একজন মানুষ যেভাবে বদলে দিয়েছে একটি অঞ্চল !
ভাইরাসের বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় কি করতে হবে সে সম্পর্কে অধিকাংশ জেলার ধারনা খুব একটা স্পষ্ট নয়। তবে সারা দেশে সত্যিকার অর্থে ভাইরাসের বিরুদ্ধে যেসব অঞ্চল সর্বোচ্চ সুরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহন করেছে, তার মধ্যে ভান্ডারিয়া অন্যতম। তাদের অভূতপূর্ব কার্যক্রম অন্যান্য অঞ্চল এবং স্থানীয় সরকারের জন্য একটি সুন্দরতম দৃষ্টান্ত হতে পারে।
উল্লেখযোগ্য যে ১১টি কার্যক্রম তাদের অন্যদের থেকে আলাদা করেছে, সেটি দেখে নেয়া যাক:
১. ভান্ডারিয়া উপজেলায় প্রবেশের ৮টি পথ আছে। এই পথগুলোতে চেক পোস্ট বসেছে। দেশে সংক্রমনের প্রাথমিক পর্যায় থেকে এসব পথ ব্যবহার করে যেসব যানবাহন শহরে ঢুকেছে, প্রত্যেকটি বাহন জীবানুশাসক স্প্রে দিয়ে জীবানুমুক্ত করার পরে, সেটি শহরে ঢোকার অনুমতি পেয়েছে।
২. শহর লক ডাউন হয়ে গেলে যারা হাঁটা পথে এবং জরুরি প্রয়োজনে শহরে প্রবেশ করছেন থার্মাল গান দিয়ে প্রাথমিক স্ক্রিনিং এর ভেতর দিয়ে তাদের যেতে হয় এবং মেশিনে টেম্পারেচার তারতম্য দেখা দিলে, দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শে পরবর্তী ব্যবস্থা নেয়া হয়।
৩. ৪০টি উন্নত প্রযুক্তির থার্মাল গান কেনা হয়েছে। হাসপাতাল, উপজেলা পরিষদ, ইউনিয়ন পরিষদ, এসিল্যান্ডের কার্যালয়, থানা, সমাজ সেবা অধিদপ্তরের মত সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের বায়োলজিক্যাল নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এসব প্রতিষ্ঠানে থার্মাল গান সরবরাহ করা হয়েছে।
৪. প্রতিরাতে ভান্ডারিয়া শহরের প্রধানতম ৩০ কিলোমিটার রাস্তা এবং শহরের কেন্দ্রীয় রাস্তাগুলো মোডিফাইড গাড়ি ব্যবহার করে জীবানুশাক দিয়ে ধুয়ে ফেলা হয়।
৫. যারা সর্দি, কাশি, জ্বরেরমত গুরুত্বপূর্ন নয় এমন সমস্যায় ভুগছেন তাদের জন্য আছে টেলিমেডিসিন সেবা। হাসপাতালে গিয়ে সংক্রমনের ঝুঁকি না বাড়িয়ে, প্রয়োজনে মেডিকেল অফিসার, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, ভান্ডারিয়া, ০১৩১০৫৫২০৬৬ এই নম্বরে ফোন করে সেবা নিতে পারবেন।
৬. সার্বক্ষনিক জরুরি প্রয়োজনে দুটি স্পেশাল অ্যাম্বুলেন্স প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
৭. চিকিৎসকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছিল দুর্যোগের প্রাথমিক পর্যায়। ২৫০টি ডিসপোজেবল পিপিই এবং বিশেষ নিরাপত্তা ইকুইপমেন্টসহ ৫০টি রিইউসঅ্যাবল পিপিই সরবরাহ করা হয়েছে। মাষ্ক এবং হ্যান্ড গ্লবস দেয়া হয়েছে ২০ হাজার করে।
৮. সচেতনতা কার্যক্রমের পাশাপাশি সাধারন জনগেনের মাঝে মাষ্ক বিতরন করা হয়েছে ৩০ হাজার। হ্যান্ড গ্লবস বিতরনের পরিমান এখন পর্যন্ত ২১ হাজার।
৯. ইতিমধ্যে ১২,৩০০ মানুষের মধ্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্য সামগ্রী বিতরন করা হয়েছে এবং এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া।
১০. ঝুঁকি এড়াতে লকডাউন হওয়া বাড়িগুলোর সুরক্ষা ব্যবস্থা এবং তাদের নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্য সহায়তা নিশ্চিত করা হয়েছে।
১১. সংক্রমন এড়াতে এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য ক্রয়ে কোন মানুষকে যেন ভিড়ের মধ্যে পড়তে না হয়, এজন্য ৭টি ভ্রাম্যমান ট্রাক প্রয়োজনীয় কাঁচা বাজার নিয়ে নির্দিষ্ট সময়ে পৌঁছে যাচ্ছে।
যে বিস্ময়কর কথাটি এবার আপনাদের জানা দরকার সেটি হলো, সর্বোচ্চ মানসম্পন্ন এই যে সুরক্ষা ব্যবস্থা এবং দুর্যোগকালীন প্রস্তুতি সেটি কোন সরকারী প্রতিষ্ঠানের নয়। সম্পূর্ন ব্যক্তি উদ্যোগে হচ্ছে এই মহাযজ্ঞ। যিনি পেছনে আছেন তিনি মো. মিরাজুল ইসলাম, উপজেলা চেয়ারম্যান ভান্ডারিয়া এবং ভান্ডারিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। তার কাছে জানতে চাইলে তিনি এ কর্মক্রমকে তার দায়িত্ব হিসেবে দেখছেন বলে জানান। তিনি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কথা স্মরন করে বলেছেন, ‘আমার নেত্রী বলেছিলেন, এই দুর্যোগে সবচেয়ে অসহায় মধ্যবিত্ত। প্রয়োজনেও যারা চাইতে পারে না। তার কথাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে ৫০ হাজার খাদ্য সামগ্রীর প্যাকেট প্রস্তুত করছি। আমার কাছে হিসেব আছে, আমার উপজেলায় ৭টি ইউনিয়নে প্রায় ৪৪ হাজারেরমত বাড়ি। সকল শ্রেনী পেশার প্রতিটি বাড়িতে আমি নিজ অর্থায়নে খাদ্য সামগ্রী পৌঁছে দিতে চাই। কোন আরম্ভর নয়, কোন আয়োজন নয়, নিভৃতে পৌঁছে যাবে প্রতিটি বাড়িতে।
প্রখ্যাত হাজী মুহম্মদ মুহসীন, দানশীলতায় দানবীর উপাধী পেয়েছিলেন। শত বছর পরেও ইতিহাস তাকে মনে রেখেছে। একজন জনপ্রতিনিধি এবং রাজনৈতিক নেতা হিসেবে মিরাজুল ইসলাম সম্পূর্ন ব্যক্তিগত উদ্যোগে যেটি করেছেন, দেশের এই দুর্যোগ কেটে গেলে সেটিও নিশ্চই ইতিহাস হয়ে থাকবে।
লেখক : ডা.সিদ্ধার্থ দেব মজুমদার
ল্যাবএইড হাসপাতাল।
