রোগী শূন্য হাসপাতাল ! কৈফিয়ত তলব
রোগী শূন্য হাসপাতাল! শুনলেই সবাই একটু না একটু বিষ্মিত হবেন। রোগীর জন্য হাসপাতাল, কিন্তু হাসপাতালে কোন রোগী নেই। তাহলে মনে হওয়া স্বাভাবিক কারও কোন রোগ পিঁড়া, অসুখ-বিসুখ নেই, সবাই সুস্থ্য। কারও চিকিৎসা সেবা নেয়া লাগে না। তাই মনে হয় হাসপাতালে রোগী নেই।
কিন্তু ঘটনা তার উল্টো। চিকিৎসা পায় না, তাই হাসপাতালে রোগী যায় না। রোগী ভর্তি হয় না। খুলনা জেলার পাইকগাছার কপিলমুনি ১০ শয্যা বিশিষ্ট কপিলমুনি সরকারি হাসপাতালে এ ঘটনা ঘটেছে।
জানা গেছে, অপরিস্কার অপরিচ্ছন্ন হাসপাতাল, ডাক্তার থাকে না, হাসপাতালটি নিজেই রুগ্ন হয়ে পড়েছে। গত ১০ মে খুলনা-৬ আসনের সংসদ সদস্য আক্তারুজ্জামান বাবু আকস্মিক পাইকগাছা উপজেলার কপিলমুনি ১০ শয্যা সরকারি হাসপাতাল পরিদর্শন করেন। তিনি সেবার মান ও পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা নিয়ে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেন। এ সময় হাসপাতালে উপস্থিত ছিলেন না কোনো চিকিৎসক বা বেডে ভর্তি কোনো রোগী। হাসপাতালে রোগী না থাকার পিছনে রয়েছে অসংখ্য অভিযোগ। এক প্রকার সব শূন্য অবস্থায় আউট ডোরে কোনো রকমে রোগী দেখে চলছে হাসপাতালটি।
প্রতিষ্ঠার পর ৯৩ বছর পার করে ৯৪ তে পা রেখেছে কপিলমুনি সরকারি হাসপাতালটি, বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি নিজেই রুগ্ন। জনবল সংকট আর অবকাঠামো ভেঙ্গে পড়লেও কেউ খোঁজ নেয়নি চির অবহেলিত এ হাসপাতালটি।
পাইকগাছা, কয়রা ও তালা থানার লাখ লাখ মানুষ সে সময় ছিল সুচিকিৎসা থেকে বঞ্চিত। তাই বৃহৎ এই কয়’টি থানার অসংখ্য মানুষের সুচিকিৎসার কথা ভেবে কপিলমুনির প্রয়াত দানবীর রায় সাহেব বিনোদ বিহারী সাধু ১৯২৫ সালের ৭ এপ্রিল ৩ একর জমিতে প্রতিষ্ঠা করেন ২০ শয্যা ভরত চন্দ্র হাসপাতাল। হাসপাতালটি তৈরির সময় অনেকাংশে মার্বেল পাথর স্থাপন করা হয়। ভবনটি দেখতে যেন সুরম্য অট্টালিকা। স্থাপন করা হয় ডিসপেনসারী কক্ষ, কলেরা ওয়ার্ড, কর্মচারী কোয়ার্টার, ডাক্তারদের আবাসিক ভবন, লাশ রাখার ঘর, শৌচাগার, অপারেশন থিয়েটার, ডেলিভারী কক্ষসহ লোহার তৈরি ঘোরানো পেঁচানো সিঁড়ি, বৃহৎ একটি পুকুর, সীমানা প্রাচীরসহ কোলকাতা থেকে আনা আধুনিক যন্ত্রপাতি। যার অনেক কিছুই এখন নষ্ট হয়ে গেছে, আধুনিক সেই সব যন্ত্রপাতি হাসপাতালটিতে এখন আর চোখে পড়েনা। হাসপাতালের সীমানা প্রাচীরের একটা অংশ ভেঙ্গে গেছে। পার্শ্ববর্তী এলাকার কতিপয় মানুষ হাসপাতাল চত্তরটি যেন গোচারণ ভূমিতে পরিণত করেছে।
দানবীর রায় সাহেব বিনোদ বিহারী সাধু কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত ২০ শয্যার হাসপাতালটি ১৯৭১ সালে সরকারি করণের সময় প্রতিষ্ঠাতার দেয়া নাম পরিবর্তন করে নামকরণ করা হয় কপিলমুনি ১০ শয্যা সরকারি হাসপাতাল। প্রতিষ্ঠার পর থেকে কয়েকবার সরকার ও স্থানীয় নেতৃত্বের পরিবর্তন আসলেও কপিলমুনি হাসপাতালটির উন্নয়ন হয়নি। বিভিন্ন সময় মন্ত্রী-এমপিরা উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিলেও তা এখনো বাস্তবায়নের অপেক্ষায়। সর্বশেষ পাইকগাছা-কয়রা এমপি আক্তারুজ্জামান বাবু শনিবার সকাল ৮টায় নির্বাচনী এলাকার প্রবেশদ্বারে কপিলমুনি ১০ শয্যা সরকারি হাসপাতালটি আকস্মিক পরিদর্শন করেন। সরকারি সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান এলাকার মানুষকে কতটা সেবা দিচ্ছেন তা নিজের চোখে ঘুরে ঘুরে দেখেন। পরিদর্শন শেষে তিনি সেবার মান ও পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা নিয়ে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
সংসদ সদস্য আক্তারুজ্জামান বাবু বলেন, আকস্মিক হাসপাতাল পরিদর্শনে গিয়ে কোনো মেডিকেল অফিসারকে কর্মস্থলে পাইনি। সবচেয়ে পরিতাপের বিষয় ১০ শয্যা হাসপাতালে কোনো আসন শূন্য থাকার কথা নয়। অথচ সেবার মান এতটাই নি¤œগামী যে হাসপাতালের সব শয্যাই রোগী ছাড়াই ফাঁকা পড়ে রয়েছে। এছাড়া পরিস্কার পরিচ্ছন্নতার ক্ষেত্রেও উদাসীন রয়েছে হাসপাতালে কর্মরতরা। এভাবে একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের সেবা কার্যক্রম চলতে পারে না। পরিদর্শন শেষে তিনি হাসপাতালে কর্মরতসহ উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে কর্মক্ষেত্রে আরো বেশি দায়িত্বশীল হওয়ার কথা বলেন।
একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তার উক্ত হাসপাতালে পদায়ন থাকা সত্ত্বেও হাসপাতালে এ ধরণের দুরাবস্থা মোটেই কাম্য নয় এবং সরকারি শৃংখলা ও আপিল বিধিমালা ১৯৮৫ এর পরিপন্থী। সেহেতু আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য কেন উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে সুপারিশ করা হবে না তার লিখিত জবাবপত্র জারীর তিন কর্ম দিবসের মধ্যে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা বরাবর উপস্থাপনের জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হয়।
অনুরূপ আরেকটি পত্রের মাধ্যমে সরকারি নিয়মনীতি উপেক্ষা করে কর্মস্থল কপিলমুনিতে অবস্থান না করে পাইকগাছাতে অবস্থান করে কর্মস্থলের দায়িত্ব পালন করায় কপিলমুনি ১০ শয্যা হাসপাতালের স্বাভাবিক কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে সম্পাদনে বিঘœ সৃষ্টি হচ্ছে। এ অবস্থায় সরকারি নিয়ম অনুযায়ী পত্রের মাধ্যমে কর্মস্থলে অবস্থান পূর্বক দায়িত্ব পালনের জন্য ডা. মো. আব্দুর রব’কে নির্দেশ প্রদান করা হয়। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ফোনে ডা. আব্দুর রবকে পাওয়া যায়নি। তবে কৈফিয়ত তলব ও কর্মস্থলে অবস্থান থাকা প্রসঙ্গে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে ডা. মো. আব্দুর রবকে পৃথক দুটি পত্র দেওয়া হয়েছে বলে জানান, উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. এএসএম মারুফ হাসান।
