প্রধান সূচি

দরিদ্ররা ভুগছে খাদ্য সংকটে ॥ মধ্যবিত্ত পরিবারে চলছে নিরব হাহাকার

পিরোজপুর জেলার নাজিরপুর উপজেলার আয়তন ২৩৩.৬৩ বর্গ কিলো মিটার। এ উপজেলায় প্রায় ২ লাখ মানুষ বসবাস করে। জেলার ৭টি উপজেলার মধ্যে সবচেয়ে হতদরিদ্র ও খেটে খাওয়া সল্প আয়ের মানুষের বসবাস নাজিরপুর উপজেলা। এখানে নেই কোন কল কারখানা বা শিল্পাঞ্চল। নেই কোন বড় বড় ধনাঢ্য ব্যবসায়ী বা দানশীল ধনীদের বসবাস। এখানকার অধিকাংশ মানুষের পেশাই কৃষি বা দিন মজুর। কেউ কেউ ভ্যান, রিক্সা, অটো বা ভাড়ায় চালিত মোটর সাইকেল চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করে। আবার কেউ কেউ হাটে-বাজারে বা ফেরী করে ছোটখাটো ব্যবসা করে জীবিকা নির্বাহ করে আসছিলো।
কষ্টগুলো প্রকাশ করতে মানা আর জীবনের কোন ক্রান্তিলগ্নে খুব কান্না এলে তাতেও যেন মানা। কাঁদলেও কাঁদতে হবে নিরবে নিভৃতে। এক কথায় মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোতে জন্মগ্রহণ করা মানুষের জীবনের গল্প ঠিক এমনই।
বিশ্বব্যাপী মহামারী আকার ধারণ করা ঘাতক ব্যাধি করোনা ভাইরাস সংক্রামণের বিস্তার বাংলাদেশেও ক্রমাগত ভাবে বাড়ছে। ভাইরাস সংক্রামণের বিস্তার রোধে সরকারী নির্দেশনা অনুযায়ী নাজিরপুর উপজেলায় ঔষধ ও নিত্যপন্য ছাড়া সব ধরনের দোকানপাট অনিদির্ষ্ট কালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। সেই সাথে বন্ধ হয়ে গেছে মধ্যবিত্ত পরিবারের আয় রোজগার।
প্রশাসনের নির্দেশ মেনে বাজারে ভাড়া নেয়া দোকানটি বন্ধ রয়েছে। খুব বেশি প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের হতে মানা। তারপর পরিবারের খাবার সংগ্রহের জন্য বাজারে আসতে বাধ্য হন অনেকেই।
এদিকে, উপজেলার অনেক ছোট-বড় ব্যবসায়ীই পরিবার নিয়ে বেচেঁ থাকার জন্য নিজের কাছে জমানো সামান্য পুজিঁ ও লোন করে ঘর মালিককে অগ্রিম টাকা দিয়ে দোকান ভাড়া নিয়ে ব্যবসা করে আসছিলেন। এতে তাদের মাথার উপর প্রতিদিন ভর করছে বাড়তি ঋণের বোঝার চাপ। আর সেই সাথে পরিবারের রোজগারের চিন্তা, বোবা কান্না ছাড়া কোন উপায় থাকে না মধ্যবিত্তদের। এমতাবস্থায় কোনমতে চালাতে হচ্ছে তাদের সংসার।
এ সব কারণে এখানকার মানুষ কর্মহীন হয়ে ঘর বন্দি থেকে চরম খাদ্য সংকটে ভুগছে। আর মধ্যবিত্তদের মাঝে চলছে নিরব হাহাকার।
চহিদা অনুযায়ী সরকারী বা অন্য কোন ব্যাক্তি বা সংস্থা থেকেও তেমন কোন সহায়তা পাচ্ছে না অসহায় এ মানুষ গুলো। যে পরিমান সাহায্য দেয়া হচ্ছে তা চাহিদার তুলনায় খুবই সামান্য বলে জানিয়েছেন একাধিক স্থানীয় জনপ্রতিনিধি।
উপজেলা দীর্ঘা ইউনিয়নের লেবুঝিলবুনিয়া গ্রামের মধ্যবিত্ত পরিবারের এক যুবক নাম প্রকাশ না করার শর্তে মুঠোফোনে জানান, ঢাকায় একটি প্রাইভেট কোম্পানীতে চাকুরী করে তার সংসার চলতো। অফিস বন্ধ হওয়ায় প্রায় এক মাস বাড়ী এসে ঘর বন্দি রয়েছে। যে টাকা পয়সা ছিলো তা প্রায় শেষ। আগামী দিন গুলো কিভাবে চলবে জানি না।
বাংলা সাহিত্যে অনার্স-মাস্টার্স পাশ করার পরেও কোন কাজ বা চাকুরী না পেয়ে এনজিও থেকে লোন তুলে মটর সাইকেল কিনে তা ভাড়ায় চালিয়ে জীবিকা নির্বাহকারী নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক যুবক জানান, বৃদ্ধ বাবা-মা ও দুই ছেলেসহ স্বামী-স্ত্রী নিয়ে ৬ সদস্যের সংসার তার। ভাড়ায় মটর সাইকেল চালিয়ে যে আয় হতো তা দিয়ে এনজিও’র কিস্তি পরিশোধ করে কোন ভাবে সংসার চলতে ছিলো। আজ প্রায় ২০ দিন গাড়ী নিয়ে রাস্তায় বের হতে পানি না। এখন পর্যন্ত সাহায্য সহযোগিতা কারো কাছে পাইনি। বর্তমানে পরিবার নিয়ে অনাহারে অর্ধাহারে দিন কাটছে। কাউকে বলতেও পারছি না। জানিনা এ অবস্থার পরিবর্তন কবে হবে।
কথা হয় উপজেলার কলারদোয়ানিয়া ইউনিয়নের ৭নং ওয়ার্ডের বাসিন্ধা ভ্যান চালক সুলতানের সাথে অনেকটা কাঁদো কাঁেদা কণ্ঠে তিনি বলেন, বাবার তেমন কোন জায়গা জমি নেই। নিজের থাকার মত ঘরটিও নেই। দুই সন্তান ও পরিবার নিয়ে অন্যের ঘরে বসবাস করি। অসুস্থ শরীর নিয়ে ভ্যান চালিয়ে সংসার চলতো। এখন তাও বন্ধ। ঘর থেকে বের হতে পারছি না। কি খেয়ে বাঁচবো আল্লাহই ভালো জানেন। এ পর্যন্ত কোন সাহায্য সহায়তাও পাইনি।
সদর বাজারের ঔষধ ব্যবসায়ী মোস্তাফিজুর রহমান লাভলু জানান, করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে সারাদেশে সবকিছু বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এই মুহূর্তে গৃহবন্দি সাধারণ মানুষ। নিম্ন আয়ের মানুষের হাতে ত্রান-খাদ্যসামগ্রী এবং প্রয়াজনীয় দ্রব্য তুলে দিচ্ছেন অনেকেই। বড়লোকদের ব্যাংকে জমানো টাকা দিয়ে ভালো ভাবেই পরিবার নিয়ে সংসার চলছে তাদের। তবে মধ্যবিত্তের পাশে নেই কেউ। ঘরে খাবার না থাকলেও মধ্যবিত্তরা লজ্জায় কিছু বলতে পারছে না। মধ্যবিত্তরা পারছেনা মাঠে শ্রমিকের কাজ করতে, রিক্সা চালাতে, না পাচ্ছে সরকারি-বেসরকারি ও কোনো স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের ত্রাণ ও খাদ্যসামগ্রী সহায়তা। একমাত্র মধ্যবিত্ত পরিবারের লোকজনেরাই শুধুমাত্র বর্তমান সময়ে অতি কষ্টে মানবেতর দিনযাপন করে চলছে।
উপজেলার কলারদোয়ানিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হাসনাত ডালিম জানান, কোন প্রকৃতিক দুর্যোগ হলে তা ২/১ দিন বা এক সপ্তাহে কেটে যায়। এর পরে সব কিছু স্বাভাবিক হয়ে যায়। তখন সহজে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা যায় কিন্তু বর্তমান পেক্ষাপট ভিন্ন প্রায় এক মাস ধরে সব কিছুই বন্ধ। প্রশাসনের নির্দেশে সকলের বেঁচে থাকার স্বার্থে আমরাই মানুষকে ঘর বন্দি করে রাখছি। যার ফলে ইতোমধ্যে মানুষ গুলো কর্মহীন হয়ে পড়ে চরম খাদ্য সংকটে ভুগতে শুরু করেছে। রাস্তায় বের হতে পারি না আবার ঘরেও থাকতে পারি না। কারণ সরকার থেকে এ পর্যন্ত যে পরিমান খাদ্য সামগ্রী পাওয়া গেছে তা চাহিদার তুলনা অনেক কম। এত মানুষের মুখে কিভাবে খাবার তুলে দিবো। এ পর্যন্ত ৪ মেট্রিক টন চাল, নগদ ২০ হাজার টাকা এবং পিরোজপুর জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানের ব্যক্তিগত পক্ষ থেকে ২০০ প্যাকেট খাবার পাওয়া গেছে। তা দিয়ে প্রতি ওয়ার্ডে ৫০ থেকে ৬০টি পরিবারকে সহায়তা করা সম্ভব হয়েছে।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মোহাম্মদ ওবায়দুর রহমান বলেন, এ পর্যন্ত ৬৮ মেট্রিক টন চাল ও নগদ ২ লাখ ৬৪ হাজার টাকা বরাদ্দ পাওয়া গেছে। যা উপজেলার ৯টি ইউনিয়নে বন্টন করা হয়েছে। পাশাপাশি আমি নিজেও অনেক কর্মহীন অসহায় মানুষের বাড়ী বাড়ী গিয়ে খাদ্য সামগ্রী পৌঁছে দিচ্ছি। তবে চলমান অবস্থা বিবেচনায় সহায়তার পরিমান আরো বাড়ানো উচিত। অনেক মানুষ মানবেতর জীবন যাপন করছে। অনেকেই আমাকে ফোন করছে। আমি সাধ্যমত তাদের পাশে দাঁড়াচ্ছি। তবে এই মুর্হুতে সরকারের পাশাপাশি সমাজের বিত্তবানদের অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর আহবান করছি।

Please follow and like us:





উত্তর দিন

Wordpress Social Share Plugin powered by Ultimatelysocial