পিরোজপুর জেলা হাসপাতালে রোগীদের খাবার সরবরাহে অনিয়ম
পিরোজপুরের ১০০ শয্যা বিশিষ্ট জেলা হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের নিম্নমানের খাবার সরবরাহসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।
রোগীদের অভিযোগ, তাদের তালিকা অনুযায়ী দেওয়া হয় না খাবার। যা দেওয়া হয় তা নির্ধারিত পরিমাণের চেয়ে কম এবং নিম্নমানের। আবার নির্ধারিত শয্যার চেয়ে রোগী বেশি থাকায় রয়েছে খাবার না পাওয়ার অভিযোগও। ফলে ভর্তি হওয়া রোগীদের যেমনি বাড়ছে ভোগান্তি, তেমনি বাড়ছে খরচ। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও ঠিকাদারের দাবি, খাবারের জন্য যে বরাদ্দ রয়েছে তাতে মানসম্মত খাবার দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। আর খাবার সরবরাহে কোনো অনিয়ম হলে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন সিভিল সার্জন।
হাসপাতালে ভর্তিকৃত রোগীরা অভিযোগ করে বলেন, সকালের নাস্তার জন্য দুইটি পাউরুটি, একটি ডিম, সামান্য চিনি ও একটি কলা দেওয়া হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী ৪ ইঞ্চি আকারের একটি সবরি জাতের কলা দেওয়ার কথা থাকলেও দেওয়া হয় ছোট একটি চিনিচাঁপা জাতের কলা। দুপুরের খাবারে মাছ দেওয়ার কথা থাকলেও দেওয়া হয় বয়লার মুরগীর মাংস। ৬০ গ্রামের উপরে মাংস দেওয়ার কথা থাকলেও দেওয়া হয় ৫০ গ্রামের কম ওজনের মাংসের টুকরা। বাজারে মাছের দাম মুরগির তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি হওয়ায় প্রায় দিনই মাছের পরিবর্তে দেওয়া হচ্ছে মুরগি। পরিমানেও দিচ্ছে কম।
পেটে ব্যাথা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগী আব্দুল জলিল বলেন, সকালে হাসপাতাল থেকে যে রুটি দেওয়া হয়েছে তা তেকে গন্ধ হয, খাওয়া যায় না। সাথে ছোট একটা চিনিচাপা কলা আর ডিম দিয়েছে। দুপুরে ভাতের সাথে এক টুকরো মুরগির মাংস দিয়েছে। হাসপাতাল থেকে যে খাবার দেয় তা খুবই নিম্নমানের এবং পরিমানে কম।
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, হাসপাতালের অভ্যন্তরীণ বিভাগে ভর্তি রোগীদের ওষুধের পাশাপাশি প্রতিদিন সরকারিভাবে ১৭৫ টাকা মূল্যের তিন বেলা খাবার (সকালে নাশতা, দুপুরে ও রাতে ভাত) দেওয়া হয়। এছাড়া বিশেষ দিবসে প্রতি রোগীকে ২০০ টাকার খাবার দেওয়া হয়।
দরপত্রের শর্ত অনুয়ায়ী, হাসপাতালে প্রতিদিন দুপুর ও রাতে আঠাশ ইরি চালের ৩৩০ গ্রাম ভাত, সপ্তাহে ৫ দিন মাছ ও মাংস ৬৩.৬৬ গ্রাম করে দুই বেলা দেওয়ার কথা। সপ্তাহে দুইদিন মাছ ও ডিম দেওয়ার কথা। এছাড়া প্রতিদিন সকালে রোগীদের দুটি পাউরুটি, একটি সিদ্ধ ডিম ও একটি পাকা সবরি কলা দেওয়ার কথা। কিন্তু মাছ-মাংসের অংশ আকারে ছোট, কলাও ছোট ও নিম্নমানের পাউরুটি দেওয়া হচ্ছে। বিভিন্ন মসলার পরিমাণ কম দিয়ে তরকারি রান্না করে রোগীদের দেওয়া হচ্ছে, যেটি খেতে রোগীরা আগ্রহী হচ্ছে না।
জানা যায়, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দরপত্র মূল্যায়নে সর্বোচ্চ দরদাতা প্রতিষ্ঠানটি ছিল শেখ এন্ড সন্স ট্রেডার্স। বেশি দরে খাবার সরবরাহের দরপত্র বাগিয়ে নিলেও রোগীদের পাতে দেওয়া হচ্ছে নিম্নমানের খাবারে ক্ষুব্দ রোগীরা। ২০২৩-২৪ অর্থ বছরের পরে আর কোনো দরপত্র আহ্বান করেনি জেলা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। ফলে দরপত্রের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরেও একই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান হাসপাতালের খাবার সরবরাহ করছে।
হাসপাতালের রাধুনী লাইলি আক্তার বলেন, দুপুরে মাছ দেওয়ার কথা ছিল, কিন্তু মাছের পরিবর্তে মাংস দেওয়া হয়েছে। ঠিকাদার মাছের পরিবর্তে মাংস পাঠিয়েছে তাই মাংস রান্না করে দিয়েছি। এছাড়া বাজারে সবরি কলা পাওয়া যায়নি বলে চিনিচাঁপা কলা দেয়া হয়েছে। আমরা সবকিছুই ঠিক মত দিচ্ছি কিন্তু রোগির অভিযোগ থাকবেই।
সিভিল সার্জন, ডা. মো. মতিউর রহমান জানান, পিরোজপুর জেলা হাসপাতালে সকল বিষয়ে মনিটরিং করার জন্য একটি কমিটি আছে। আমি প্রায়ই কমিটির সদস্যদের সাথে নিয়ে পরিদর্শন করি। আপনাদের অভিযোগের প্রেক্ষিতে আরএমও সাহেবসহ আমাদের যে ঠিকাদার আছে তাদের সাথে নিয়ে পরিদর্শন করবো। আশাকরি খুব শীঘ্রই আমরা সকল সমস্যার সমাধান করতে পারবো।
উল্লখ্য, এ বছরের জানুয়ারি মাসে পিরোজপুর সমন্বিত জেলা কার্যালয় থেকে দুদকের ৫ সদস্যের একটি দল হাসপাতাল পরিদর্শন করে খাবারের পরিমাণ কম দেওয়ার সত্যতা পেয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সতর্ক করেছিল। তবে সচেতন মহলের দাবী দুদক থেকে সতর্ক করার পরেও কোন ভ্রুক্ষেপ করেনি কর্তৃপক্ষ।
