প্রধান সূচি

দুর্নীতির জালে ফেঁসে যাচ্ছেন বাগেরহাট জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী জয়ন্ত মল্লিক

বাগেরহাটের উপকূলীয় অঞ্চলগুলোতে সুপেয় পানির সংকট নিরসনে সরকারের নেয়া দুটি প্রকল্পে অনিয়ম ও দুর্নীতি অভিযোগ উঠেছে। এক বছর মেয়াদের এসব প্রকল্পের কাজ শেষ হয়নি তিন বছরেও। শুধুমাত্র কিছু পানির ট্যাংকি বিতরণ করেই মোট কাজের ৭০ ভাগ অগ্রগতির মিথ্যা তথ্য দেখিয়ে বিলের টাকা তুলে নিয়েছেন ঠিকাদার। আর এ কাজে সহযোগিতা করেছেন বাগেরহাটে জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী জয়ন্ত মল্লিক স্বয়ং নিজেই। ফলে বিশুদ্ধ পানির সংকট থেকে সহসা মুক্তি মিলছে না এ অঞ্চলের মানুষের।
বিভিন্ন দাতা সংস্থা ও সরকারি অর্থায়নে বাগেরহাট জেলা জুড়ে প্রায় ২২০ কোটি টাকা ব্যয়ে বাড়ি বাড়ি পানির ট্যাংকি স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। যার মধ্যে উপকূলীয় অঞ্চল মোংলা ও রামপাল উপজেলায় ২৮ কোটি ২০ লক্ষ ৩৫ হাজার টাকা ব্যয়ে ‘জলবায়ু ট্রাষ্ট ফান্ড’ ও ‘বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ প্রকল্প’ নামক দুটি প্রকল্পের আওতায় ৬ হাজার ৪৩ পরিবারে পলিমার ট্যাংকি স্থাপনের জন্য ঠিকাদার নিয়োগ করে বাগেরহাট জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর। প্রতিটি ট্যাংকি স্থাপনের জন্য ব্যয় ধরা হয় প্রায় ৪৫ হাজার টাকা। জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নথি অনুযায়ী ২০২১ সালে শুরু হওয়া এসব প্রকল্পের একটির মেয়াদ ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে এবং অন্যটি ২০২৪ সালের ডিসম্বর মাসে শেষ হওয়ার কথা। তবে নিদিষ্ট সময় অতিবহিত হলেও প্রকল্প দুইটির আওতায় কিছু ট্যাংকি বিতরণ করা ছাড়া আর কোন কাজ করেনি সংশ্লিষ্ট ঠিকাদাররা।
ভিত্তি পাকা, টেংকি স্থাপন ও পাইপ লাইনের মাধ্যমে ঘরের চাল থেকে ট্যাংকিতে সংযোগের মাধ্যমে শতভাগ কাজ শেষ করার কথা থাকলেও শুধুমাত্র কিছু পরিবারের মাঝে ট্যাংকি বিতরণ ছাড়া দৃশ্যমান কোন কাজই করেন নি ঠিকাদাররা। আবার বিতরণ করা হয়েছে নিম্নমানের ট্যাংকি।
প্রকল্প দুটির পরিচালকের (চলতি দায়িত্ব) দায়িত্বে আছেন বাগেরহাট জনস্বাস্থ্যের নির্বাহী প্রকৌশলী জয়ন্ত মল্লিক। একাধাওে তিনি বাগেরহাট জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী ও অন্যদিকে এসব প্রকল্পের পরিচালকের দায়িত্ব পেয়ে অসীম ক্ষমতার অধিকারী হয়ে ওঠেন। তিনি দুর্নীতির মাধ্যমে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে একটি বিশেষ গোষ্ঠীকে কাজ দিয়েছেন। যে সব লাইসেন্সের অধীনে এসব প্রকল্পের কার্যাদেশ দেয়া হয়, মূলত ওইসব লাইসেন্স ছিল ঠিকাদার জাহিদুর রহমান সোহেল ওরফে পানি সোহেল এবং বাগেরহাট- আসনে সাবেক এমপি মীর শওকত আলী বাদশার ছেলে ঠিকাদার মীর রহমত আলী এর নিয়ন্ত্রনাধীন প্রতিষ্ঠান। ঠিকাদার পানি সোহেল ও রহমত আলী দুইজনেই ছিলেন বাগেরহাট দুই আসনের সাবেক সংসদ সদস্য শেখ তন্ময়ের ঘনিষ্ঠ। এছাড়া পানি সোহেল বিগত বছরগুলোতে জয়ন্ত মল্লিকের সহায়তায় নামে বেনামে জনস্বাস্থ্যের বিভিন্ন প্রকল্পে কাজ করে যাচ্ছেন।
নির্বাহী প্রকৌশলী জয়ন্ত মল্লিকের দুর্নীতির তথ্য জানিয়ে চলতি বছরের ১৮ মে বাগেরহাট দুর্নীতি দমন কমিশনে অভিযোগ করেছেন জনৈক্য এক ব্যক্তি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঐ ব্যক্তি জানান, নিয়ম অনুযায়ী এসব প্রকল্পের কাজ শেষ হলে উপকারভোগী পরিবারের কাছ থেকে কাজ সন্তুষ্টমূলক শেষ হয়েছে মর্মে প্রত্যয়নপত্র নেয়ার বিধান রয়েছে। অথচ জয়ন্ত মল্লিক প্রত্যয়ন পত্র ছাড়াই ঠিকাদারদের বিল প্রদান করেছেন। বিল প্রদানের আগে পলিমার ট্যাংকিগুলোর গুণগতমান পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে সনদ নেয়ার কথা, তবে যা নেননি জয়ন্ত মল্লিক। এমনকি এসব পলিমার ট্যাংকি ক্ষতিকারক কোন পদার্থ দ্বারা তৈরি কিনা অথবা এতে স্বাস্থ্য ঝুঁকি রয়েছে কিনা, তা পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই বিল প্রদান করেছেন তিনি।
উল্লেখ্য যে, অনেক প্লাস্টিক মানবদেহে ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়। নিয়ম অনুযায়ী ঠিকাদার সম্পূর্ণ কাজ শেষ করে উপকারভোগী পরিবারের কাছ থেকে প্রত্যয়ন নিবেন। এরপর ট্যাংকিতে পানি সংরক্ষণ করা হলে সেই পানি ল্যাবে পরীক্ষা করে পরীক্ষার ফলাফল অ্যাপ-এ ডাউনলোড করার পর বিলের টাকা ছাড় করবেন প্রকল্প পরিচালক, যার কোনোটি জয়ন্ত মল্লিক অনুসরণ করেননি। পানির ট্যাংকিসহ সকল মালামাল ঠিকাদাররা নিজ খরচে উপকারভোগী পরিবারের কাছে পৌঁছে দিবেন। কিন্তু জনস্বাস্থ্যের নির্দেশে মোংলা ও রামপাল উপজেলায় গ্রাহক নিজ খরচে ট্যাংকি বাড়িতে নিতে বাধ্য হন। উপকারভোগীর পরিবারগুলোর কাছ থেকে ১৫০০ টাকা সহায়ক চাঁদা হিসেবে নেয়ার বিধান থাকলেও স্থানভেদে কোন কোন পরিবারের কাছ থেকে দুই থেকে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত নেয়া হয়েছে। এসব টাকা নেওয়ার ক্ষেত্রে জনস্বাস্থ্য তৎকালীন আওয়ামী সরকারের স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা ও জনপ্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করেছেন। ফলশ্রুতিতে গরিব পরিবারগুলো অতিরিক্ত চাঁদা দিতে বাধ্য হয়েছেন। প্রকল্পের কাজ যখন এমন অবস্থা তখন জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের বাগেরহাট হিসাব শাখায় দেখা যায়, এই দুটি প্রকল্পের কাজের মেয়াদ শেষ হয়ে গেলেও কয়েক দফা কাজের মেয়াদ বাড়ানোর পরও ঠিকাদাররা কাজ শেষ করেননি। বরং একটি কাজের ৭০ ভাগ অগ্রগতির মিথ্যা তথ্য দিয়েছেন প্রকল্প পরিচালক জয়ন্ত মল্লিক। অন্য একটি প্রকল্পের আওতায় চার হাজার ৪৩টি টাংকি স্থাপনের জন্য ঠিকাদার নিয়োগ করে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর। এর মধ্যে মেসার্স মনির ইঞ্জিনিয়ারিং নামক একটি প্রতিষ্ঠান ২৬৭টি ট্যাংকি স্থাপনের কাজ পায় এবং মেসার্স আবুল কালাম আজাদ নামক একটি প্রতিষ্ঠান পায় ৬৭৫টি ট্যাংকি ও বাকি ৬৪৮টি ট্যাংকে স্থাপনের কাজ পায় এসএম জিলানী ট্রেডার্স নামক একটি প্রতিষ্ঠান। কিন্তু নির্দিষ্ট সময় অতিবাহিত হওয়ার পরও ২০২৫ সালের ৯ মে পর্যন্ত ৯২৩টি ট্যাংকি এখনো জনস্বাস্থ্যকে বুঝিয়ে দেয়নি ঠিকাদাররা। অথচ এই প্রকল্পের কাজ শেষ দেখিয়ে ৪টি কিস্তিতে বিলের পুরো অর্থ তুলে নিয়েছেন ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানগুলো। কাগজে-কলমে তিনটি প্রতিষ্ঠানের পার্টনার হিসেবে স্বাক্ষর করেন শেখ জাহিদুর রশিদ সোহেল ওরফে পানি সোহেল। আর এসব দুর্নীতিতে প্রত্যক্ষ সহযোগিতা করেন নির্বাহী প্রকৌশলী জয়ন্ত মল্লিক।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঠিকাদার শেখ জাহিদুর রশিদ ওরফে পানি সোহেল ও মীর রহমত আলী বলেন, আমরা এখনো অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছি। আসলে এই প্রকল্প আদৌ টাইম এক্সটেনশন হবে কিনা, এই প্রকল্পের অর্থ বরাদ্দ পাবো কিনা, এইটা নিয়ে আমরা শংকিত। বিভিন্নভাবে আমরা রোষানালের শিকার হচ্ছি। দলীয় বিবেচনায় কাজ পাওয়ার সুযোগ নেই, কাজই ইজিপি টেন্ডার এর মাধ্যমে দরপত্র ওপেন টেন্ডাওে হয়েছে, একানে যে কেউ অংশগ্রহণ করতে পারে। প্রকল্পের কাজ আমরা অনেক দূর করেছি, মালামাল সরবরাহ করেছি, কিন্তু দেখা গেছে যে, জলবায়ু ট্রাস্ট, যেখান থেকে ফান্ডিং টা করে, ওখান থেকে আমাদের প্রকল্পের অর্থ ছাড় দিচ্ছে না।
অপর দিকে অভিযুক্ত জয়ন্ত মল্লিক দুর্নীতির বিষয়ে অস্বীকার করে বলেন, প্রকল্পের বাকি কাজ অতি দ্রুত সম্পন্ন করা হচ্ছে।
নির্বাহী প্রকৌশলী জয়ন্ত মল্লিকের অসীম দুর্নীতির বিষয়ে কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে কিনা জানতে চাইলে খুলনা বিভাগের জনসাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী বাহার উদ্দিন মৃধা বলেন, এ সকল প্রকল্পের প্রধান হলেন অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী এবং পিডি হলেন নির্বাহী প্রকৌশলী। নীতিমালা অনুসারে এসব প্রকল্পের তদারকি করার এখতিয়ার তার নেই।
প্রধান প্রকৌশলী মীর আব্দুস সাহিদ বিদেশে থাকায় তার সাথে যোগাযোগ করা এ বিষয়ে কথা বলা সম্ভব হয়নি।

Please follow and like us:





উত্তর দিন

Wordpress Social Share Plugin powered by Ultimatelysocial