প্রধান সূচি

নেপথ্যে ক্লিনিক এন্ড ডায়গনষ্টিক সেন্টার দখল

পিরোজপুরে একটি হিন্দু পরিবারের বাসার মালামাল লোপাট ॥ গ্রেফতার-৮

পিরোজপুর জেলা সদরের বাইপাস সড়কে অবস্থিত সার্জিকেয়ার ক্লিনিক এন্ড ডায়গনষ্টিক সেন্টারের ৫ম তলায় বসবাসকারী একটি হিন্দু পরিবারের মালামাল লোপাট করা হয়েছে। ক্লিনিকের প্রতিষ্ঠাতা ডাক্তার বিজয় কৃষ্ণ হালদারের ফ্লাটের কলাপসিকল (কেসি গেট) গেটের অভিনব কায়দায় তালার হুক কেটে বাসার সমস্ত মালামাল লোপাট করার এ ঘটনা ঘটেছে। ক্লিনিকের ৫ম তলার ঐ ফ্লাটে অসুস্থ ডাক্তার বিজয় কৃষ্ণের স্ত্রী এবং মেয়ে বসবাস করতো। ঘটনার সময় তারা ঢাকায় অবস্থান করছিল।

এ ঘটনায় ডাক্তার বিজয় কৃষ্ণ হালদারের স্ত্রী গিতা রানী মজুমদার বুধবার রাতে ক্লিনিকের বর্তমান মালিক দাবিদার ওবায়দুল হক পিন্টুসহ ১০ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা আরো ৫/৬ জনকে আসামী করে একটি চুরির মামলা দিয়েছেন।

পুলিশ বুধবার রাত ৩ টায় ঘটনার সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে ওই ক্লিনিকের জেনারেল ম্যনেজার পুলক দাসসহ ৮ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে অন্যান্যরা হলো ব্যবস্থাপক অসীম মজুমদার, ইলেক্ট্রিশিয়ান দিনেশ বিশ^াস, ওয়ার্ড বয় সুজন হালদার, নিরাপত্তা কর্মী সত্তার খান, মেডিকেল অ্যাসিষ্ট্যান্ট সুধীর মজুমদার, কম্পিউটার অপারেটর সবিনয় ভক্ত ও চিপ নিরাপত্তা কমী ইমন শরীফ।

ডাক্তার বিজয় কৃষ্ণ হাওলাদারের স্ত্রী পিরোজপুর সরকারি সোহরাওয়ার্দী কলেজের সাবেক উপাধ্যক্ষ গীতা রাণী বলেন, আমি গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজে মেয়েকে নিয়ে গত ২৪ মে ঢাকায় যাই। বুধবার সন্ধ্যায় বাসায় ফিরে এসে দেখি বাসার গেটে তালা লাগানো রয়েছে। ভিতরে ঢুকে দেখা যায় বাসায় কোন মালামাল নেই। আসবাবপত্র, তৈজসপত্র, খাট-পালং, আলমিরা, আলনা, কাপড়-চোপড় থেকে শুরু করে হাড়ি-পাতিল সব কিছু লোপাট করা হয়েছে। ফ্লাটের সবক’টি রুমের মালামাল নিয়ে গেছে। শুধুমাত্র একটি মাদুর বিছিয়ে রেখে গেছে একটি রুমে। এরপর আমি পুলিশে খবর দেই। পুলিশ এসে পাশের তালাবদ্ধ একটি হলরুম থেকে খাট-পালং, আসবারপত্র, আলমিরাসহ কিছু জিনিষপত্র উদ্ধার করে দিয়েছে। তবে স্বর্ণালংকারসহ দামীয় মালামাল কিছুই পাওয়া যায়নি।

তিনি অভিযোগ করে বলেন, আমার স্বামীর অসুস্থতার সুযোগে আমার স্বামীর প্রতিষ্ঠিত সার্জিকেয়ার ক্লিনিক এন্ড ডায়গনষ্টিক সেন্টার থেকে আমাদের উৎখাত করার জন্য চিত্র নায়ক জায়েদ খানের ভাই ওবায়দুল হক পিন্টু গত দুই বছর ধরে আমাদের উপর নির্মম নির্যাতন করে যাচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতা এই ঘটনা ঘটিয়েছে।

এ সময় গীতা মজুমদারের মেয়ে অনন্যা হাওলাদার জানায়, আমার বাবাকে ওবায়দুল হক পিন্টু মেরে ঝিনইদাহের কালিগঞ্জে একটি রেল লাইনের পাশে রেখে এসেছিলো। ওইখানের লোকদের সহযোগিতায় আমার বাবা প্রাণে বাঁচে। এরপর ২০১৬ সালের ২১ মার্চ গভীর রাতে অন্ত্রজ¦ালা সিনেমার শুটিংএর  কথা বলে আমাদের দরজা খুলতে বলে। দরজা খোলার সাথে সাথে ওবায়দুল হক পিন্টুসহ একদল সন্ত্রাসীরা আমার মাথায় পিস্তল ধরে আর আমার মাকে বেঁধে ফেলে। এরপর একটি এম্বুলেন্সে করে ঝাটকাঠি এলাকার একটি নির্জন বাড়িতে রেখে ওখানেই আমাদের থাকতে বলে। এ কথা কাউকে বললে প্রাণে মেরে ফেলারও হুমকি দেয় সন্ত্রাসীরা। পরে প্রশাসন ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সহায়তায় ঘটনার দুই দিন পরে আমরা আবার ক্লিনিকের বাসায় উঠতে সক্ষম হই। কিন্তু এরপরও পিন্টু আমাদের বাসার বিদ্যুৎ ও পানির লাইন কেটে দেয়। এমনকি রান্নার জন্য সিলিন্ডার গ্যাস বাসায় আনতে বাঁধা দেয়। বাসায় আত্মীয়-স্বজনসহ কোন লোকজনকেও ঢুকতে দেয়া হয় না।

এ বিষয়ে ওবায়দুল হক পিন্টুর কাছে জানতে চাইলে তিনি মালামাল লোপাটের ঘটনা অস্বীকার করে বলেন, আমাকে ফাসানোর জন্য এটা করা হয়েছে।

ক্লিনিকের বিষয়ে ওবায়দুল হক পিন্টু বলেন, দুই কোটি টাকা মূল্য পরিশোধ করে ডাক্তার বিজয় কৃষ্ণ হালদারের কাছ থেকে ক্লিনিকের অর্ধেক অংশ ক্রয় করি। পরবর্তীতে বাকী অংশ ক্রয় করার জন্য ডাক্তার বিজয় কৃষ্ণকে সর্বমোট ১ কোটি ৮৭ লক্ষ টাকা দেয়া হয়। এসবের প্রমানাদি রয়েছে। কিন্তু বিজয় কৃষ্ণ হালদার হঠাৎ দুর্ঘটনায় অসুস্থ হয়ে বাকী অংশের রেকর্ড করা যায় নি।  ডাক্তার বিজয় কৃষ্ণ হালদার ক্লিনিকে অবস্থান না করলেও তার স্ত্রী ও মেয়ে ক্লিনিকের ৫ম তলায় আবাসিক ডাক্তারের জন্য নির্মিত ফ্লাটটি দখল করে আছেন। তারা ক্লিনিক ক্রয়ের টাকাও ফেরৎ দেয় না, ক্লিনিকও বুঝিয়ে দেয় না।

তবে ডাক্তার বিজয় কৃষ্ণের স্ত্রী গীতা রাণী মজুমদার পিন্টুর বক্তব্য মিথ্যা দাবী করে বলেন, পিন্টুরা যে কাগজ পত্রের কথা বলছে তা সঠিক নয়।

পুলিশ সুপার মোহাম্মদ সালাম কবির বলেন, গীতা রাণী মজুমদার অভিযোগ করার পর পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে তল্লাশী চালিয়ে পাশের একটি কনফারেন্স রুম থেকে চুরি হওয়া মালামাল উদ্ধার করতে সক্ষম হয়। এরপর গীতা রাণীর মামলার এজাহার অনুযায়ী ঘটনার সাথে জড়িত ৮ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাকে নিরাপত্তার জন্য পুলিশি সহায়তা প্রদান করা হয়েছে।

পুলিশ সুপার জানান, ক্লিনিকের মালিকানার বিষয় নিয়ে আদালতে মামলা রয়েছে। সেটা দেওয়ানী আদালতের বিষয়অ তবে ক্লিনিক নিয়ে কোন ফৌজধারী অপরাধ ঘটলে সেক্ষেত্রে অপরাধীদের কোন প্রকার ছাড় দেয়া হবে না।

এদিকে, আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে পিরোজপুর বাইপাস সড়কে অবস্থিত সার্জিকেয়ার ক্লিনিক এন্ড ডায়গনষ্টিক সেন্টারে সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, পুরো ক্লিনিকটি প্রায় ফাঁকা। ক্লিনিকে কোন কর্মকর্তা বা কর্মচারী, ডাক্তার-নার্স নেই। তেমন কোন রোগীও নেই। ক্লিনিকের নিচতলায় কয়েকজন পুলিশ অবস্থান করছে। তারা জানান, এদিন ক্লিনিকের কোন ষ্টাফ আসে নি। ক্লিনিকটির নিরাপত্তার দায়িত্বে রয়েছেন পুলিশ সদস্যরা।

Please follow and like us:





উত্তর দিন

Wordpress Social Share Plugin powered by Ultimatelysocial