শ্রমের মূল্য : একটি মৌলিক অধিকার
রাষ্ট্রের মৌলিক অধিকার সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হতে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ছাত্র হওয়া লাগে না। উল্লেখিত উক্তিটি বাংলাদেশী সকল পেশাজীবী সাধারণ জনগণের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। পেশাজীবী বলা এই অর্থে যে, একমাত্র পেশাজীবী সাধারণ জনগণই সরকারি সকল সুযোগ সুবিধা থেকে সম্পূর্ণভাবে বঞ্চিত। সকল শ্রেণির জীবিকা নির্বাহী মানুষের সাথে মতবিনিময়ে অনেকে অনুযোগ করেছেন, সরকার কেবল রয়্যাল সার্ভিস ম্যান অরফে সরকারি চাকুরিজীবীদেরই বেতন ভাতা, সুযোগ সুবিধা দেখে আমরাও যে এদেশের খেটে খাওয়া মানুষ সেটা কী চোখে পড়ে না? আবার ব্যাংকে টাকা রাখলে তার আবার কড়ায় দন্ডায় কর দিতে বলে।
দেশটাতো আমাদেরও, তাই না? শ্রমজীবী, কর্মজীবী, পেশাজীবী ও মেহনতিদের চাই শ্রমের মর্যাদা। বর্তমান দ্রব্যমূল্য উর্ধ্বগতি বিবেচনায় বাঁচার মতো মজুরী নির্ধারণ করুন ও দেশকে বিশ্বের মর্যাদাশীল স্থানে আদিষ্ট করুন। একটু লক্ষ্য করলে দেখবেন সবুজ বিপ্লব, স্বনির্ভর, ১৮ দফা, ১৯ দফা-এমনকি চলমান দিনবদল, ডিজিটাল ও ভিশন-২০২১ সবই কিন্তু অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রকল্প। কোনো স্থায়ী রাষ্ট্র-ভাবনার সুদূরতাগামী অভিঘাতে তা তত্ত্বোত্তীর্ণ নয়। পূর্ণতা প্রত্যাশী টেকশই রাষ্ট্রদর্শনের অন্দরমহলে প্রবেশের জন্য আর কতো ব্যর্থ প্রহর অতিক্রান্ত হবে? যখন আধুনিক বিশ্ব গোলকই আমাদের আশ্রয় তখন আধুনিক সুযোগ সুবিধা রাষ্ট্রের একটা ক্ষুদ্র অংশ ভোগ করবে অথচ বঞ্চিত হবে বৃহৎ জনগোষ্ঠী- এমন অবস্থা অনাদিকাল চলতে পারে না। দুর্ভাগ্যজনক, গণতন্ত্রের ‘ছবক’ বাতলে দিতে কারো ক্লান্তি নাই কিন্তু সব পক্ষই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র পরিচালনে নিদারুনভাবে ব্যর্থ। জাতীয় চেতনা গঠন, পুনর্গঠন ও নির্মাণের সহযোগি প্রক্রিয়া হিসেবে শিক্ষাব্যবস্থাকে স্বীকার করা হলেও আজ তা বিভ্রান্তির কুহকে ভরপুর।
অন্যদিকে, বাংলাদেশে কবি-সাহিত্যিক ও মৌলিক চিন্তকের অভাব নাই কিন্তু রাষ্ট্রের শ্রম ভাবনায় যে জড়ত্ব তা নিরসনে কেউ এগিয়ে আসে না। রাষ্ট্র, সমাজ, রাষ্ট্রপরিচালন নিয়ে যারাই লেখালেখি করেন সবাই একপেশে ও চর্বিতচর্বনে বিভোর, এতে কোনো মৌলিকত্ব নাই। সাম্যবাদী, জাতীয়তাবাদী ও মৌলবাদীদের এক্ষেত্রে বিশেষ কোনো রকমফের দেখি না। সাম্যবাদীরা মার্কস-এঙ্গেলস, লেনিন-মাওতে ঘুরপাক খাচ্ছে, জাতীয়তাবাদীরা পঁচা ডোবা-নালায় হাবুডুবু খাচ্ছে। কেউ ধর্মদর্শী জাতীয়তাবাদ, কেউ পশ্চিমা জাতীয়তাবাদের গোলক ধাঁধায় মগ্ন তামসিক। কেউবা ১৪০০ বছর আগের আরবভূমিতে প্রতিষ্ঠিত প্রচারিত ধর্মাদর্শে পরিতৃপ্ত। ফলে শ্রেণি স্বার্থই প্রাধান্য পাচ্ছে সর্বত্র। এক দুর্যোগময় সময়ে আমরা পথ চলছি। প্রতিদিন এই রাষ্ট্রে আম জনতার স্বার্থ ও অধিকার ক্ষুন্ন হচ্ছে। রাষ্ট্রযন্ত্র থেকে বের হচ্ছে প্রতি নিয়ত মিথ্যার ফুলঝুরি। সমাজের এই বৈষম্য দিন দিন প্রকট আকার ধারণ করছে। একজন গার্মেন্টস শ্রমিককে দেখলে বোঝা যায়, তার শ্রমের মূল্য কীভাবে এদেশের লুটেরা বুর্জোয়া শ্রেণি পকেটে ঢুকাচ্ছে। আজকে একজন শ্রমিক যে টাকা বেতন পায়, তা দিয়ে তার পনের দিনের খরচও চলে না। এক মাস পাড়ি দেয়ার জন্য সে তাই কম খায়। চালটা কিনতে পারলেও শাক-সবজির বাজারে সে যেতে পারে না। মাছের বাজারতো অনেক দূর। এভাবে না খেতে খেতে একজন শ্রমিক চল্লিশের পর তার কর্মশক্তি হারিয়ে ফেলে। শ্রমিকের আয়ুর বিনিময়ে মালিক দীর্ঘজীবী হয়। রাষ্ট্র দেখে শুনে এই হত্যাকান্ডে নীরব ভূমিকা পালন করছে। এই রাষ্ট্র শ্রমিকের ঘামে-রক্তে চলে, তবুও রাষ্ট্র শ্রমিকের না। রাষ্ট্র গুটিকয় লুটপাটকারী ও তাদের প্রতিনিধিদের হাতে।
সুতরাং দেখা যাচ্ছে যে, বাংলাদেশের জনগণ রাজন্য শাসিত রাজ্যে প্রজাতেই রয়ে গেছে, সংবিধান রাষ্ট্র স্বীকৃতি পেলেও রাজন্য শাসিত ধারার অবসান ঘটেনি। নাগরিক হতে পারেনি প্রজাকূল। ফলে রাষ্ট্রীয় সাধারণ সুযোগ সুবিধা ও সেবা হতে নাগরিক সমাজ বঞ্চিত হচ্ছে। অন্যধায়, সবসেবা অর্থাৎ স্বাস্থ্য, খাদ্য, নিরাপত্তা, চিকিৎসায় রাষ্ট্র কর্মকর্তাদের উৎকোচ দিয়ে প্রীত করতে হয়। যার পরিণামে সরকারি নাগরিক তার রাষ্ট্রের প্রতি দায়বদ্ধ হয় না। বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ না করলেই নয়। রাজনৈতিক দল অহংকারের গাম্ভীর্য ফুটিয়ে বলে, ক্ষমতায় এসেছি। রাষ্ট্র তখনই হবে যখন সরকার নিজেকে জনগণের সেবক মনে করবে। শাসক বা অভিভাবক নয়। তারপরে গোদের ওপর বিষফোঁড়াতো আছেই। রাষ্ট্রের স্থায়ী কর্মচারি-কর্মকর্তারাও দায়িত্বশীল ও মেধা-মননে যথামাত্রার নয়। এর ফলে রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ কার্যক্রমই যে বাধাগ্রস্ত তা-ই নয় বহির্বিশ্বে রাষ্ট্রস্বার্থ সমুন্নত রাখতেও সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হয়। এই ব্যর্থতার সুযোগ রাজনৈতিক দলগুলোই করে দেয়। সুতরাং গণতান্ত্রিক সরকার যদি স্থবির সমাজকাঠামোকে বিনির্মাণের নতুন বেগে সাংঘর্ষিক রাষ্ট্র ভাবনার পর্দা উন্মোচন করে আলোকপুরীর আঙিনায় পা রাখতে পারে তবেই মুক্তি।
লেখক ও গবেষক।
