প্রধান সূচি

ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কৃষক ॥ ভেস্তে যাচ্ছে সরকারের উদ্যোগ

নাজিরপুরে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ধান ক্রয় করা হচ্ছে

পিরোজপুরের নাজিরপুরে চলতি বছর বোরো মৌসুমে ধানের ভালো ফলন হলেও বাজারে ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেন না কৃষকরা। সরকারিভাবে ধান-চাল ক্রয় শুরু হলেও কৃষকের তালিকা তৈরিতে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এক শতক জমিতেও বোরো চাষাবাদ করে নি এবং কৃষির সঙ্গে জড়িত নয় এমন ব্যক্তিদের নাম ওই তালিকায় স্থান পেয়েছে। কৃষকের বদলে ফড়িয়া মহাজনদের মাধ্যমে সরকারি ক্রয় কেন্দ্রে ধান দিচ্ছেন একটি সিন্ডিকেট। এতে করে কৃষক চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পাশাপাশি কৃষক ধানের দাম পাওয়ার জন্য সরকারের উদ্যোগ ভেস্তে যাচ্ছে।

কোন প্রকার প্রচার-প্রচারণা ছাড়াই গত ২৩ মে উপজেলার শ্রীরামকাঠী বন্দর সংলগ্ন খাদ্য গুদাম চত্বরে জেলা প্রশাসক আবু আলী মো. সাজ্জাদ হোসেন চলতি বছরের ধান-চাল সংগ্রহ কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন। এ সময় উপজেলা নির্বাহী অফিসার রোজী আকতার, উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক শাহনাজ পারভীন ও খাদ্য গুদামের ওসিএলএসডি স্বর্না রানী মৃধাসহ ওই সিন্ডিকেটের অধিকাংশ সদস্য উপস্থিত ছিলেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, নাজিরপুরে এ বছর ২৬ টাকা কেজি দরে ৪১১ মেট্রিক টন ধান, ৩৬ টাকা কেজি দরে ৮৬৬ মেট্রিক টন চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। আগামী ৩১ আগস্ট পর্যন্ত ধান ও চাল সংগ্রহ কার্যক্রম চলবে। কিন্তু এবার মুনাফা বেশি হওয়ার কারণে হুমড়ি খেয়ে পড়ছে একটি সিন্ডিকেট চক্র। তাদের দাপটে সাধারণ কৃষকরা ক্রয় কেন্দ্রের আশপাশেই ভিড়তে পারছেন না। কেউ ক্রয় কেন্দ্রে গেলেও ধান কেনা শেষ বলে সাফ জানিয়ে দেয়া হচ্ছে।

অন্যদিকে কৃষকদের কাছ থেকে রাইস মিল মালিকরা ধান না কেনায় আরো দরপতনের আশঙ্কা রয়েছে। সরকারিভাবে চাল ৩৬ টাকা ও ধান ২৬ টাকা কেজি দরে দাম নির্ধারণ করে ক্রয় করা হলেও এর সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছে কৃষকরা।

স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, উপজেলার চিহ্নিত ফড়িয়ারা এবং সিন্ডিকেটের লোকজন সাধারণ কৃষকদের কাছ থেকে কৃষি কার্ড, জাতীয় পরিচয়পত্র, ছবি এবং ব্যাংক হিসাবের চেক কৌশলে হাতিয়ে নিচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে যেসব কৃষকের ব্যাংক হিসাব নেই সেসব কৃষককে না জানিয়েই তার নামে ব্যাংকে হিসাব খোলা হচ্ছে। কৃষকের নামে ফড়িয়া ও সিন্ডিকেটের লোকজনের ধান দেয়ার কাজে সহযোগিতা করছে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ও খাদ্য গুদামের ইনচার্জসহ ইউপি চেয়ারম্যানরা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই সিন্ডিকেটের এক সদস্য জানান, উপজেলা ছাত্রলীগের যুগ্ম আহবায়ক আলামিন শেখ, উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মোশারেফ হোসেন খানের শ্যালক এনামুল মল্লিক, মোস্তফা চৌকিদার, সঞ্জু, দেলোয়ার, আলম, আব্দুল হক, আলমগীর ও ছাত্রলীগ নেতা শান্ত চক্রবর্তীসহ ১২ থেকে ১৫ জনের একটি সিন্ডিকেট নিজেরা কৃষক সেজে বা কৃষকদের কার্ড ব্যবহার করে নানা কৌশলে গুদামে ধান-চাল সরবরাহ করছে। আর তাদের কাছে এ কাজে সহযোগিতা করছে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ও খাদ্য গুদামের ইনচার্জসহ ইউপি চেয়ারম্যানরা।

ওই সিন্ডিকেট সাধারণ কৃষকদের কাছে বা বাজার থেকে প্রতি মণ ধান ৫শ’ থেকে সাড়ে ৫শ’ টাকা দরে কিনে ১ হাজার ৪০ টাকা দরে গুদামে সরবরাহ করছে। এতে করে কৃষক চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পাশাপাশি কৃষক ধানের দাম পাওয়ার জন্য সরকারের উদ্যোগ ভেস্তে যাচ্ছে।

উপজেলার সেখমাটিয়া ইউনিয়নের রঘুনাথপুর গ্রামের কৃষক সেলিম শেখ, রুহুল খান ও পারভেজ খানের কাছে সরকারিভাবে ধান-চাল সংগ্রহের বিষয়ে জানতে চাইলে তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমরা তো কৃষক না, রাজনৈতিক দলের নেতা ও বাজারের বড় বড় ব্যবসায়ীরা প্রকৃত কৃষক। প্রতিবছর শুনতে পাই খাদ্য গুদামে ধান-চাল সংগ্রহ অভিযান শুরু হয়েছে। আমরা সেখানে আমাদের ফসল দিতে গিয়েও দিতে পারি না। আমাদের ফসল না নিয়ে ট্রলার ও  ট্রাকবোঝাই বড় বড় ব্যবসায়ীর ধান নেওয়া হয়। এ বছরও গুদামে ধান দিতে গিয়ে ফিরে এসেছি। তারা আরো বলেন, বাজারে ধানের দাম কম, খাদ্য গুদামের দামটা একটু বেশি। যদি প্রকৃত কৃষক তাদের জমিতে ফলানো ধান খাদ্য গুদামে দিতে পারত তাহলে কৃষকরা অনেক লাভবান হতো।

কলারদোয়ানিয়া ইউনিয়ন থেকে গুদামে ধান দিতে আসা আসাদুজ্জামান বলেন, গুদাম ইনচার্জ নানা অজুহাত দেখিয়ে তার ধান না রেখে ফিরিয়ে দিয়েছে। এ সময় গুদাম ইনচার্জসহ সিন্ডিকেটের কয়েকজন তার সাথে খারাপ ব্যবহার করেছে।

নাজিরপুর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য মাস্টার অমূল্য রঞ্জন হালদার জানান, উপজেলা পরিষদের সভায় রেজুলেশন করে উপজেলা ৯টি ইউনিয়ন থেকে ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু সে অনুযায়ি প্রকৃত কৃষকরা গুদামে ধান দিতে পারছে না। উপজেলার সদর, শ্রীরামকাঠী ও সেখমাটিয়া থেকে অনেক কৃষক আমার কাছে অভিযোগ করেছে। তারা গুদামে গিয়েও ধান দিতে পারেনি। গুদাম থেকে তাদের জানানো হয় ধান সংগ্রহ শেষ। আমি খোঁজ নিয়ে সরকারিভাবে ধান-চাল সংগ্রহে বিভিন্ন অনিয়মের প্রমাণ পেয়েছি। এগুলো উপজেলা পরিষদের সভায় উপস্থাপন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।

এসব অভিযোগ অনুসন্ধানের জন্য সরেজমিনে খাদ্য গুদামে গিয়ে ওসিএলএসডি’র সাথে কথা বলতে গেলে সেখানে হাজির হয় ওই সিন্ডিকেটের অধিকাংশ সদস্য। তারা এক পর্যায়ে ওসিএলএসডি’র পক্ষে ওকালতি শুরু করে। ওসিএলএসডি স্বর্না রানী মৃধা জানায়, ইতোমধ্যে উপজেলার শ্রীরামকাঠী, নাজিরপুর সদর ও সেখমাটিয়া ইউনিয়নের নির্ধারিত ধান ক্রয় শেষ হয়েছে। তবে ওই তিনটি ইউনিয়ন থেকে কোন কোন কৃষকের কাছ থেকে ধান সংগ্রহ করেছেন সে তালিকা তিনি দেখাতে পারেনি। সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ধান সংগ্রহের বিষয়টি অস্বীকার করে তিনি বলেন, ধান সংগ্রহে কোন অনিয়ম হচ্ছে না। নিয়মানুযায়ী তিনি কার্ডধারী কৃষকদের কাছে ধান সংগ্রহ করছেন।

ওই সিন্ডিকেটের সদস্য উপজেলার কলারদোয়ানিয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা মোস্তফা চৌকিদার বলেন, আমার ইউনিয়ন থেকে ২৫ মেট্রিক টন ধান ক্রয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছে খাদ্য গুদাম। আমি একজন কৃষক হিসেবে ওই ধান সরবরাহ করছি।

খাদ্য গুদামের ভিতরেই কথা হয় উপজেলা ছাত্রলীগের যুগ্ম আহবায়ক আলামিন শেখের সাথে। তিনি ওই সিন্ডিকেটের সাথে জড়িত নয় দাবী করে বলেন, অনেক কৃষক এখানে ধান দিতে আসলে তাদের ফিরিয়ে দেয়া হচ্ছে। আমি তাদের গুদামে ধান দেয়ায় সহায়তা করছি।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার রোজী আকতার বলেন, সরকারি ধান ক্রয়ে কোনো অনিয়ম মেনে নেয়া হবে না। প্রকৃত কৃষকদের কাছ থেকে ধান ক্রয়ের জন্য ওসিএলএসডিকে বলা হয়েছে। তারপরও কেউ অনিয়ম করলে তার বিরুদ্ধে অবশ্যই ব্যবস্থা নেয়া হবে।

Please follow and like us:





উত্তর দিন

Wordpress Social Share Plugin powered by Ultimatelysocial