা অত্যন্ত জরুরি। শীতজনিত রোগব্যাধি থেকে মানুষজনকে রক্ষার করার জন্য স্বাস্থ্য বিভাগকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। তীব্র শীতে দরিদ্র ও অসহায় মানুষ যাতে কষ্ট না পায় সেজন্য গরম কাপড় সরবরাহ করাসহ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। শুধু সরকার নয় সমাজের বিত্তবানরা এ জন্য এগিয়ে আসতে পারেন। অনেক সংগঠন এ সময় নতুন-পুরাতন কাপড় সংগ্রহ করে শীতার্তদের মধ্যে বিতরণ করে। এই মানবিক কর্মে আমাদের যুক্ত হতে হবে। বাড়িয়ে দিতে হবে সহযোগিতার হাত। আর তখনই শীত ঋতু কষ্টের না, হয়ে উঠবে উৎসবের ঋতু।

লেখক ; সাংবাদিক ও কলামিস্ট

Please follow and like us:





উত্তর দিন

Wordpress Social Share Plugin powered by Ultimatelysocial