প্রধান সূচি

লকডাউনে পিরোজপুরে মোটর সাইকেল মহড়া, সমাবেশ ॥ চলছে রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন ॥ ইউএনওকে দেয়া হচ্ছে ফুলেল শুভেচ্ছা

করোনাভাইরাস সংক্রমণ প্রতিরোধে সরকার ঘোষিত কঠোর লকডাউনে মধ্যেও পিরোজপুরে মোটর সাইকেল মহড়া, সমাবেশ, রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনে লোক জমায়েত, ইউএনও’র ফুলেল শুভেচ্ছা ও সংর্বধনা নেয়াসহ লোক সমাগমের মতো বিভিন্ন কার্যক্রম চলছে। এসব বিষয় নিয়ে সাধারণ জনগণসহ বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। চলছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও ব্যাপক সমালোচনা।

সরকার ঘোষিত ২৩ জুলাই থেকে আগামী ৫ আগষ্ট পর্যন্ত চলমান কঠোর লকডাউন বাস্তবায়নে পিরোজপুর জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসনসহ আইন-শৃংখলা বাহিনী সাধারণ মানুষকে সরকারী নির্দেশনা ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে প্রচারণামূলক কার্যক্রম, ভ্রাম্যমান আদালতে জরিমানা করাসহ দিনরাত কাজ করে চলছে। আর ঠিক সেই মূহুর্তে কঠোর লকডাউনের মধ্যে সরকারের বিধিনিষিধকে বৃদ্ধাগুলি দেখিয়ে সরকার দলীয় একটি শ্রেণি মোটর সাইকেলের মহড়া দিয়ে সমাবেশ করা, লোকজন নিয়ে রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করে চলছে। এসব কর্মসূচিতে মানা হচ্ছে না কোন সামাজিক দূরত্ব। মুখে মাস্ক ব্যবহারের নেই বাধ্যবাকতাও।

অন্যদিকে, লকলাউনের মধ্যে সরকারী নির্দেশনা ও স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষা করে জেলার ইন্দুরকানী উপজেলা নির্বাহী অফিসার নিয়েছেন ফুলেল শুভেচ্ছা ও সংবর্ধনা।

পিরোজপুরের কদমতলা ইউনিয়ন পরিষদে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নবনির্বাচিত ইউপি চেয়ারম্যান শেখ শিহাব উদ্দিনকে অভিনন্দন জানাতে সোমবার বিকেলে দেড় শতাধিক মোটর সাইকেলে করে মহড়া দিয়েছেন নবনির্বাচিত ইউপি চেয়ারম্যানের ভাইপো এবং পিরোজপুর সদর উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান এস এম বায়েজীদ আহম্মেদ।

পিরোজপুর-নাজিরপুর সড়কের পাঁচপাড়া বাজার থেকে বিকেল ৪টার দিকে মোটর সাইকেল মহড়ার মাধ্যমে কয়েক’শ কর্মী সমর্থকসহ ভাইস চেয়ারম্যান বায়েজিদ তার চাচা নবনির্বাচিত ইউপি চেয়ারম্যান শিহাব উদ্দিনকে নিয়ে কদমতলা ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ে যান। সেখানে ৪ শতাধিক লোক সমাগমের উপস্থিতিতে তার নবনির্বাচিত চেয়ারম্যান শিহাব উদ্দিনকে মাল্যদান করা হয়।

সদর উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যানের এহেন কর্মকান্ডে আওয়ামী লীগ দলীয় রাজনৈতিক নেতাসহ বিভিন্ন মহলে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।

তবে এ বিষয়ে উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান এস এম বায়েজিদের মোবাইলে একাধিকবার ফোন করলেও তিনি তা রিসিভ করেন নি।

পিরোজপুর জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি মাকসুদুল ইসলাম লিটন সিকদার বলেন, কদমতলা ইউপি নির্বাচনে এসএম বায়েজিদের চাচা নৌকার বিপক্ষে নির্বাচন করেছেন। মূলত: এরা জামাত পরিবারের সদস্য। কঠোর লকডাউনের মধ্যে সরকারী নির্দেশনা উপেক্ষা করে এমন কাজ করে তারা সরকারকে সমালোচনার মধ্যে ফেলতে চায়। আমি সরকারের বিধিনিষেধ উপেক্ষাকারীর বিচার চাই।

তিনি আরও বলেন, যেখানে একজন দিনমজুর না খেয়ে থাকলেও রাস্তায় বের হয় না। আর সেখানে একজন জনপ্রতিনিধি যদি মোটর সাইকেল মহড়া দেয়, তাইলে আইনের সঠিক প্রয়োগ কি করে থাকলো।

পিরোজপুর উপজেলা চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ন সাধারণ সম্পাদক মো. মজিবর রহমান খালেক বলেন, উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান বায়েজিদ আওয়ামী লীগের কেউ না। তিনি মূলত: সুবিধাবাদী আওয়ামী লীগের। তিনি সরকারকে সমালোচনায় ফেলার জন্যই এ মহড়া দিয়েছেন।

এ ব্যাপারে পিরোজপুর সদর থানার ওসি আ. জ. ম. মাসুদুজ্জামান জানান, সরকারী নির্দেশনা অমান্যকারীদের আইনের আওতায় আনা হবে। মোটর সাইকেল মহড়া ও লোক সমাগমের খবর পেয়েই তাৎক্ষনিক সেখানে পুলিশ পাঠানো হয়েছিল।

পিরোজপুর সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার বশির আহমেদ বলেন, বিষয়টি অবহিত হয়ে ভাইস চেয়ারম্যানকে ফোন করেছিলাম। তাকে ঘটনার বিষয়ে সতর্ক করে দেয়া হয়েছে। এসময় সে ঘটনার জন্য দু:খ প্রকাশ করেছে।

এদিকে, লকডাউনের মধ্যে পিরোজপুরে মঙ্গলবার স্বেচ্ছাসেবক লীগের ২৭তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী করেছে উপজেলা ও পৌরসভা স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতা-কর্মীরা।

শহরের সিও অফিস এলাকায় একটি র‌্যালী সদর উপজেলার সামনে থেকে বের হয়ে বঙ্গবন্ধু চত্তরে গিয়ে শেষ হয়। এসময় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে পুষ্পমাল্য অর্পন করছেন স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতাকর্মীরা। পরে শহরের পুরাতন ডিসি অফিস ভবন মিলনায়াতনে আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়।

এসব কর্মসূচিতে জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ন সাধারণ সম্পাদক ও জেলা যুবলীগ সভাপতি আক্তারুজ্জামান ফুলু, আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগের পিরোজপুর পৌর শাখার সভাপতি মো. জহিরুল হক টিটু, জেলা যুবলীগের সহ-সভাপতি জাহিদুল ইসলাম পিরু, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জিয়াউল আহসান জিয়া, জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সিকদার চাঁন, পৌর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সহ-সভাপতি শেখ হাসান মামুনসহ আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন। তবে জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের আহবায়ক কমিটি বিলুপ্ত করায় তারা কর্মসূচিতে অংশ গ্রহণ করেন নি।

এসব কর্মসূচিতে ছিলনা কোন সামাজিক দূরত্ব, মানা হয়নি কোন স্বাস্থ্যবিধিও। কর্মসূচিতে উপস্থিত নেতা-কর্মীরা অনেকেই ছিলেন মাস্ক বিহীন।

একইভাবে মঙ্গলবার জেলার ইন্দুরকানী উপজেলায় লকডাউনের মধ্যে উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের দুটি গ্রুপ আলাদা আলাদাভাবে প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীর কর্মসূচি পালন করেছে।

অন্যদিকে, লকডাউনে সরকারি বিধিনিষেধ উপেক্ষা করে পিরোজপুরের ইন্দুরকানী উপজেলার নবগত উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) লুৎফুনেচ্ছা খানমকে ফুলেল শুভেচ্ছা ও সংবর্ধনা দিয়েছে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। সোমবার দুপুরে উপজেলা ছাত্রলীগের উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি আতিকুর রহমান সগিরের নেতৃত্বে শতাধিক উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কার্যালয়ে গিয়ে তাকে (ইউএনও) ফুলেল শুভেচ্ছা ও সংর্বধনা দেন। এসময় উপস্থিত নেতা-কর্মীদের বেশির ভাগের মুখে মাস্ক ছিল না। মানা হয়নি সামাজিক দূরত্বও।। বিষয়টি যোগাযোগ মাধ্যেমে ছড়িয়ে পড়লে সমালোচনার ঝড় উঠে।

এসব ঘটনার বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পিরোজপুর জেলা ব্যবসায়ী সমিতির এক নেতা বলেন, লকডাউন শুধু ব্যবসায়ী, অটোচালক, রিক্সাচালক খেটে খাওয়া গরীব মানুষদের জন্য হচ্ছে। দোকান খুললে জরিমানা করা হয়। অথচ, লকডাউনের মধ্যে শত শত মোটর সাইকেল নিয়ে মহড়া দেওয়া হয়, শত শত লোক নিয়ে সমাবেশ করা হয় তাতে প্রশাসন কোন ব্যবস্থা নেয় না।

উপজেলার পাড়েরহাটের বাসিন্দা জাফর ইকবাল বলেন, সাধারণ মানুষ লকডাউনে ঘর থেকে বাজারে গেলেই ম্যাজিষ্ট্রেটরা জরিমানা করে। কিন্তু ইউএনওকে দল বেধে ফুল দিতে  গেলে কোন সমস্যা হয় না।

পত্তাশী ইউনিয়নের মাওলানা তরিকুল ইসলাম জানান, কঠোর লকডাউনে মানুষের ঘরে থাকার কথা। কিন্তু রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা এখন সরকারি কর্মকর্তাদের সরকারি বিধি নিষেধ না মেনে ফুলের শুভেচ্ছা দিচ্ছে।

তবে ইন্দুরকানী উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি আতিকুর রহমান সগীর জানান, ইন্দুরকানী উপজেলার নতুন নির্বাহী অফিসার যোগদান করার কারণে অন্য সকল সংগঠনের মতো তারা তাকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানিয়েছেন মাত্র। কোন সংবর্ধনা দেওয়া হয়নি। আর এসময় সকলেই মাস্ক পরিহিত ছিল, তবে ছবি তোলার সময়ে তারা মাস্ক খুলেছিল শুধু।

ইন্দুরকানী উপজেলার নবাগত নির্বাহী অফিসার লুৎফুনেচ্ছা খানম জানান, তাকে কোন সংবর্ধনা দেওয়া হয়নি, ফুলের শুভেচ্ছা দেওয়া হয়েছে মাত্র। তিনি আরো জানান, তাকে আগে থেকে না বলে হঠাৎ করেই ছাত্রলীগের নেতৃবৃন্দ তার (ইউএনও) কার্যালয়ে উপস্থিত হয়েছিল। এ সময় তাদেরকে মাস্ক দেওয়া হয় এবং পরবর্তীতে তাদের দ্রুত সেখান থেকে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

এসব বিষয়ে পিরোজপুর জেলা প্রশাসক আবু আলী মো. সাজ্জাদ হোসেন জানান, করোনা সংক্রমণ রোধে সকলকেই সচেতন হতে হবে। আমরা বিষয়টি সব মহলকেই বলছি। তারপরও সরকারী নির্দেশনা না মেনে যেসব কর্মসূচি করা হচ্ছে সে বিষয়ে আমরা পদক্ষেপ নিবো।

Please follow and like us:





উত্তর দিন

Wordpress Social Share Plugin powered by Ultimatelysocial