ইন্দুরকানীতে কমে যাচ্ছে গবাদি পশুর সংখ্যা
‘আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে’। কবির ভাষার এমন ভাব এখন অনেকটাই ম্লান হতে চলেছে। দুধে ভাতে থাকার সেই স্বর্ণালী দিন ফুরিয়ে আসছে। ভাত থাকলেও দুধের অভাব প্রকট আকার ধারণ করছে পিরোজপুরের ইন্দুরকানীতে। কারণ দিন দিন কমে যাচ্ছে গবাদি পশুর সংখ্যা।
উপজেলায় গত ১০ বছরের ব্যবধানে প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে গবাদি পশুর সংখ্যা। উপজেলা প্রাণী সম্পদ দপ্তরের দেয়া তথ্য মতে ২০০৮ সালে মোট গরু, ছাগল ও মহিষের সংখ্যা ছিল ২১ হাজার ৮’শ ৪৫ টি। ২০১৬ সালের জরিপ অনুযায়ী যা হ্রাস পেয়ে দাঁড়িয়েছে ১৪ হাজার ৮’শ ৯৫ টিতে। এই এলাকায় প্রধানত গরু ও ছাগল বেশি পালন করে থাকে গৃহস্থরা। কৃষক পরিবারগুলোতে একটি সময় গরু বা মহিষ দিয়ে হাল চাষ করা হত। সেই জায়গাটি দখল করে নিয়েছে ইঞ্জিন চালিত ট্রাক্টর। এছাড়া গাভী ছিল দুধের প্রধান উৎস। কিন্তু বর্তমানে গোচারণ ভূমির, পুষ্টিকর গোখাদ্য ও সচেতনতার অভাবে দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে দুগ্ধদানকারী এসব গবাদি পশুর সংখ্যা। ফলে এই উপজেলার দুধের চাহিদা পূরণ হচ্ছে না। বাধ্য হয়ে কৌটা ও প্যাকেটজাত দুধের উপর নির্ভর করতে হচ্ছে ভোক্তাদের।
ইন্দুরকানী গ্রামের সবুজ আলমের ছেলে বয়স ১৫ মাস। সে তার ছেলের জন্য গরুর দুধ সংগ্রহ করে নিয়মিত। কিন্তু তাকে দুধ সংগ্রহ করতে প্রায়ই বিভ্রান্তিতে পড়তে হয়। সবুজ আলম জানান, আমার গ্রামে নিয়মিত গরুর দুধ পাওয়া যায় না। তাই ৩ থেকে ৪ কিলোমিটারের দূরের দেবিপুর গ্রাম থেকে দুধ সংগ্রহ করি। তাও গোয়ালাকে অনেক অনুরোধ করে পেতে হয়। প্রতি কেজি দুধ ৬০ থেকে ৭০ টাকা দরে কেনা লাগে।
অপর দিকে দুগ্ধজাত পন্য উৎপাদনকারী মিষ্টান্ন ভান্ডার গুলোর কাছে দুধের সংকট নিয়মিত। তাই বাধ্য হয়ে পাউডার দুধের ব্যবহার করতে হয় তাদের। তারা দুধের ছানা সংগ্রহ করেন অন্য এলাকা থেকে।
এ বিষয়ে উপজেলা প্রাণী সম্পদ কর্মকর্তা ডাঃ এ কে এম আজহারুল ইসলাম উপজেলায় গবাদি পশুর সংখ্যা কমে যাওয়ার কারণ হিসেবে আর্থ সামাজিক অবস্থা, রাজনৈতিক অস্থিরতা, গোচারণ ভূমির অভাব, জনবল সংকট, অসচেতনতা, পুষ্টিকর খাদ্য, ঘাস চাষ, কৃত্রিম প্রজননে অনাগ্রহীতাকে দায়ী করেছেন।
ইন্দুরকানীর আদী মিষ্টান্ন ভান্ডার এর সত্বাধিকারী রিপন চন্দ্র সাহা জানান, আমরা পারিবারিক ভাবে এই এলাকায় ৪০ বছরেরও বেশি সময় ধরে দুগ্ধজাত পন্যের ব্যবসা করে আসছি। এক সময় স্থানীয় ভাবে উৎপাদিত দুধে আমাদের চাহিদা মিটে যেত। বর্তমানে সেটা আর সম্ভব হচ্ছে না। তাই আমাদের বাধ্য হয়ে সাতক্ষীরা ও বাগেরহাটের কয়েকটি ফার্ম থেকে দুধ ও ছানা সংগ্রহ করতে হয়। ভান্ডারিয়া, মঠবাড়িয়া, কাউখালী সহ বেশ কয়েকটি এলাকাতেও একই অবস্থা বলে জানান তিনি।
একটি সময় ছিল যখন প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই গবাদি পশু পালন করা হত। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে সেই ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে পারে নাই সাধারণ গৃহস্থ পরিবার গুলো। বর্তমান সময়ের সন্তানদের আগের মত করে দুধে ভাতে থাকার বিষয়টা তাই কৃত্রিম হয়ে পড়েছে।
বানিজ্যিক ভাবে এই এলাকায় ডেইরি ফার্ম নির্মান করতে পারলে দুধের অভাব পূরণ করা সম্ভব। ডেইরি ফার্মের উন্নত জাতের গরু বেশি পরিমানে দুধ দিতে সক্ষম। তাই ঋন সুবিধার আওতায় এনে খামারি সৃষ্টির লক্ষ্যে জনসাধারণকে উদ্বুদ্ধ করতে হবে সরকারকে।
